অসভ্য পশ্চিমারা যখন ইরানকে বর্বর বলে

ট্রাম্প ইরানকে ‘সন্ত্রাস ও বিদ্বেষের দেশ’ বলে আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘আপনারা এমন একটি দেশের কথা বলছেন যা গত ৪৭ বছর ধরে দুর্বৃত্তপনা চালিয়ে আসছে।’ ইরানে একটি পানি শোধনাগারে যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তর দেন, ‘তারা ইতিহাসের অন্যতম জঘন্য মানুষ’। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ভাষ্যে, ইরান সভ্যতা বিবর্জিত একটি দুষ্কৃতকারী দেশ। আমরা মনে করি, এই ত্রুটিপূর্ণ বিশ্লেষণই বলে দেয়, পাঁচ সপ্তাহ আগে পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই বর্বর হামলা শুরুর পর থেকে কেন যুক্তরাষ্ট্র ইরানিদের কাছে বুদ্ধিমত্তায়, কৌশলে এবং যোগ্যতায় নাস্তানাবুদ হচ্ছে।

পিটার ওবোর্ন ও ইরফান চৌধুরী
ইরানের ওপর অবৈধ মার্কিন-ইসরাইলি হামলার মূলে দু’টি ধারণাগত ভ্রান্তি রয়েছে। প্রথমটি হলো এই ধারণা যে, ইরান একটি বর্বর দেশ, যা মধ্যযুগে পড়ে আছে এবং আধুনিক বিশ্বের সাথে খাপ খাইয়ে চলতে অক্ষম। যেমনটি ট্রাম্প বলছিলেন, যখন তাকে প্রশ্ন করা হয়, ইরানের সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করা কি যুদ্ধাপরাধ নয়? তিনি উত্তর দেন, ‘ওরা পশু’।

দ্বিতীয় ভুল হলো এই বিশ্বাস যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিমা সভ্যতার প্রতিনিধিত্ব করে।

এই নিবন্ধে আমরা উভয় পক্ষের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের বুদ্ধিবৃত্তিক কৃতিত্ব ও সক্ষমতা পর্যালোচনার মাধ্যমে এই মৌলিক অনুমানগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখব।

আমরা দেখতে পারছি, ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরানের নেতৃত্ব অনেক বেশি পরিশীলিত, বুদ্ধিমান, শিক্ষাগত যোগ্যতায় উন্নততর ও সফল।

চলুন, যুদ্ধের একেবারে শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নিহত ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে তুলনা করে দেখা যাক।

খামেনি ছিলেন একজন মারজা অর্থাৎÑ ইসলামী আইনশাস্ত্রের বিশেষজ্ঞ। এর সবচেয়ে কাছাকাছি ব্রিটিশ তুলনা হতে পারে রাজার পরামর্শক বা হাইকোর্টের বিচারক। এই সর্বোচ্চ নেতা অসাধারণ ভাষাবিদও ছিলেন; মাতৃভাষা ফারসিতেই শুধু নয়, তিনি আরবি, আজেরি এবং তুর্কি ভাষাতেও অনর্গল কথা বলতে পারতেন। যথেষ্ট ভালো ইংরেজিও জানতেন। তিনি ছিলেন ফারসি কবিতার বিশেষ অনুরাগী, তবে পশ্চিমা সাহিত্যও প্রচুর পড়তেন। তার পাঠ তালিকায় ছিল জেন অস্টিন, লিও টলস্টয়, দান্তে আলিঘিয়েরি, জন স্টেইনবেক ও হ্যারিয়েট বিচ স্টোর বই।

২০০৪ সালে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘‘আমার মতে, ভিক্টর হুগোর ‘লে মিজারেবল’ এ পর্যন্ত লেখা সর্বশ্রেষ্ঠ উপন্যাস।’’ বেশ মনোজ্ঞ মূল্যায়ন।

সুস্পষ্ট বৈপরীত্য
খামেনি এবং তাকে হত্যার নির্দেশদাতা ট্রাম্পের মধ্যকার বৈসাদৃশ্যটি তাৎপর্যপূর্ণ। টনি শোয়ার্টজ, যিনি ‘ট্রাম্প : দ্য আর্ট অব দ্য ডিল’ বইয়ের নেপথ্য লেখক, অনুমান করেন, ট্রাম্প তার প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে একটিও বই পড়েননি। ‘ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি : ইনসাইড দ্য ট্রাম্প হোয়াইট হাউজ’ বইতে ট্রাম্পের জীবনীকার মাইকেল উলফ বলেছেন, ‘ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদকালে অনেকেই মনে করতেন, কার্যত তিনি এক আধা শিক্ষিত ব্যক্তি ছাড়া আর কিছু নন।’

ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব, নিহত ডক্টর আলী লারিজানি এবং তার সবচেয়ে কাছের মার্কিন প্রতিপক্ষ, যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথের মধ্যে তুলনা বলার মতো বিষয়। হেগসেথ অন্যতম বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় প্রিন্সটনে পড়াশোনা করেছেন বটে। তবে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা কোনোভাবেই লারিজানির সমকক্ষ নয়। লারিজানি পাশ্চাত্য দর্শনের ওপর পিএইচডি করেন এবং পরে দার্শনিক কান্টের ওপর তিনটি বই লিখেন।

লারিজানি সম্পর্কে ইসরাইলি সাংবাদিক গিডন লেভ বলেন, ‘কয়েক দশক ধরে সরকারের গুরুদায়িত্ব পালন করার পরও তিনি তার সবচেয়ে বড় আবেগের বিষয়টি কখনো ত্যাগ করেননিÑ সেটি দর্শনচর্চা।’

লেভ তাকে ‘একজন অসাধারণ চিন্তাবিদ’ বলে অভিহিত করেন, যিনি এক অনন্য উপায়ে মননশীল জীবন ও কর্মময় জীবনের সমন্বয় করেন, যা কোনোভাবেই ছোটখাটো কৃতিত্ব নয়। লারিজানি তার লেখায় পাশ্চাত্য দর্শনের নিয়ম প্রয়োগ করেই তার কট্টর ধর্মীয় বিশ্বদৃষ্টির মূল ভিত্তিগুলো ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন এবং তিনি প্রায়ই এমন যুক্তি উপস্থাপন করেন, যা সত্যিই চিন্তার উদ্রেক করে।

লারিজানি এবং ফক্স নিউজের প্রাক্তন উপস্থাপক, মদ্যপ ও ধর্মান্ধ পিট হেগসেথের মধ্যে তুলনা নেহাতই লজ্জাজনক।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আব্বাস আরাকচি কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিএইচডি করেছেন। তার ডক্টরাল থিসিসে পশ্চিমা ধাঁচের উদার গণতন্ত্র এবং ইসলামী শাসনের সংযোগের জায়গাটি পরীক্ষা করা হয়েছে। বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে তিনি তার মার্কিন প্রতিপক্ষ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর চেয়ে উচ্চতর স্তরে অবস্থান করেন। রুবিও সেই ব্যক্তি যিনি জলবায়ুর পরিবর্তনে মানুষের ক্ষতিকর ভূমিকা অস্বীকার করেন।

Iran-16-4
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্র্যাজুয়েশন ডের উৎসবে শিক্ষার্থীরা | ছবি : ইন্টারনেট থেকে

এবার আমরা হোয়াইট হাউজ বা ট্রাম্পপন্থী প্রচারকদের বিপথগামী দলটির দিকে নজর দেবো : ক্যারোলিন লেভিট, স্টিফেন মিলার ও সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম। এদের সবচেয়ে কাছাকাছি ইরানি সমতুল্য হলেন সৈয়দ মোহাম্মদ মারান্ডি। প্রফেসর মারান্ডি বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কবি লর্ড বায়রনের ওপর ডক্টরেট করেছেন। তিনি এখন তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য ও প্রাচ্যবিদ্যা পড়ান। মারান্ডি প্রায় দুই দশক ধরে বিশ্বের জ্ঞানের জগতে একটি পরিচিত নাম।

অধ্যাপক মারান্ডি ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজে ফুলেফেঁপে ওঠা বহু তুচ্ছ ব্যক্তির মতো নন। তার রয়েছে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা। তিনি ভয়াবহ ইরান-ইরাক যুদ্ধে দেশের সেবা করেছেন, যে সময় তিনি দু’টি রাসায়নিক অস্ত্র হামলা থেকে বেঁচে যান। ট্রাম্পের মুখপাত্রদের চেয়ে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সম্ভাব্য গতিপথ নিয়ে ধারাবাহিকভাবে অনেক বেশি সুসংহত ও নির্ভুল বিশ্লেষণ দিয়েছেন।

ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের উচ্চ বুদ্ধিবৃত্তিক মান দেশটির শিক্ষা ব্যবস্থারই বাস্তব প্রতিফলন।

বুদ্ধিবৃত্তিক বিশাল অর্জন
মার্কিন-সমর্থিত শাহের শাসনামলে শিক্ষার মান ছিল ভয়াবহ। ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে এর অভাবনীয় উন্নতি ঘটেছে। উদাহরণস্বরূপÑ ইউনেস্কোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (STEM)) বিষয়ে নারী স্নাতকদের হার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেও ছাড়িয়ে গেছে।

ইরানে ইসলামী বিপ্লবের ফলে উচ্চশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়। বিপ্লবের আগে অধিকাংশ ইরানি নারী-পুরুষ নিরক্ষর ছিলেন, অথচ এখন বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ পড়তে ও লিখতে পারেন।

জাতীয় আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৬ সালে ইরানের নারী জনসংখ্যার মাত্র ১৭.৪২ এবং পুরুষ জনসংখ্যার ৩৯.১৯ শতাংশ সাক্ষর ছিলেন। ১৯৭৬ সালে এই হার পুরুষদের জন্য ছিল ৪৭.৪৯ এবং নারীদের জন্য ৩৫.৪৮ শতাংশ।

এর বিপরীতে, ১৯৮৬ সালে বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে নারীদের সাক্ষরতার হার বেড়ে ৫২.১ শতাংশে পৌঁছে। ১৯৯৬ সালে বিপ্লব-পরবর্তী দ্বিতীয় জাতীয় আদমশুমারিতে দেখা যায়, ছয় বছরের বেশি বয়সী ইরানি নারী জনসংখ্যার ৭৪.২ শতাংশ সাক্ষর এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ৭৪.৭ শতাংশ।

২০০৬ সালের আদমশুমারি থেকে জানা যায়, ছয় বছরের বেশি বয়সী মোট নারী জনসংখ্যার ৮০.৩ শতাংশ সাক্ষর হয়েছেন; পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ৮৮.৭ শতাংশ। ২০২২ সালে, ইউনেস্কো অনুমান করে, ইরানের ১৫-২৪ বছর বয়সী নারীদের সাক্ষরতার হার ৯৯ শতাংশ।

নরম্যান ফিঙ্কেলস্টাইন ২০১৪ সালে ইরানের ইমাম সাদিক বিশ্ববিদ্যালয়ে জন স্টুয়ার্ট মিলের দর্শন পড়াতেন। তিনি বলেন, ‘এটি একটি অত্যন্ত সন্তোষজনক শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা ছিল... ধর্মীয় পণ্ডিতরা নিঃসন্দেহে খুব বুদ্ধিমান এবং অত্যন্ত আন্তরিক ও মনোযোগী ছিলেন।’

এটি ছিল অনেকটা প্লেটোর ‘রিপাবলিক’-এর মতো, আর এরা হলেন অভিভাবক দার্শনিক রাজন্যবর্গ এবং তারা ধারণাগুলোকে খুব গুরুত্বের সাথে নিতেন। তাদের সাথে চমৎকার আলোচনা করা যেত।

ফিঙ্কেলস্টাইন এমন একজন ছাত্রের সাথে তার কথোপকথনের কথা স্মরণ করেন যার মোবাইল ফোন ছিল না-‘আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তোমার একটি সেলফোন নেই কেন?’ সে বলল, ‘আপনার সেলফোনের প্রয়োজন কেন? এটি আপনাকে কেবল চার পাশের লোকদের সাথে কথা বলার সুযোগ দেয়, অথচ একটি বই পড়লে আপনি আল্লাহ তায়ালার সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করতে পারেন।’ আমার মনে হয়েছিল, এ ব্যাপারটি বেশ চিত্তাকর্ষক। আমি তরুণদেরকে এমন কথা বলতে শুনি না। এটি ছিল এক বিশেষ মুহূর্ত।’

অবশ্যই, ইরানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অনেক ঘটনা ঘটে; কিন্তু এটি পশ্চাৎপদতার সেই রামরাজ্য নয়, যেভাবে যুক্তরাষ্ট্র চিত্রিত করতে উৎসাহ পায়।

ত্রুটিপূর্ণ বিশ্লেষণ
ট্রাম্প ইরানকে ‘সন্ত্রাস ও বিদ্বেষের দেশ’ বলে আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘আপনারা এমন একটি দেশের কথা বলছেন যা গত ৪৭ বছর ধরে দুর্বৃত্তপনা চালিয়ে আসছে।’ ইরানে একটি পানি শোধনাগারে যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তর দেন, ‘তারা ইতিহাসের অন্যতম জঘন্য মানুষ’।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ভাষ্যে, ইরান সভ্যতা বিবর্জিত একটি দুষ্কৃতকারী দেশ।

আমরা মনে করি, এই ত্রুটিপূর্ণ বিশ্লেষণই বলে দেয়, পাঁচ সপ্তাহ আগে পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই বর্বর হামলা শুরুর পর থেকে কেন যুক্তরাষ্ট্র ইরানিদের কাছে বুদ্ধিমত্তায়, কৌশলে এবং যোগ্যতায় নাস্তানাবুদ হচ্ছে।

লেখক : পিটার ওবোর্ন হলেন ডেইলি টেলিগ্রাফের সাবেক প্রধান রাজনৈতিক কলামিস্ট। তিনি The Assault on Truth : Boris Johnson, Donald Trump and the Emergence of a New Moral Barbarism. -শীর্ষক বইয়ের লেখক।

ইরফান চৌধুরী ফ্রিল্যান্সার এবং ব্রাইটন বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি শিক্ষার্থী। তিনি বিশ্বের বিভিন্ন নামকরা পত্রিকায় নিয়মিত লেখেন। (১৩ এপ্রিল ২০২৬ মিডল ইস্ট আইতে প্রকাশিত নিবন্ধ)

অনুবাদ : মুজতাহিদ ফারুকী