গোটা বিশ্বই কোনো না কোনোভাবে তেলের যুদ্ধে শরিক, নইলে আক্রান্ত। ইরানে প্রথম বড় ধরনের তেলের খনি ১৯০৮ সালে আবিষ্কৃত হয়। প্রায় একইসময়ে সৌদি আরবে বিপুল তেলের মজুদ থাকার বিষয় আঁচ করা যায়। বিশ্ব রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্র দৃষ্টি তখন এ অঞ্চলে নিবদ্ধ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ইউরোপকে নিজ বলয়ে নিতে গিয়ে পুঁজিবাদের নেতা যুক্তরাষ্ট্র এবং সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়। ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অবসান ঘটিয়ে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইল প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতা ঘোষণার পরদিনই মিসর, জর্দান, সিরিয়া, লেবানন ও ইরাকের সেনাবাহিনী তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। এরপর একে একে আরো বেশ কয়েকবার যুদ্ধ বাধলে বরাবরই ইসরাইল জয়ী হয়। প্রতিবারই ইহুদিদের জন্য নির্ধারিত এলাকার চেয়েও বেশি ভূমি তারা আরবদের কাছে থেকে দখল করে নেয়।
বিপুল তেলসম্পদ, ইউরোপ-এশিয়ার সংযোগস্থল হিসেবে ভূরাজনৈতিক কৌশলগত অবস্থান, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে মধ্যপ্রাচ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিজম মতবাদ ঠেকাতে ইসলামী চেতনা কাজে লাগাতে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামী দেশগুলোকে কাছে টেনে নেয়। তেলসমৃদ্ধ অঞ্চলে প্রভাব বজায় রাখা, সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব ঠেকানো এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে মোড়লগিরি করার জন্য স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে একটি স্থায়ী কৌশলগত ঘাঁটি স্থাপনের লক্ষ্যে পশ্চিমা শক্তিগুলো মধ্যপ্রাচ্যে একটি মিত্ররাষ্ট্র হিসেবে ইসরাইলকে বেছে নেয়।
ইরানের ওপর হামলার পর সৃষ্ট সঙ্কটে বাংলাদেশে শুধু বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা লোডশেডিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি কৃষি, শিল্প উৎপাদন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর মূলে রয়েছে আমদানিনির্ভরতা। দেশের চাহিদার একটি বড় অংশ মেটাতে হয় আমদানিকৃত এলএনজি ও কয়লার মাধ্যমে। আন্তর্জাতিক বাজারে যখনই এসব জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পায় কিংবা ডলারের সঙ্কট প্রকট হয়, তখনই দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো জ্বালানির অভাবে পড়ে। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণভাবে নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে গত কয়েক দশকে প্রত্যাশিত গতি না আসা এই সমস্যাকে আরো ঘনীভূত করেছে।
গ্যাসের ঘাটতি ও বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় চাহিদার সর্বোচ্চ সময় অর্থাৎ পিক আওয়ারে দুই হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হতে পারে। পরিস্থিতি মোকাবেলায়, বিশেষ করে সন্ধ্যার পর বিদ্যুতের ব্যবহার কমাতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়ার কথা ভাবছে সরকার। পাওয়ার সেলের তথ্য মতে, ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩২ হাজার ৩২২ মেগাওয়াট। গ্রাহক সংখ্যা চার কোটি ৯৬ লাখ। তবে এখন জাতীয় সঞ্চালন লাইনে প্রতিদিন যোগ হচ্ছে মাত্র ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে প্রতিদিন ৯০০ থেকে ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে, যা দিয়ে দিনে প্রায় পাঁচ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। তবে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবির এক অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গ্যাস সরবরাহ যদি ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে আসে, তবে উৎপাদন সাড়ে চার হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমে যেতে পারে।
এলপিজির ক্ষেত্রে বিইআরসি ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে মাসভিত্তিক দর নির্ধারণ শুরু করে। তার আগে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মতো করে দাম ঠিক করত। পরে আন্তর্জাতিক বাজারদরের সাথে সমন্বয় করে প্রতি মাসে নতুন মূল্য ঘোষণার ব্যবস্থা চালু হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আরেক ধাপে ‘জেট এ ১’ ও ফার্নেস অয়েলের মূল্য নির্ধারণের দায়িত্বও বিইআরসির হাতে যায়। ২০২৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর জারি করা গেজেটে এই ক্ষমতা স্থানান্তরের কথা জানানো হয়েছিল। এর আগে এসব পণ্যের দাম নির্ধারণ করত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসি। অন্য দিকে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের দাম এখনো প্রশাসনিকভাবে সরকার নির্ধারণ করে; কার্যকর করে বিপিসি। আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্য রাখতে এসব পণ্যে স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয় পদ্ধতি চালু করা হয়েছে, তবে চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতেই আছে। পিডিবির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জ্বালানির সরবরাহ স্থিতিশীল থাকলেও এপ্রিলে-মে মাসে দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা দাঁড়াতে পারে সাড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াট। আর এর বিপরীতে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে মোট উৎপাদন হতে পারে মাত্র ১৬ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত এলএনজি, কয়লা ও তেলের উচ্চমূল্যের কারণে সরকারকে প্রতিদিন আনুমানিক ২০০ কোটিরও বেশি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
কৃষিপ্রধান এই দেশে সেচ কাজের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের বিকল্প নেই। জ্বালানি সঙ্কটে ডিজেলের দাম বৃদ্ধি বা বিদ্যুতের ঘাটতি সরাসরি খাদ্য নিরাপত্তার ওপর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সার উৎপাদন থেকে শুরু করে পণ্য পরিবহন সবখানেই জ্বালানির উচ্চমূল্য প্রভাব ফেলেছে। এই সঙ্কট থেকে উত্তরণ কোনো সাময়িক পদক্ষেপ বা জোড়াতালি দেয়া সিদ্ধান্তে সম্ভব নয়। দেশে বরাবরই চুরি-লুণ্ঠনের বড় খাত জ্বালানি খাত। এ খাতে দীর্ঘদিনের চুরি-লুণ্ঠনের খেসারত জাতিকে দিতে হয়, হচ্ছে। সময়ে সময়ে সরকার বদল হয়, আর এ চুরির ধরন বদলায়। একে চুরি না বলে বলা হয়, সিস্টেম লস। আর পরিস্থিতি সামলানো হয় জোড়াতালি বা অ্যাডহকে। সিস্টেম লসের নামে যে অপচয় হয় এবং অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে যে লুণ্ঠন চলে, তা কঠোর হাতে দমন হলে অবস্থা এ পর্যায়ে যায় না। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছাড়া জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়। বিশ্ববাজারের অস্থিরতাকে দোষ দেয়া যাবে, ফয়সালা আসবে না। চলমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি ও বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান সঙ্কট মোকাবেলায় বিদ্যুতের পাইকারি এবং খুচরা মূল্যহার সমন্বয়ের প্রস্তাব তৈরি করতে একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করেছে সরকার। এই কমিটি এমন এক প্রেক্ষাপটে গঠিত হলো- যখন বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম নির্ধারণের আইনি কাঠামো গত কয়েক বছরে একাধিকবার বদলেছে। এ কমিটি জ্বালানির হাল পরিস্থিতি বিস্তারিত পর্যালোচনার পর বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা মূল্যহার সমন্বয়ের বিষয়ে মন্ত্রিসভা বৈঠকের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেবে এই কমিটি। মোটকথা, বিদ্যুতের দাম আবার বাড়বে। সরকারি ভাষায় বাড়বে বা বৃদ্ধি বলা হয় না। একে বলা হবে, সমন্বয়। তা করতে গিয়ে কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা করতে হবে না। কারো কথা শুনতেও হবে না।
২০২২ সালের শেষে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন-বিইআরসি, আইন সংশোধন করে ৩৪(ক) ধারা যোগ করা হয়। ওই ধারার মাধ্যমে গণশুনানি ছাড়াই নির্বাহী আদেশে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানির দাম সমন্বয়ের ক্ষমতা সরকারের হাতে যায়। ২০২৩ সালের শুরুতে সরকার ওই ক্ষমতা ব্যবহার করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার যুক্তি দেখিয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ জারি করে ওই ৩৪(ক) ধারা বিলোপ করা হয়। তখন সরকার বলেছিল, এর ফলে গণশুনানি ছাড়া নির্বাহী আদেশে দাম নির্ধারণের ব্যবস্থা তুলে দেয়া হচ্ছে এবং বিষয়টি আবার বিইআরসির প্রক্রিয়ায় ফিরছে। এতে প্রায় দেড় বছর পর গ্যাস, বিদ্যুৎসহ অন্যান্য জ্বালানির দাম বাড়ানো বা কমানোর ক্ষমতা আবার বিইআরসির কাছে ফিরে যায়। এ ক্ষমতা কার কাছে ছিল বা গেল মানুষের এতসব ভাবনা বা বিশ্লেষণের ফুরসত নেই। নৈতিকতার বোধ ফাঁকা হয়ে গেলে অভিযান, ধরপাকড়, জেল-জরিমানা বা আরো বড় সাজা দিয়েও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। জ্বালানি তেল নিয়ে ক’দিনের তেলেসমাতিতে তা আবারো প্রমাণিত। জ্বালানি তেলের পর সয়াবিন তেল মজুদও করছে যার যার সাধ্য মতো। এতে অবধারিতভাবে তৈরি হবে সঙ্কট।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট



