হাবিবুল বাশার
রাজধানীর বেইলি রোড বলতেই এক সময় চোখের সামনে ভেসে উঠত নাটক আর থিয়েটার কর্মীদের আড্ডার দৃশ্য। তবে সময়ের বিবর্তনে সেই সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি এখন পরিণত হয়েছে ঢাকা শহরের ইফতার আভিজাত্যের প্রধানতম গন্তব্যে। প্রথাগত চকবাজারের ভিড় আর যানজট এড়িয়ে আধুনিক ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশে ঐতিহ্যের স্বাদ পেতে ভোজনরসিকদের প্রথম পছন্দ এখন বেইলি রোডের ইফতার বাজার। প্রায় চার দশকের পথচলায় এটি এখন আর কেবল একটি বাজার নয়, বরং নগরবাসীর কাছে পহেলা বৈশাখী আমেজের মতো উৎসবে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, বেইলি রোডে ইফতার বাজারের যাত্রা শুরু হয় ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে। মূলত ১৯৮৫-৮৬ সালের দিকে এখানকার বিখ্যাত ‘ক্যাপিটাল ইফতার বাজার’ প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে ইফতারি বিক্রি শুরু করে। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, ক্যাপিটাল কনফেকশনারির মালিকরা মূলত পুরান ঢাকার বাসিন্দা ছিলেন। তারা পুরান ঢাকার ইফতারের ঐতিহ্যের সাথে নতুন ঢাকার আধুনিকতার সমন্বয় ঘটানোর লক্ষ্য নিয়ে ১৯৮৬ সালে মাত্র তিনটি আইটেম দিয়ে শুরু করেন। সেই তিনটি আইটেম থেকে শুরু হওয়া বাজারে এখন ১০০ থেকে ১২০টিরও বেশি পদের খাবার পাওয়া যায়।
ক্রেতা সাধারণ যেখানে মিলেমিশে একাকার : বেইলি রোডকে বর্তমানে ‘অভিজাত ইফতার বাজার’ বলা হয়। এখানকার প্রধান ক্রেতা শান্তিনগর, সিদ্ধেশ্বরী, মালিবাগ ও সেগুনবাগিচা এলাকার উচ্চ-মধ্যবিত্ত ও শিক্ষিত সমাজ। তবে আভিজাত্য আর স্বাদের টানে বনানী, গুলশান ও ধানমন্ডি থেকেও অনেক ভোজনরসিক বিশেষ করে ‘রেশমি জিলাপি’ বা ‘শাহি হালিম’-এর টানে এখানে আসেন। অনেক সময় পুরান ঢাকার বাসিন্দারাও যারা বর্তমানে নতুন ঢাকায় বসবাস করছেন, তারা চকবাজারের যানজট এড়াতে বেইলি রোডকেই বেছে নেন। এ ছাড়া সচিবালয় ও সরকারি কোয়ার্টার কাছাকাছি হওয়ায় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও বুদ্ধিজীবীদের উপস্থিতি এখানে লক্ষণীয়।
যা মিলছে বেইলি রোডের মেন্যুতে : চলতি বছরের বাজার দর এবং নামকরা কয়েকটি রেস্তরাঁ (পিঠাঘর, নবাবী ভোজ, ক্যাপিটাল) থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এখানকার ইফতার আইটেমগুলো যে কাউকে মুগ্ধ করবে।
শাহি হালিম : এখানকার হালিম পরিবেশন করা হয় বাটি ও মাটির হাঁড়িতে। গরুর হালিম ৩০০ থেকে ১,২০০ টাকা এবং খাসির হালিম ৪০০ থেকে ১,৪০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এখানকার বিশেষত্ব হলো মাংস আলাদা রান্না করে ডালের সাথে মেশানো হয় যাতে প্রতিটি ক্রেতা সমপরিমাণ মাংস পান।
জিলাপি ও মিষ্টি : জিলাপির জন্য বেইলি রোডের খ্যাতি বিশ্বজুড়ে। জাফরানি ‘রেশমি জিলাপি’র পাশাপাশি মালটার রস দিয়ে তৈরি বিশেষ ‘বোম্বে জিলাপি’ ক্রেতাদের মূল আকর্ষণ। আরো রয়েছে নবাবী স্পেশাল বুন্দিয়া (৩৫০ টাকা কেজি) এবং মধুসা (৪০ টাকা পিস)।
কাবাব ও গোস্তের আইটেম : মাটন লেগ রোস্ট (আস্ত খাসির পা), চিকেন হারিয়ালি কাবাব (২৯০ টাকা), চিকেন রেশমি কাবাব (২৮০ টাকা), চিকেন তান্দুরি, চিকেন শাসলিক এবং শিক কাবাব। এ ছাড়া রয়েছে কোয়েল পাখির রোস্ট ও আচারি চিকেন।
ভারী খাবার ও পানীয় : খাসির কাচ্চি বিরিয়ানি, গরুর তেহারি, বিশেষ ক্ষীরশা ফালুদা, দইবড়া, জাফরানি শরবত এবং বিখ্যাত ‘মহব্বত শরবত’। ক্যাপিটালের পনির সমোসা এবং ডাবের পুডিং- এখন এ বাজারের সিগনেচার আইটেম। জনৈক অভিভাবক বলেন, আমি নিজে হালকা খাবার পছন্দ করলেও ছোট মেয়ের আবদারে বেইলি রোডের হালিম নিতে এসেছি। আরেক ক্রেতা তার ভাইয়ের সাথে ইফতার কিনতে এসে বলেন, এ বছর আগের চেয়েও বেশ জমজমাট মনে হচ্ছে। মানুষের মধ্যে অনেক উৎসাহ দেখছি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে এক ক্রেতা আক্ষেপ করে বলেন, দাম দিন দিন বাড়তেছে। দুই-তিন বছর আগে যা ছিল, এখন তার চেয়ে অনেক বেশি। এটা নিয়ে একটা টেনশন তো আছেই।
‘নবাবী ভোজ’-এর প্রতিনিধি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেন, আমরা ক্রেতাদের সবসময় সেরা এবং তাজা খাবারটা দিতে চাই। এখানে ধুলোবালি নেই, সব খাবার ঢাকা থাকে, তাই স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ এখানেই আসেন।
নাট্যকর্মীদের আড্ডাস্থল থেকে আজকের এ বিশাল ‘ফুড হাব’ বেইলি রোডের এ রূপান্তর কেবল ব্যবসায়িক নয়, বরং এটি ঢাকার সামাজিক বিবর্তনের একটি অংশ। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সুশৃঙ্খল বক্সিং সিস্টেম আর খাবারের গুণগত মানের কারণে এটি আজ ‘বিকল্প চকবাজার’ হিসেবে নিজের স্থান পাকাপোক্ত করেছে। দাম নিয়ে কিছু অসন্তোষ থাকলেও ঐতিহ্যের স্বাদ আর আভিজাত্যের মোড়কে বেইলি রোডের ইফতার বাজার এখন ঢাকাবাসীর রমজান উদ্যাপনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।



