পশ্চিমবঙ্গের ৩৪ শতাংশ মুসলিম ভোট বিজেপির অস্বস্তি, তৃণমূলের চিন্তা

মুসলিম ভোট এক নির্ণায়ক শক্তি থেকে আরেক নির্ণায়ক শক্তিতে পরিণত হতে যাচ্ছে। মালদহ-মুর্শিদাবাদের ঘটনাও তৃণমূলকে ব্যাকফুটে নিয়ে গেছে বলে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। পশ্চিম উত্তরাংশের জেলাগুলোতে তৃণমূলের ভোটে কার্যত ভাটার টান লক্ষ করা যাচ্ছে। ২৩ ও ২৯ এপ্রিল এ দু’দফাতে ভোট। ৪ মে ভোট গণনা। আমাদের সে দিকে নজর রাখতে হবে।

মোহাম্মদ সাদউদ্দিন
মোহাম্মদ সাদউদ্দিন |নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

পশ্চিমবঙ্গের এক বিশিষ্ট রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক একবার প্রকাশ্যে বলেছিলেন, কাগজে-কলমে সংখ্যালঘু মুসলিম ভোট দেখানো হয় ২৭-২৮ শতাংশ; কিন্তু বাস্তবে ৩৪-৩৫ শতাংশ। এই ভোট পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে কার্যত একটি ম্যাজিক ফিগার। বলা যায় নির্ণায়ক শক্তি। পাওয়ার অব ব্যালেন্স। এই ভোট যেই রাজনৈতিক দলের দিকে ঝুঁকবে সেই দল ক্ষমতাসীন হবে। সেই বিশিষ্ট পর্যবেক্ষকের কথাটি যে শতভাগ সত্য তা বারবার প্রমাণ হয়েছে।

১৯৭৭-২০১১ সাল পর্যন্ত সিপিআই (এম) নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় ছিল সংখ্যালঘু মুসলিম ভোটের জোরে। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকে বিজেপির উত্থান হয়েছিল রামরথ যাত্রা ঘিরে। পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে বামফ্রন্টকে ভোট দিয়ে বাম-দুর্গকে ৩৪ বছর অটুট রেখেছিল সংখ্যালঘু মুসলিম সমাজ। এমনকি ১৯৯৮ সালে গঠিত হলেও বিজেপির জোটসঙ্গী ছিল বলে মুসলিম ভোট তৃণমূলের বিরুদ্ধে ছিল। কিন্তু সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম জমি আন্দোলন, কলকাতার পার্ক-সার্কাস তিলজলা লেনে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার রিজওয়ানুর রহমানের রহস্যজনক মৃত্যু সংখ্যালঘু মুসলিম ভোটকে বামবিরোধী করে তোলে। সর্বোপরি সাচার কমিটির রিপোর্টে পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম সমাজের সরকারি চাকরিতে করুণ চিত্র রাজ্যের মুসলিম ভোটকে বামবিরোধী করেছে।

পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম ভোট ২০০৮ সাল থেকে এ যাবৎ পর্যন্ত তৃণমূলের একটি ভরসার জায়গা তৈরি করে দেয়, বিশেষ করে বিজেপিকে আটকাতে। কিন্তু ২০১১-২৬ পর্যন্ত সাচার কমিটির সুপারিশমালা সেভাবে কার্যকর করেনি। শুধু মুসলিম সমাজের আবেগকে ভোটব্যাংক হিসেবে তুরুপের তাসের মতো ব্যবহার করতে লাগল। বিজেপি নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখল, পশ্চিমবঙ্গে দলের ক্ষমতায় প্রবল বাধা ৩৪-৩৫ শতাংশ মুসলিম ভোট। যেহেতু বিজেপিকে আটকাতে গেলে মুসলিমদের কাছে ভরসার জায়গা সেই তৃণমূল। আর বিজেপি জুজু দেখিয়ে তৃণমূল এ রাজ্যের মুসলিম ভোটকে একাট্টা করেছে; কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সমাজ তৃণমূলকে নিয়ে হতাশ বলা চলে। বিশেষ করে সাচার কমিটির রিপোর্টের সুপারিশ কার্যকর করার যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল তা কতখানি বাস্তবায়ন হয়েছে এটি বড় প্রশ্ন।

সাচার কমিটির রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার পর বিচারপতি রঙ্গনাথ মিশ্র কমিশন মুসলিমদের কিছু গোষ্ঠীকে অনগ্রসর শ্রেণীর তালিকায় (ওবিসি) এনে চাকরিতে সংরক্ষণের সুযোগের বন্দোবস্ত করে; কিন্তু বিচারের নামে তা কার্যত ঠাণ্ডা হয়ে গেছে তৃণমূল জমানায়। বাম জমানাতে মুসলিমদের ৬৫ ধরনের গোষ্ঠীকে অনগ্রসর শ্রেণীর তালিকায় এনে চাকরিতে ১০ শতাংশ সুযোগের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তৃণমূলের জমানাতে বিজেপি এর বিরুদ্ধে মামলা করলে তা আদালতের হিমঘরে চলে গেছে। তৃণমূল কোনো ভালো উকিল দিয়ে মোকাবেলা করালে মুসলিমরা ওবিসি বা অনগ্রসর শ্রেণীর সংরক্ষণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতো না। এ অভিযোগ স্বয়ং মুসলিম সমাজের। প্রতিশ্রুতি মোতাবেক তৃণমূলের আমলে ১০ হাজার মাদরাসাকে আজও আর্থিক অনুমোদন দেয়া হয়নি। এসব মাদরাসা আজ আর্থিক অনুমোদন পেলে একটি বড় ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগ হতো মুসলিম সমাজের। আজকে মাদরাসাপড়ুয়ারা কলকাতার রাস্তায় দীর্ঘ দিন ধরে ধরনায় অবস্থানরত। শিক্ষকতাসহ বিভিন্ন দফতরে চাকরির যে লাগামছাড়া দুর্নীতি তার শিকার হয়েছেন শিক্ষিত মুসলিম তরুণ-তরুণীরা। তৃণমূলের ১৫ বছরের রাজত্বকলে লাগামহীনভাবে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বেড়েছে অনেকটা মোটিভেটেডভাবে।

তৃণমূল মনে করেছে, এভাবে উত্তেজনা হলে মুসলিম ভোট আতঙ্কে থাকবে। আর তৃণমূলকে ভোট দিতে বাধ্য হবে। তারপরে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের অধীনস্থ নির্বাচন কমিশনের আনা এসআইআর মানুষকে ভোটারহীন করার ষড়যন্ত্র দারুণভাবে আতঙ্কিত করে তুলেছে। বিজেপি চাইছে নির্বাচন কমিশন দিয়ে নাগরিকদের ভোটারহীন করে নিজে নির্বাচনে জয় ডঙ্কা বাজাতে। নির্বাচন কমিশন এসআইআর করার আগে ঘোষণা দিয়েছিল, যাদের নাম ২০০২ সাল পর্যন্ত ভোটার তালিকাতে রয়েছে তাদের ও তাদের সন্তানদের কোনো ডকুমেন্টস বা তথ্য দিতে হবে না।

পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়ার পর প্রথম যে খসড়া তালিকা প্রকাশিত হয়েছে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, তাতে খুব একটা নাম বাদ যায়নি। পাওয়া যায়নি কোনো বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী বা রোহিঙ্গা। কিন্তু খসড়া তালিকা থেকে লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি ও ম্যাপিং করার নামে ৯১ লাখ ভোটার ডিলিটেড অর্থাৎ- বাদ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২৭ লাখ বিচারাধীন (আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন) ভোটারও বাদ পড়েছে। বাকি হলো ৬৪ লাখ। ভারতীয় সংবিধানে একবার ভোটার তালিকায় নাম উঠলে কোনোভাবে তার নাম বাদ দেয়া হলো সংবিধানবিরোধী।

২০০২ সালে বিজেপি নেতা অটলবিহারি বাজপেয়ি ক্ষমতায়। পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় বামফ্রন্ট সরকার। তখনো আইআর অর্থাৎ- ইনটেনসিভ রিভিশন হয়েছিল। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বলে দিয়েছিলেন, মৃত ভোটার বাদ যাক। অবৈধ ভোটার বাদ যাক; কিন্তু কোনো প্রকৃত ভোটার যেন বাদ না যায়। আর মোদি-অমিত শাহের আমলে সবধরনের তথ্য বা ডকুমেন্টস দেয়া সত্যেও লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি ও ম্যাপিংয়ের নামে যে ৯১ লাখ নাগরিককে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়া হলো- তার মধ্যে ৪০ শতাংশ সংখ্যালঘু মুসলিম। ৬০ শতাংশ আদিবাসী, দলিত, তফসিলি জাতি-উপজাতি, মতুয়া, অনগ্রসর শ্রেণী ও নমশূদ্র হিন্দু। একেবারে প্রান্তিক মানুষ।

আদালতে মামলা-পাল্টামামলা। তারপরও সংখ্যালঘু ভোট নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল তৃণমূল যেমন চিন্তিত, তেমনি চিন্তিত কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। এবারের সংখ্যালঘু মুসলিমরা তৃণমূল ও বিজেপির ওপর বেজায় খাপ্পা। মুসলিমদের বক্তব্য- স্পেনের কায়দায় ক্ষমতাসীন বিজেপি-আরএসএস মুসলিমদের অস্তিত্ব ভারত থেকে মুছে দিতে চাইছে। পশ্চিমবঙ্গের কাছের রাজ্য আসামে এনআরসি করতে গিয়ে বাঙালি হিন্দুরা তার শিকার হয়েছেন। মুসলিমরা কম হয়েছেন। ঠিক পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর করতে গিয়ে বাঙালি হিন্দুরা সহজ শিকারে পরিণত হয়েছেন। মুসলিমরা যেখানে ৪০ শতাংশ, সেখানে হিন্দু সম্প্রদায় ৬০ শতাংশ।

পশ্চিমবঙ্গে ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রে ২৫ থেকে ৩০ হাজার ভোটার বাদ গেছে। তারপরও মুসলিম ভোট একটা নির্ণায়ক শক্তি। তৃণমূলের দায়িত্ব ছিল লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি ও ম্যাপিংয়ের নামে যেভাবে পশ্চিমবঙ্গের প্রান্তিক মানুষকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়া হলো তা দেখা। তৃণমূলের ১৫ বছরের ক্ষমতায় মুসলিম ভোট ছিল একটি নির্ণায়ক শক্তি। মনেপ্রাণে বিজেপিকে আটকাতে তৃণমূলকে ক্ষমতায় রাখতে মুসলিম ভোট একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেই তুলনায় মুসলিমদের দাবিদাওয়া সেভাবে পূরণ করেনি তৃণমূল। বিশেষ করে ওবিসি কোটায় কোনো চাকরির সংরক্ষণ মুসলিমরা পায়নি। সাচার কমিটির সুপারিশ অনুসারে পশ্চিমবঙ্গের ওয়াক্ফ সম্পত্তি সেভাবে কাজে লাগানো হয়নি। ওয়াক্ফ সম্পতি সরকারি তালিকায় রাখার প্রবণতা দেখা গেছে। বিজেপি একজন মুসলিম প্রার্থীও করতে পারেনি। তার ওপর মুসলিমদের অনুপ্রবেশকারী বা রোহিঙ্গা মনে করে বিজেপি নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে ভোটারহীন করেছে। ৯১ লাখ ভোটারহীনের মধ্যে ৪০ শতাংশ মুসলিম। তৃণমূলও এ নিয়ে কোনো সদর্থক ভূমিকা পালন করতে পারেনি। ফলে মুসলিম ভোট তৃণমূলের কাছ থেকেও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে বলে মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

এখন প্রশ্ন, মুসলিম ভোট কোন দিকে যেতে পারে? তৃণমূলের মুসলিম নেতারা মুসলিম ভোটে জিতে মমতা ব্যানার্জি নামক অনুপ্রেরণাকে সামনে রেখে কেবল নিজেদের স্বার্থ পূরণ করেছেন। এই মুসলিম নেতাদের একাংশ ওয়াক্ফ সম্পত্তি জবরদখল করে রেখে তাতে প্রমোটারি ব্যবস্থা কায়েম করেছেন বলে অভিযোগ।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বিভাগ-পরবর্তী সময়ে ফুরফুরার পীরজাদা নওশাদ সিদ্দিকী ও তার প্রতিষ্ঠিত দল ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট বা আইএসএফ একটি গ্রহণযোগ্য জায়গায় অবস্থান করছে। নানা রকম পন্থা অবলম্বন করে পীরজাদা নওশাদ সিদ্দিকীকে নিজের তৃণমূল দলে ভিড়াতে পারেননি দলের সুপ্রিমো তথা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। এটি মমতার কাছে আরেকটি অস্বস্তি। এ দল মুসলিম-দলিত-আদিবাসী-ওবিসি-এসসি-এসটিদের অধিকার নিয়ে কাজ করছে। ফলে মুসলিম ও দলিতদের ভোটে নওশাদ সিদ্দিকীর আইএসএফ ভাগ বসাতে পারেন। নওশাদ সিদ্দিকীর ভাবমর্যাদা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। তার আইএসএফ এবং এসডিপিআই, সিপিআই (এম) নেতৃত্বাধীন বাম দলগুলোর মধ্যে যে মহাজোট হয়েছে তা অনেকটা উত্থান-শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। ফলে বিজেপি ও তৃণমূল অনেকটা অস্বস্তিতে। এতে বেশ চিন্তায় রেখেছে।

মুসলিম ভোট এক নির্ণায়ক শক্তি থেকে আরেক নির্ণায়ক শক্তিতে পরিণত হতে যাচ্ছে। মালদহ-মুর্শিদাবাদের ঘটনাও তৃণমূলকে ব্যাকফুটে নিয়ে গেছে বলে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। পশ্চিম উত্তরাংশের জেলাগুলোতে তৃণমূলের ভোটে কার্যত ভাটার টান লক্ষ করা যাচ্ছে। ২৩ ও ২৯ এপ্রিল এ দু’দফাতে ভোট। ৪ মে ভোট গণনা। আমাদের সে দিকে নজর রাখতে হবে।

লেখক : কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক ও কবি