যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানায় নিজের সাত সন্তানসহ মোট আটটি শিশুকে হত্যা করেছেন এক ব্যক্তি। স্ত্রীর সাথে বিরোধের জের এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্থানীয় সময় রোববার (১৯ এপ্রিল) সকালে ডাউনটাউন শ্রিভপোর্টের দক্ষিণে একটি এলাকার দুটি বাড়িতে হামলা চালিয়ে তিনি এ ঘটনা ঘটান বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
ঘাতক ব্যক্তির নাম শামার এলকিন্স (৩১)। তিনি লুইজিয়ানার শ্রিভপোর্ট এলাকার বাসিন্দা।
পুলিশ জানান, সব শিশু একই বাড়িতে নিহত হয়েছে এবং তাদের বয়স ছিল ৩ থেকে ১১ বছরের মধ্যে। এসব শিশুদের মধ্যে তিনজন ছেলে ও পাঁচজন মেয়ে ছিল।
এই হামলা শ্রিভপোর্ট এলাকায় সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে দেশের সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলার মধ্যে অন্যতম। এ ঘটনায় স্তব্ধ হয়ে গেছে গোটা এলাকা।
শ্রিভপোর্ট পুলিশ বিভাগের মুখপাত্র ক্রিস বর্ডেলন জানান, দুই নারীকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পাওয়া গেছে এবং তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এর মধ্যে একজন আততায়ী এলকিন্সের স্ত্রী।
তিনি আরো জানান, প্রায় সাথে সাথে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে হামলাকারী এলকিন্সকে ধাওয়া দেয়। এ সময় পুলিশের গুলিতে তিনি নিহত হন।
তবে কী কারণে এই সহিংসতা ঘটেছে, তা এখনো জানা না গেলেও বর্ডেলন বলেন, এটি যে ‘সম্পূর্ণরূপে পারিবারিক’ ঘটনা, সে বিষয়ে তদন্তকারীরা নিশ্চিত।
শ্রিভপোর্ট পুলিশের প্রধান ওয়েন স্মিথ বলেন, ‘এই ঘটনায় আমি বাকরুদ্ধ। কী বলব বুঝতে পারছি না। এমন একটি ঘটনাও যে ঘটতে পারে, তা আমি কল্পনাও করতে পারি না।’
বর্ডেলন বলেন, ‘এলকিন্সকে পুলিশ আগে থেকেই চিনত। অস্ত্র-সংক্রান্ত মামলায় ২০১৯ সালে তাকে একবার গ্রেফতার করা হয়েছিল। তবে কোনো পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা সম্পর্কে তারা ওয়াকিবহাল ছিলেন না।’
পুলিশ জানায়, গতকাল (রোববার) সকালে সূর্য ওঠার আগেই এই অর্তকিত হামলা শুরু হয়। প্রথমে তিনি একটি বাড়িতে ঢুকে এক নারীকে গুলি করেন। এ ঘটনার পরপরই আরেকটি বাড়িতে গিয়ে তিনি একসাথে আটটি শিশুকে গুলি করে হত্যা করেন। বাড়ির ভেতর থেকে সাত শিশু এবং বাড়ির ছাদ থেকে আরো একটি শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, হত্যাকাণ্ডের পর তিনি পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছিলেন।
শ্রিভপোর্ট পুলিশ বিভাগের মুখপাত্র বর্ডেলন জানান, আরেকটি শিশু ছাদ থেকে লাফ দিয়ে প্রাণে বেঁচে গেছে। তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে।
লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের মুখপাত্র ট্যামি ফেল্পস জানান, কয়েকটি শিশু পেছনের দরজা দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিল। তিনি বলেন, ‘ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা যে দৃশ্য দেখেছেন, তা আমি কল্পনাও করতে পারি না।’
স্ত্রীর সাথে বিচ্ছেদের পথে ছিলেন এলকিন্স
আহত নারীদের মধ্যে একজনের চাচাতো বোন ক্রিস্টাল ব্রাউন জানান, শামার এলকিন্স ও তার স্ত্রী বিচ্ছেদের পথে ছিলেন এবং আজ (সোমবার) তাদের আদালতে যাওয়ার কথা ছিল। বিচ্ছেদ নিয়ে তাদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক চলছিল।
তিনি বলেন, ‘এলকিন্স তার সন্তানদের হত্যা করেছে এবং স্ত্রীকে আহত করেছে।’
তিনি আরো জানান, এলকিন্সের তার স্ত্রীর সাথে চারটি সন্তান এবং কাছাকাছি বসবাসকারী আরেক নারীর সাথে আরো তিনটি সন্তান ছিল।
শিশুদের সম্পর্কে ব্রাউন বলেন, ‘শিশুরা সবাই খুব হাসিখুশি, প্রাণোচ্ছল এবং মিষ্টি স্বভাবের ছিল।’
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী প্রতিবেশী যা জানালেন
ঘটনাস্থল থেকে দুই বাড়ি দূরে বসবাস করা লিজা ডেমিং জানান, দুটি গুলির শব্দ শোনার পরপরই তার বাড়ির সিসি ক্যামেরায় এলকিন্সকে দৌড়ে পালাতে দেখা যায়। পরে বাড়িতে গিয়ে ছাদে একটি শিশুর লাশ ঢাকা অবস্থায় দেখতে পান তিনি।
তিনি বলেন, ‘দেখলাম যে তিনি বাড়ি থেকে দৌড়ে বেরিয়ে দ্রুত গাড়িতে উঠে চলে যাচ্ছেন।’
নিকটবর্তী সেন্ট গ্যাব্রিয়েল কমিউনিটি ব্যাপ্টিস্ট চার্চের পাদ্রি মার্টি টি জনসন সিনিয়র জানান, ওই বাড়িটি পরিবারটিকে ভাড়া দিয়েছিলেন তারই এক কর্মচারী। তবে তিনি নিজে তাদের সাথে সরাসরি কোনো যোগাযোগ রাখেননি।
প্যারিশের জেলা অ্যাটর্নির দফতর এক বিবৃতিতে জানায়, একটি পারিবারিক বিরোধ অপূরণীয় ক্ষতির মধ্যে দিয়ে শেষ হলো।
শোকে স্তব্ধ শ্রিভপোর্ট
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, ইউএসএ টুডে ও নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির যৌথ তথ্য অনুযায়ী, রোববারে প্রাণঘাতী ঘটনাটি ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে শিকাগোর একটি উপশহরে আটজন নিহত হওয়ার ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ঘটনা।
ঘটনার পর সংবাদ সম্মেলনে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের অত্যন্ত গম্ভীর অবস্থায় দেখা যায়। তারা ওই এলাকার মানুষের কাছে ধৈর্য ও প্রার্থনা কামনা করেন।
শহরের মেয়র টম আর্সেনো বলেন, ‘এটি একটি মর্মান্তিক পরিস্থিতি; সম্ভবত আমাদের দেখা সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা। এটি ছিল দুঃস্বপ্নময় একটি সকাল।’
ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর শোকাহত মানুষজন ৭৯তম স্ট্রিটের ওই একতলা বাড়িটির সামনে জড়ো হয়ে পুষ্প অর্পণ করেন। সন্ধ্যায় নিকটবর্তী এক প্রার্থনা অনুষ্ঠানে মোমবাতি জ্বালিয়ে নিহতদের স্মরণ করে এলাকাবাসী।
তাদের মধ্যে একজন বলেন, ‘এই ঘটনা সন্তানদের আরো কাছে টেনে নিতে, জড়িয়ে ধরতে এবং আপনি তাদের কতটা ভালোবাসেন, তা বলতে আপনাকে বাধ্য করবে।’
সূত্র : এপি/ইউএনবি



