মধ্যপ্রাচ্যে অন্য অঞ্চলের চেয়ে তেল-গ্যাস বেশি কেন

মধ্যপ্রাচ্যের প্রত্যেকটি তেল সমৃদ্ধ এলাকায় অন্তত পাঁচ বিলিয়ন বা ৫০০ কোটি ব্যারেল ক্রুড বা অপরিশোধিত তেল রয়েছে। এছাড়া এই অঞ্চলের তেলকূপগুলোতে প্রতিদিন যে পরিমাণ তেল উৎপাদিত হয়, সেটি উত্তর সাগর বা রাশিয়ার সেরা তেলকূপগুলোর উৎপাদনের তুলনায় দুই থেকে পাঁচ গুণ বেশি।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর বিশাল তেল ও গ্যাসের সম্পদ একইসাথে তাদের জন্য যেমন সৌভাগ্য, তেমনি অনেক পরীক্ষার মুখোমুখিও করেছে।

লাখ লাখ বছর ধরে চলা ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া এই অঞ্চলটিকে বৈশ্বিক জ্বালানি কেন্দ্রে পরিণত করেছে। এ কারণেই বর্তমান যুদ্ধের (ইরান, ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ) মতো মধ্যপ্রাচ্যে বড় কোনো সঙ্ঘাত শুরু হলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সঙ্কট তৈরি হয়।

এই অঞ্চলের হাইড্রোকার্বন মজুতের ব্যাপকতা দেখে অবাক হওয়া স্বাভাবিক। উদাহরণস্বরূপ- পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ৩০টিরও বেশি তেল সমৃদ্ধ এলাকা রয়েছে, যেগুলোকে ‘সুপারজায়ান্ট’ বলা হয়।

এই এলাকার প্রত্যেকটিতে অন্তত পাঁচ বিলিয়ন বা ৫০০ কোটি ব্যারেল ক্রুড বা অপরিশোধিত তেল রয়েছে। এছাড়া এই অঞ্চলের তেলকূপগুলোতে প্রতিদিন যে পরিমাণ তেল উৎপাদিত হয়, সেটি উত্তর সাগর বা রাশিয়ার সেরা তেলকূপগুলোর উৎপাদনের তুলনায় দুই থেকে পাঁচ গুণ বেশি।

আধুনিক ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান শিলা বা পাথরের মধ্যে এমন কিছু উপাদান চিহ্নিত করেছে যেটি এই অঞ্চলকে তেলসমৃদ্ধ করেছে।

এর মধ্যে এই অঞ্চলের দেশগুলোর হাইড্রোকার্বন উৎপাদন এবং সেটি জমা রাখার সক্ষমতা অন্যতম। এই সবগুলো উপাদানই পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে আদর্শ অথবা এর কাছাকাছি স্তরে বিদ্যমান। এই বিশাল সম্পদ এবং সহজ উৎপাদন পদ্ধতির কারণেই কার্যত এই অঞ্চলটি সবার চেয়ে অনেক এগিয়ে রয়েছে। একইসাথে এই অঞ্চলের নিকটতম কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীও নেই।

সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

শেষ বরফযুগের শেষে অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ১৪ হাজার থেকে ছয় হাজার বছর আগে বন্যার ফলে যখন পারস্য উপসাগর গঠিত হয় তখনই হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতি সম্পর্কে জানতে পারে মানুষ। এই অঞ্চলের অনেক এলাকায়ই নদী ও উপত্যকায় প্রাকৃতিকভাবেই ক্রুড বা অপরিশোধিত তেল ও গ্যাসের নিঃসরণ স্বাভাবিক ঘটনা।

হাজার হাজার বছর আগেই মানুষ নৌকাকে পানিনিরোধক করতে এবং গাঁথুনির কাজে বিটুমিন ব্যবহার করত। যেটি এক ধরনের ভারী পেট্রোলিয়াম।

১৯০৮ সালে পশ্চিম ইরানের একটি সুপরিচিত প্রাকৃতিক তেলের উৎস থেকে আধুনিক যুগের প্রথম তেলের সন্ধান পাওয়া যায়। ১৯৫০ এবং ১৯৬০ এর দশকে যখন তেল ও গ্যাসের অনুসন্ধান ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়, তখন এটি স্পষ্ট হয়ে যায় যে বিশ্বের আর কোনো অঞ্চলেই এত বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদের মজুত নেই।

বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও বিশাল তেল ও গ্যাস আবিষ্কার হয়েছে। যেমন- রাশিয়ার পশ্চিম সাইবেরিয়া এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের পারমিয়ান বেসিনে তেল ও গ্যাসের মজুতের সন্ধান পাওয়া গেছে।

তবে এগুলোর কোনোটিই পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের বিশাল মজুত অথবা ক্রুড বা অপরিশোধিত তেল ও গ্যাসের উচ্চ উৎপাদন হারের সাথে পাল্লা দিতে পারে না। যেটি এই অঞ্চলকে ইউনিক বা অনন্য করে তুলেছে।

ভূতাত্ত্বিক অবস্থান

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল এমন একটি স্থানে অবস্থিত যেখানে দু’টি বিশাল টেকটোনিক প্লেট মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এই দু’টি প্লেট হলো দক্ষিণ-পূর্বে অ্যারাবিয়ান প্লেট এবং পূর্ব ও উত্তরে ইউরেশীয় প্লেট। এই সংঘর্ষ প্রায় ৩৫ মিলিয়ন বা সাড়ে তিন কোটি বছর ধরে চলছে।

এর ফলে তৈরি হয়েছে এক গতিশীল ভূ-প্রকৃতি। যেখানে ভূ-গর্ভের তীব্র তাপ এবং চাপে শিলাস্তরগুলো দুমড়ে-মুচড়ে গেছে এবং রূপান্তরিত হয়েছে।

উপসাগরের দুই তীরের ভূতাত্ত্বিক গঠন একেবারেই ভিন্ন।

ইরানের দিকে ১ হাজার ৮০০ কিলোমিটার-জুড়ে জাগরোস পর্বতমালা যেটি ওমান উপসাগর থেকে তুরস্ক সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত।

আল্পাইন-হিমালয় পর্বত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে গত ৬০ মিলিয়ন বা ছয় কোটি বছরে ইউরেশিয়ার সাথে আফ্রিকা, আরব ও ভারতের সংঘর্ষের ফলে এই ভাঁজ পড়া ও ফাটলযুক্ত জাগরোস পর্বতমালার সৃষ্টি হয়েছে।

উপসাগরের আরব উপকূলের শিলাগুলোতে এ ধরনের পরিবর্তন বা ভাঙন দেখা যায়নি।

এর পরিবর্তে প্লেটগুলোর সংঘর্ষে তৈরি হওয়া প্রবল চাপে ভূ-গর্ভের গভীরে থাকা শক্ত ও কঠিন শিলাস্তর (বেইজমেন্ট রক নামে পরিচিত), বেঁকে গিয়েছে।

এর ফলে তৈরি হয়েছে বিশাল গম্বুজের আকৃতির কাঠামো, যা কয়েক ডজন বা শত শত বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত।

পারস্য উপসাগরের নিচে রয়েছে একটি অববাহিকা, যেটি জাগরোস পর্বতমালার উত্থানের ফলে ক্ষয়ে যাওয়া পলি দিয়ে ভরাট হয়েছে।

এই অববাহিকার গভীর অংশে এমন উচ্চ তাপমাত্রা এবং চাপ ছিল যা তেল ও গ্যাস তৈরির জন্য প্রয়োজন।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, এই অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক পরিবেশ বড় পরিসরে হাইড্রোকার্বন উৎপাদন এবং সংরক্ষণ করে রাখার জন্য খুবই উপযোগী।

ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত তেল উৎপাদনকারী শিলা

সামুদ্রিক জীব যেমন- জুওপ্ল্যাঙ্কটন এবং ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের জৈব পদার্থ থেকে ক্রুড বা অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস তৈরি হয়। এই উপাদানগুলো প্রথমে কাদামাটি সমৃদ্ধ চুনাপাথর এবং অন্যান্য শিলার স্তরে ঘনীভূত হয় এবং পরে উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপের সংস্পর্শে আসে।

যখন কোনো শিলায় অন্তত দুই শতাংশ জৈব পদার্থ থাকে, তখন সেটিকে তেল ও গ্যাস উৎপাদনের জন্য উচ্চমানের সোর্স রক বা শিলার উৎস হিসেবে ধরা হয়।

বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল এই ধরণের শিলাস্তরে সমৃদ্ধ। এর কিছু স্তর অত্যন্ত পুরু এবং জৈব পদার্থে সমৃদ্ধ। আরব উপসাগরীয় উপকূলের হানিফা ও তুওয়াইক শিলাস্তর এর উদাহরণ। যা প্রায় ২০০ থেকে ১৪৫ মিলিয়ন বা ২০ কোটি থেকে ১৪ দশমিক পাঁচ কোটি বছর আগে জুরাসিক যুগে গঠিত হয়েছিল।

একইভাবে ইরানের খুজেস্তান শিলাস্তরটি প্রায় ১৪৫ থেকে ৬৬ মিলিয়ন বা ১৪ দশমিক পাঁচ কোটি থেকে ছয় দশমিক ছয় কোটি বছর আগে ক্রিটেসিয়াস যুগে তৈরি হয়।

এই শিলাস্তরগুলোতে জৈব পদার্থের পরিমাণ এক শতাংশ থেকে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত এমনকি কোথাও কোথাও এর চেয়েও বেশি।

তেল ও গ্যাস মজুতের গঠন

এই অঞ্চলের ভাঁজ পড়া ও ফাটলযুক্ত শিলাস্তর এবং গম্বুজ আকৃতির কাঠামো হাইড্রোকার্বন আটকে রাখা ও সংরক্ষণের জন্য খুবই উপযোগী।

জাগরোস পর্বতমালার এই বাঁকগুলো চমৎকার গঠনের জন্য ভূতাত্ত্বিকদের কাছে বেশ পরিচিত, যা স্যাটেলাইট ছবিতেও স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

এখানে কয়েক শ’ বিলিয়ন ব্যারেল তেল এবং কয়েক ট্রিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস মজুত রয়েছে।

পারস্য উপসাগরের তেল ও গ্যাসক্ষেত্রের মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে লম্বাটে বা সসেজের মতো দেখতে অনেকগুলো কাঠামো রয়েছে, যা এখানকার বিশাল ও বাঁকানো ভূ-প্রকৃতির প্রতিফলন।

দক্ষিণ ইরান থেকে উত্তর-পূর্ব ইরাক পর্যন্ত বিস্তৃত এই কাঠামোগুলোর মধ্যে বিভিন্ন আকারের শত শত খনি বা রিজার্ভার রয়েছে।

আরব প্লেটের বিশাল গম্বুজ আকৃতির কাঠামোতে তেল ও গ্যাসের বিশাল মজুত তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরবের ঘাওয়ার তেলক্ষেত্র, এটি বিশ্বের বৃহত্তম তেলক্ষেত্র।

এখান থেকে ৭০ বিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি ক্রুড বা অপরিশোধিত তেল উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।

একইভাবে সাউথ পার্স-নর্থ ডোম গ্যাসক্ষেত্র থেকে অন্তত ৪৬ বিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

এটা শক্তির দিক থেকে ২০০ বিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি তেলের সমান।

এই অঞ্চলের প্রধান রিজার্ভ শিলা হলো চুনাপাথর।

এই পাথরের কিছু অংশ প্রাকৃতিকভাবেই দ্রবীভূত হয়ে গেছে, যেটি তেল ও গ্যাসের প্রবাহকে সহজ করে।

জাগরোস খনিগুলোতে ভূ-তাত্ত্বিক প্লেটগুলোর সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট ফাটল দিয়ে তেল ও গ্যাস চলাচল করে।

সৌদি আরবের ঘাওয়ার তেলক্ষেত্রের আরব-ডি স্তর এবং জাগরোস সমভূমির সামারিটান চুনাপাথরই এ ধরনের উচ্চমানের রিজার্ভ শিলার উদাহরণ। যা শত শত বা এমনকি হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে।

পৃথিবী বা মহাসাগরের আর কোথাও এই স্কেলে ভূতাত্ত্বিক কাঠামো দেখা যায় না যা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের পেট্রোলিয়াম ভূতত্ত্বকে অনন্য ও অতুলনীয় করে তুলেছে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

এই সব কারণের সম্মিলিত প্রভাবে পৃথিবীর মাত্র তিন শতাংশ ভূ-ভাগের নিচে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক তেল এবং ৪০ শতাংশ গ্যাস মজুদ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার মতে, এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে উৎপাদন চলার পরেও এই অঞ্চলে আরো বিশাল তেলের ভাণ্ডার আবিষ্কৃত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।

সংস্থাটির ২০১২ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যারাবিয়ান পেনিনসুলা এবং জাগরোস পর্বতমালায় এর আগে আবিষ্কার হওয়া তেল, গ্যাসের বাইরেও আরো প্রায় ৮৬ বিলিয়ন ব্যারেল তেল এবং নয় দশমিক পাঁচ ট্রিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস থাকতে পারে।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে ২০০০ এবং ২০১০ এর দশকে উদ্ভাবিত হরাইজন্টাল ড্রিলিং এবং ফ্র্যাকচারিং এর মতো প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদন আরো বাড়ানো সম্ভব।

সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেলক্ষেত্রগুলোতে এই পদ্ধতিগুলো পরীক্ষা করা হচ্ছে। তবে এই পদ্ধতিগুলো কতটা সফল হবে সেটি বলার সময় এখনো আসেনি। যদিও গবেষণা বলছে, এর মাধ্যমে উৎপাদন আরো বাড়তে পারে।

সূত্র : বিবিসি