ইসরাইলক চোখ বুজে সমর্থন করার দীর্ঘদিনের মার্কিন নীতিতে এবার বড়সড় ফাটল দেখা দিয়েছে। মার্কিন সিনেটে ইসরাইলের কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধের একটি প্রস্তাব পাস হতে ব্যর্থ হলেও, ডেমোক্র্যাট শিবিরের বিপুল সংখ্যক সদস্যের এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। এ ঘটনাকে 'ঐতিহাসিক বাঁক' হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটনের রাজনীতিতে ইসরাইলকে বিনা শর্তে সাহায্য করার যে সংস্কৃতি এতদিন চালু ছিল, তা এবারে চরম চ্যালেঞ্জের মুখে।
সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ইসরাইলের কাছে সামরিক কাজে ব্যবহৃত বুলডোজার বিক্রি বন্ধের লক্ষ্যে এই ভোটাভুটির প্রস্তাব আনেন। প্রস্তাবটি ৪০-৫৯ ভোটে হেরে গেছে কিন্তু ডেমোক্র্যাটদের একটি বিশাল অংশ এই প্রস্তাবের পক্ষে দাঁড়িয়েছে।
রিপাবলিকানরা ঐক্যবদ্ধভাবে প্রস্তাবের বিপক্ষে থাকলেও ডেমোক্র্যাট শিবিরের মাত্র সাতজন সদস্য দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়ে অস্ত্র বিক্রির পক্ষে ভোট দিয়েছেন। এতে স্পষ্ট যে, মার্কিন সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ ডেমোক্র্যাট সদস্য এখন ইসরাইলকে শর্তহীন সামরিক সহায়তা দেয়ার বিরোধী।
আল জাজিরার প্রতিবেদন বলছে, এই ফাটল কেবল বুলডোজার বিক্রির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গত বুধবার পৃথক একটি ভোটাভুটিতে ৩৬ জন ডেমোক্র্যাট সিনেটর ইসরাইলের কাছে ৪৫০ কেজি ওজনের শক্তিশালী বোমা পাঠানো বন্ধের পক্ষেও ভোট দিয়েছেন। তুলনা করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালে মাত্র ১৮ জন এবং গত বছর ২৭ জন সিনেটর এই ধরনের প্রস্তাবের পক্ষে ছিলেন। অর্থাৎ, খুব দ্রুতই ইসরাইলের প্রতি মার্কিন আইনপ্রণেতাদের সমর্থন কমছে।
ফ্রেন্ডস কমিটি অন ন্যাশনাল লেজিসলেশন এর পরিচালক হাসান এল-তায়াব বলেন, এটি কেবল অস্ত্র বিক্রির বিরুদ্ধেই ভোট নয়, বরং ইরান ও লেবাননের সাথে একটি বৃহত্তর যুদ্ধের উস্কানির বিরুদ্ধেও এক জোরালো প্রতিবাদ।
উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই ইরানের বিরুদ্ধে বিনা উসকানিতে যৌথ সামরিক অভিযান শুরু করেছেন। এই আগ্রাসী তৎপরতার জেরে মার্কিন রাজনীতিতে ইহুদিবাদী ইসরাইল বিরোধী ক্ষোভ আরও তীব্র হয়েছে। এমনকি একসময় ইসরাইলের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত অ্যাডাম শিফ ও কোরি বুকারের মতো সিনেটররাও এবার স্যান্ডার্সের প্রস্তাবকে সমর্থন করেছেন।
ইসরাইলের সামরিক বাহিনী গাজা এবং দক্ষিণ লেবাননে বুলডোজার ব্যবহার করে যেভাবে একের পর এক জনপদ মাটির সাথে মিশিয়ে দিচ্ছে, মানবাধিকার কর্মীরা একে 'জাতিগত নিধন' হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। বার্নি স্যান্ডার্স এক বিবৃতিতে বলেছেন, মার্কিন নাগরিকরা তাদের ট্যাক্সের টাকা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের নিরপরাধ নারী-শিশুদের হত্যা করতে চান না। পিউ রিসার্চ সেন্টারের সাম্প্রতিক জরিপেও দেখা গেছে, ৬০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইসরাইলকে নেতিবাচকভাবে দেখছেন এবং ৫০ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে এই হার প্রায় ৭০ শতাংশ।
ভোটের এই ফলাফলকে 'শোভন পরাজয়' হিসেবে দেখছে অধিকার রক্ষা গোষ্ঠীগুলো। 'জিউয়িশ ভয়েস ফর পিস' অ্যাকশনের রাজনৈতিক পরিচালক বেথ মিলার আল জাজিরাকে বলেন, ৪০ জন সিনেটরের এই অবস্থান প্রমাণ করে যে ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র জোটের রাজনৈতিক স্তম্ভে বড় ধরনের ফাটল ধরেছে। তবে ডেমোক্র্যাটদের শীর্ষ নেতা চাক শুমার এই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেওয়ায় নিজ দলেই ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন। প্রগ্রেসিভ কংগ্রেস সদস্য রো খান্না এমনকি শুমারকে নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। রিপাবলিকানরা অবশ্য ডেমোক্র্যাটদের এই অবস্থানকে 'সন্ত্রাসবাদের পক্ষ নেয়া' বলে আক্রমণ করেছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন জনমতের যে পরিবর্তন শুরু হয়েছে, সিনেটের এই ভোট তারই একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।



