মেঘের গর্ভে বৃষ্টির বীজ, মাটির ক্ষুদ্র জীবাণুর অবিশ্বাস্য ‘ম্যাজিক’

মাটির ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক বায়ুমণ্ডলে গিয়ে বরফ তৈরির ‘বীজ’ তৈরি করে বৃষ্টিপাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া ভবিষ্যতে পরিবেশবান্ধব কৃত্রিম বৃষ্টি ও জলবায়ু ব্যবস্থাপনায় নতুন সম্ভাবনা দেখাচ্ছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
সংগৃহীত

মেঘের কোল থেকে বৃষ্টি নামানোর চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে মাটির গভীরে থাকা অতি ক্ষুদ্র কিছু ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়ার হাতে। আয়ারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অফ লিমেরিকের মাইক্রোবিয়াল ইকোলজি বিশেষজ্ঞ ডায়ানা আর. আন্দ্রাদে-লিনারস ও তার গবেষকদল সম্প্রতি এক চমকপ্রদ তথ্যে জানিয়েছেন, মাটির নিচের এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণগুলোই আকাশ থেকে বৃষ্টি টেনে নামানোর এক অদ্ভুত ক্ষমতা বা ‘সুপারপাওয়ার’ রাখে।

সায়েন্স অ্যালার্টের সূত্রে জানা গেছে, বিশেষ করে ‘মরটিরিয়েলা’ প্রজাতির ছত্রাকরা তাদের শরীর থেকে এক ধরনের আমিষ বা প্রোটিন বের করে। এই আমিষ বায়ুমণ্ডলে গিয়ে বরফ তৈরির ‘বীজ’ হিসেবে কাজ করে এবং শেষ পর্যন্ত বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে। এই আবিষ্কার জলবায়ু পরিবর্তন এবং কৃত্রিম বৃষ্টি তৈরির পদ্ধতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

মেঘ থেকে বৃষ্টি যেভাবে নামে

সাধারণত আমরা জানি শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসে পানি বরফ হয়। কিন্তু বায়ুমণ্ডলের মেঘের ভেতর পানি মাইনাস ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তরল থাকতে পারে। এই অতি-শীতল পানিকে বৃষ্টি বা তুষারে পরিণত করতে হলে একটি ‘বীজ’ বা অবলম্বন প্রয়োজন। ধুলিকণা বা লবণের কণা এই কাজ কিছুটা করলেও তারা খুব একটা দক্ষ নয়। ঠিক এখানেই জাদুকরের মতো হাজির হয় ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক। কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানীরা জানতেন যে ‘সিউডোমোনাস সিরিঞ্জি’ নামের ব্যাকটেরিয়া গাছের পাতা থেকে উড়ে গিয়ে মেঘের ওপর চড়ে বসে।

এই ব্যাকটেরিয়ার শরীরে থাকা বিশেষ আমিষের সাহায্যে মাত্র মাইনাস ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসেই পানিকে বরফে জমিয়ে ফেলে। এই জমাট বরফ দানাগুলো যখন ওজনে ভারী হয়ে নিচের উষ্ণ বাতাসের দিকে নামতে থাকে, তখন তা গলে গিয়ে বৃষ্টির রূপ নিয়ে ঝরঝর করে ঝরতে থাকে।

ছত্রাকের গোপন কারসাজি

তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যাকটেরিয়ার চেয়েও বেশি দক্ষ এই কাজে কিছু ছত্রাক। ব্যাকটেরিয়া তাদের এই বরফ তৈরির আমিষ নিজের ত্বকের সাথে আটকে রাখে, কিন্তু ‘ফিউসারিয়াম’ ও ‘মরটিরিয়েলা’র মতো ছত্রাকরা এই আমিষকে মাটির চারপাশে ছড়িয়ে দেয়। এই ছত্রাক আমিষগুলো পানিতে দ্রবণীয় এবং আকারে ছোট হওয়ায় বাতাসের সাথে খুব সহজেই মেঘের রাজ্যে পৌঁছে যেতে পারে। এমনকি তুলনামূলক গরম মেঘেও (মাইনাস ৫ ডিগ্রির ওপরে) এরা পানিকে বরফে পরিণত করে বৃষ্টির ধারাবর্ষণে অমিত ভূমিকা নেয়। এ যেন প্রকৃতির এক চক্র, বৃষ্টির পানিতে মাটির ছত্রাক জন্মে, আর সেই ছত্রাক থেকে বের হওয়া আমিষ আবার আকাশে গিয়ে নতুন বৃষ্টির আয়োজন করে।

বিবর্তনের এক অনন্য গল্প

মজার ব্যাপার হলো, ছত্রাক এই অসাধারণ ক্ষমতা নিজে নিজে অর্জন করেনি। লাখ লাখ বছর আগে তারা ব্যাকটেরিয়ার কাছ থেকে এই ডিএনএ কোড বা জিনগত বৈশিষ্ট্যটি ‘ধার’ করেছিল। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘হরাইজন্টাল জিন ট্রান্সফার’। এই ক্ষমতার মাধ্যমে ছত্রাকরা প্রতিকূল পরিবেশে নিজের চারপাশে বরফের একটি সুরক্ষা কবচ তৈরি করে এবং বৃষ্টির মাধ্যমে নতুন কোনো জায়গায় গিয়ে বসতি গাড়ার সুযোগ পায়। গবেষকরা একে বলছেন বিবর্তনের এক সফল ‘চুরি’।

পরিবেশ রক্ষায় নতুন দিশা

এই আবিষ্কার আমাদের বনভূমি রক্ষার গুরুত্ব নতুন করে মনে করিয়ে দেয়। আমরা যখন জঙ্গল উজাড় করি, তখন শুধু গাছই হারাই না, বরং আঞ্চলিক বৃষ্টিপাত ঘটানোর এই প্রাকৃতিক ইঞ্জিনকেও নষ্ট করে ফেলি। বর্তমানে আরব আমিরাত বা চীনের মতো দেশগুলোতে কৃত্রিম বৃষ্টির জন্য সিলভার আয়োডাইড ব্যবহার করা হয়, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। কিন্তু এই ছত্রাক প্রোটিনগুলো সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও পরিবেশবান্ধব। ভবিষ্যতে এগুলো ব্যবহার করে ফসলের সুরক্ষা, কৃত্রিম তুষারপাত কিংবা পরিবেশবান্ধব শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।