সব স্তরে শিক্ষাবৃত্তির হার বাড়াচ্ছে সরকার, ব্যয় হবে ৩৬৮ কোটি টাকা

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশের প্রাথমিক থেকে স্নাতক পর্যন্ত সকল স্তরের ‘মেধা’ ও ‘সাধারণ’ শিক্ষাবৃত্তির হার দ্বিগুণ করা হবে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন

দেশের প্রান্তিক ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে সব স্তরের শিক্ষাবৃত্তির হার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

বর্তমান বাজারমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে সঙ্গতি রেখে এ পরিকল্পনা নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশের প্রাথমিক থেকে স্নাতক পর্যন্ত সকল স্তরের ‘মেধা’ ও ‘সাধারণ’ শিক্ষাবৃত্তির হার দ্বিগুণ করা হবে। এতে বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের মাসিক টাকার পরিমাণ ও এককালীন অনুদান আগের চেয়ে বাড়বে। দীর্ঘ ১০ বছর পর এই হার পুনঃনির্ধারণের ফলে সরকারের বাৎসরিক ব্যয় ১৮৪ কোটি টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ৩৬৮ কোটি ১৬ লাখ টাকায় দাঁড়াবে। যা অর্থ বিভাগের বাজেট বরাদ্দসাপেক্ষে বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের এ সিদ্ধান্তে শিক্ষাখাতে ঝরে পড়ার হার যেমন কমবে, তেমনি মেধাবীদের উচ্চশিক্ষায় উৎসাহিত করতে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।

এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের যুগ্মসচিব (মাধ্যমিক-১) মো: সাইদুর রহমান বাসসকে জানান, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এ সংক্রান্ত পর্যালোচনা সভায় দেশের সব ধরনের শিক্ষাবৃত্তির হার দ্বিগুণ করার বিষয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। ওই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরকে (মাউশি) একটি পূর্ণাঙ্গ ও সংশোধিত প্রস্তাব পাঠাতে বলা হয়েছে।

মো: সাইদুর রহমান বলেন, ‘মাউশি শিক্ষাবৃত্তির অর্থের পরিমাণ বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠালে তা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিগত অনুমোদন নেয়া হবে। এরপর প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দের জন্য অর্থ বিভাগে পাঠানো হবে। অর্থ বিভাগের প্রয়োজনীয় বরাদ্দ প্রাপ্তিসাপেক্ষে দ্রুত এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হবে।

গত ৬ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক পর্যালোচনা সভায় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) অধীন সকল ক্যাটাগরির বৃত্তির (পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসি, স্নাতক ও পেশামূলক বৃত্তি) মাসিক হার এবং এককালীন বার্ষিক অনুদান দ্বিগুণ করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

ওই সভায় জানানো হয়, সর্বশেষ ২০১৫-১৬ অর্থবছরে শিক্ষা খাতের সব স্তরের শিক্ষাবৃত্তির হার নির্ধারণ করা হয়েছিল। অর্থাৎ ১০ বছর পর বৃত্তির হার বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে বর্তমান সরকার।

সভাসূত্রে জানা যায়, নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ২ এপ্রিল এ সংক্রান্ত সভায় শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন সব স্তরের শিক্ষাবৃত্তির হার বাড়ানোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন।

গত বুধবার শিক্ষামন্ত্রী ড. মিলন বাসসের সাথে একান্ত আলাপচারিতায় বলেন, ‘বর্তমান মূল্যস্ফীতির সাথে মিল রেখে আমরা দেশের প্রাথমিক বৃত্তি, জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসি ও স্নাতকসহ সকল স্তরের শিক্ষাবৃত্তি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছি। অর্থ বিভাগের কাছে এ বিষয়ে বরাদ্দ চাওয়া হবে। বরাদ্দ প্রাপ্তির পর আমরা শিক্ষার্থীদের বৃত্তির হার বাড়াতে পারব।’

তিনি আরো বলেন, ‘শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে যেসব শিক্ষার্থীরা মেধার স্বাক্ষর রাখছেন-তাদের সব ধরনের প্রণোদনা দিতে প্রস্তুত বতর্মান সরকার। বর্তমানে সারা দেশে (প্রাথমিক থেকে স্নাতক পর্যন্ত) ১ লাখ ৬৯ হাজার ৬৫৯ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি পাচ্ছে। মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষার স্রোত ধারায় ধরে রাখতে আমরা এ সংখ্যা বাড়ানোর চিন্তা-ভাবনা করছি। আমরা শিক্ষার্থীদের জীবনযাত্রার মান সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং তাদের পড়াশোনায় আরো অনুপ্রাণিত করতে চাই।’

মাউশি’র খসড়া প্রস্তাবনা অনুযায়ী, বিভিন্ন স্তরে বৃত্তির মাসিক হার ও এককালীন অনুদান দ্বিগুণ করা হবে। খসড়া প্রস্তাবনায় বিভিন্ন স্তরে বৃত্তির মাসিক হার (অর্থ) নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রাথমিক স্তরে মেধাবৃত্তির হার মাসিক ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬০০ টাকা এবং সাধারণ বৃত্তি ২২৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৫০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। আর জুনিয়র (জেএসসি) মেধাবৃত্তি ৪৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯০০ টাকা এবং সাধারণ বৃত্তি ৩০০ টাকার থেকে বাড়িয়ে ৬০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রস্তাবনায় বলা হয় এসএসসির মেধাবৃত্তি মাসিক ৬০০ টাকার পরিবর্তে ১ হাজার ২০০ টাকা এবং সাধারণ বৃত্তি ৩৫০ টাকার পরিবর্তে ৭০০ টাকা করা হচ্ছে। আর এইচএসসির মেধাবৃত্তির মাসিক হার ৮২৫ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৬৫০ টাকা এবং সাধারণ বৃত্তির হার ৩৭৫ টাকা থেকে ৭৫০ টাকা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ের মেধাবৃত্তি ১ হাজার ১২৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার ২৫০ টাকা এবং সাধারণ বৃত্তি ৪৫০ টাকা থেকে ৯০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। আর স্নাতক (পাস) পর্যায়ে মেধাবৃত্তি ১ হাজার ৫০ টাকার পরিবর্তে ২ হাজার ১০০ টাকা এবং সাধারণ বৃত্তি ৩৭৫ থেকে ৭৫০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বাসসকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে বৃত্তির অর্থের হার অপরিবর্তিত ছিল। বিগত সরকার এ বিষয়ে নজর দেয়নি। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বৃত্তির হার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। একটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাবনা তৈরির কাজ চলছে। শিগগিরই তা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিগত অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।’

বাড়ছে এককালীন অনুদানও

মাউশির খসড়া প্রস্তাবনা অনুযায়ী, মাসিক বৃত্তির পাশাপাশি বার্ষিক এককালীন অনুদানের পরিমাণও দ্বিগুণ হচ্ছে। প্রাথমিকে মেধাবৃত্তি ও সাধারণ বৃত্তি-দুই ক্ষেত্রেই বার্ষিক এককালীন অনুদান ২২৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৫০ টাকা করা হচ্ছে। জুনিয়র মেধাবৃত্তি এককালীন বার্ষিক অনুদান ৫৬০ থেকে ১ হাজার ১২০টাকা এবং সাধারণ বৃত্তির ক্ষেত্রে ৩৫০ থেকে ৭০০ টাকা করা হচ্ছে।

এসএসসিতে মেধাবৃত্তির ক্ষেত্রে বার্ষিক অনুদান ৯০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা এবং সাধারণ বৃত্তির ক্ষেত্রে ৪৫০ থেকে ৯০০ টাকা। অন্যদিকে এইচএসসিতে মেধাবৃত্তির ক্ষেত্রে ১ হাজার ৮০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ হাজার ৬০০ টাকা এবং সাধারণ বৃত্তির জন্য বার্ষিক অনুদান ৭৫০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রাথমিকসহ আরো যেসব বৃত্তির অর্থ বাড়ছে

মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনা সভায় জানানো হয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কেও তাদের আওতাধীন বৃত্তির সংখ্যা অপরিবর্তিত রেখে অর্থের পরিমাণ দ্বিগুণ করার প্রস্তাব পাঠাতে বলা হয়েছে।

এছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা বিভাগের উপবৃত্তি প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো ‘ডুপ্লিকেশন’ বা দ্বৈততা আছে কি না, তা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট দফতর-সংস্থার প্রধানদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সাধারণ বৃত্তি ছাড়াও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, উপজাতি, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, শারীরিক প্রতিবন্ধী, অটিস্টিক এবং পেশামূলক উপবৃত্তির ক্ষেত্রেও এই বর্ধিত হার কার্যকর করা হবে।

মাউশি অধিদফতরের সহকারী পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) কামরুন নাহার বাসসকে বলেন, ‘জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে বোর্ডভিত্তিক আনুপাতিক হারে এই বৃত্তি বণ্টন করা হয়। আমরা একটি খসড়া প্রস্তাব তৈরি করেছি। এটি সরকারের নীতিগত অনুমোদন হলে প্রাথমিক থেকে স্নাতক পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই মাসিক বৃত্তি ও বাৎসরিক এককালীন অনুদান দ্বিগুণ হারে দেয়া হবে; যা শিক্ষার্থীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।’

মাউশি অধিদফতর জানিয়েছে, প্রাথমিক থেকে স্নাতক পর্যন্ত মোট ১ লাখ ৬৯ হাজার ৬৫৯ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে বিভিন্ন স্তরে বৃত্তি দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে প্রাথমিক (পিএসসি) স্তরে মোট ৮২ হাজার ৫০০ জন। জুনিয়র স্তরে মোট ৪৬ হাজার ২০০ জন, মাধ্যমিক (এসএসসি) স্তরে ২৫ হাজার ৫০০ জন আর উচ্চ মাধ্যমিকে (এইচএসসি) মোট ১০ হাজার ৫০০ জন। অন্যদিকে উচ্চশিক্ষা (স্নাতক ও অন্যান্য) মিলে বিশেষ ক্যাটাগরিতে প্রায় ৪ হাজার ৯৫৯ জন শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেয়া হচ্ছে।

সূত্র : বাসস