ক্রীড়া প্রতিবেদক
মিরপুরের উইকেটকে ঘিরে ম্যাচের আগে যতটা শঙ্কা ছিল, বাস্তবে তা যেন ব্যাটারদের জন্য স্বর্গ! বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ৪১৩ রানের বড় সংগ্রহ দাঁড় করানোর পর পাকিস্তানও একই পথে হাঁটছে। ঢাকা টেস্টের দ্বিতীয় দিন শেষে সফরকারীদের সংগ্রহ ১ উইকেটে ১৭৯ রান। যদিও তারা ২৩৪ রানে পিছিয়ে, তবে ব্যাটিংয়ের ধরন দেখে স্পষ্ট, পাল্টা লড়াইয়ে বেশ আত্মবিশ্বাসী অবস্থানেই আছে শান মাসুদের দল। বাংলাদেশের পরিকল্পনায় পানি ঢেলে গতিপথ পাল্টে দিচ্ছে পাকিস্তান। খেলার লাগাম যেন ধীরে ধীরে কেড়ে নিচ্ছে তারা।
কাল দিনের শুরুতে বাংলাদেশের ইনিংস থামে ১১৭.১ ওভারে ৪১৩ রানে। আগের দিন ৪ উইকেটে ৩০১ রান করা স্বাগতিকরা শেষ দিনে আর প্রত্যাশামতো এগোতে পারেনি। বাকি ৬ উইকেট হারিয়ে যোগ করতে পেরেছে মাত্র ১১২ রান। যদিও শেষ দিকে তাসকিন আহমেদের ঝড়ো ব্যাটিং কিছুটা প্রাণ ফিরিয়ে ছিল ইনিংসে। ১৯ বলে ১ ছক্কা ও ৩ চারে ২৮ রান করেন এই পেসার। শেষ উইকেটে নাহিদ রানাকে নিয়ে ৩৯ বলে ২৯ রানের জুটি গড়ে বাংলাদেশকে চার শ’ পার করান তিনি। নাহিদ অপরাজিত থাকেন ৪ রানে।
প্রথম দিনের দৃঢ় ভিত দেখে মনে হচ্ছিল, মিরপুর টেস্টে পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের সংগ্রহ অন্তত পাঁচ শ’ পেরোবে। কিন্তু দ্বিতীয় দিনের ব্যাটিংয়ে সেই সম্ভাবনা দ্রুতই মিলিয়ে যায়। একের পর এক উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে স্বাগতিকরা।
প্রথম দিন শেষে নাজমুল হোসেন শান্তর দলের হাতে ছিল ছয় উইকেট, ক্রিজে ছিলেন সেট ব্যাটার মুশফিকুর রহীম। তাই দ্বিতীয় দিনের শুরুতে বড় স্কোরের স্বপ্ন দেখাই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু প্রত্যাশামতো এগোতে পারেনি ইনিংস। দ্বিতীয় দিনে মাত্র ৩২.১ ওভার টিকতে পেরেছে বাংলাদেশ।
দিনের শুরুতে আশার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন মুশফিক। নিজের ৩৯তম জন্মদিনে ব্যাট হাতে নেমে টেস্ট ক্যারিয়ারের আরেকটি স্মরণীয় ইনিংসের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন তিনি। আগের দিনের ৪৮ রান থেকে এগিয়ে হাফ সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন ধৈর্যের সাথে। একসময় মনে হচ্ছিল, ১০১তম টেস্টে জন্মদিনের সেঞ্চুরির বিশেষ কীর্তিও গড়তে যাচ্ছেন দেশের অভিজ্ঞ এই ব্যাটার। কিন্তু মধ্যাহ্ন বিরতির পর তৃতীয় বলেই থামে সেই স্বপ্ন। রাউন্ড দ্য উইকেট থেকে শাহিন শাহ আফ্রিদির ভেতরে ঢোকা ডেলিভারিতে স্টাম্প উড়ে যায় মুশফিকের।
মুশফিকের বিদায়ের পরই বাংলাদেশের ইনিংসে নেমে আসে ধস। দলীয় ৩৭৮ রানের মধ্যে ২৪ বলের ব্যবধানে ফিরে যান তাইজুল ইসলাম, ইবাদত হোসেন ও মুশফিক। লিটন দাস শুরুটা ভালো করেও ইনিংস বড় করতে পারেননি। শাহিন আফ্রিদির এক ওভারে টানা তিনটি চার মেরে আগ্রাসী ইঙ্গিত দিলেও শেষ পর্যন্ত ৩৩ রানেই থামেন তিনি। লিটন এই ছোট ইনিংসেই গড়েছেন বড় এক মাইলফলক। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথম বাংলাদেশী ব্যাটার হিসেবে ২০০০ রানের ক্লাবে প্রবেশ করেছেন তিনি। ৩১ টেস্টের ৫৫ ইনিংসে লিটনের সংগ্রহ এখন ২০০৯ রান। এই পথে তিনি করেছেন চারটি সেঞ্চুরি। বাংলাদেশের মধ্যে এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে আছেন মুশফিক, যার সংগ্রহ ১,৮৭৬ রান। পাকিস্তান সিরিজেই তার সামনে রয়েছে ২০০০ রান স্পর্শ করার সুযোগ।
যখন মনে হচ্ছিল বাংলাদেশ হয়তো ৪০০ রানও পার করতে পারবে না, তখন দৃশ্যপটে আসেন তাসকিন আহমেদ। স্বভাবসুলভ আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে পাকিস্তানি বোলারদের ওপর পাল্টা চাপ তৈরি করেন এই পেসার। খেলেন ১৯ বলে ২৮ রানের ইনিংস।
৪১৩ রান পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্টে তৃতীয় সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ বাংলাদেশের। মিরপুরের সবুজাভ উইকেট বিবেচনায় স্কোরটি যথেষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। তবে প্রথম দিনের নিয়ন্ত্রণ কাজে লাগাতে পারেনি বাংলাদেশ, তাতে আক্ষেপ থাকছেই। পাকিস্তানের বোলিং আক্রমণে সবচেয়ে উজ্জ্বল ছিলেন মোহাম্মদ আব্বাস। নিয়ন্ত্রিত লাইন-লেংথে ধারাবাহিকভাবে চাপ তৈরি করে ৩৪ ওভারে ৫ উইকেট নেন তিনি। টেস্ট ক্যারিয়ারে এটি তার ষষ্ঠ পাঁচ উইকেট। শাহিন শাহ আফ্রিদি নেন ৩ উইকেট।
বাংলাদেশের হয়ে শতক করেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। ১০১ রানের ইনিংসে দলের বড় সংগ্রহের ভিত গড়ে দেন তিনি। মুমিনুল হক দারুণ ব্যাটিং করলেও সেঞ্চুরি থেকে বঞ্চিত হন ৯১ রানে থেমে। শেষ পর্যন্ত এই দুই ব্যাটারের গড়া ভিত্তিই বাংলাদেশের ইনিংসকে ৪১৩ পর্যন্ত টেনে নেয়!
জবাবে ব্যাট করতে নেমে শুরু থেকেই সাবলীল ছিল পাকিস্তান। দুই ওপেনার অভিষিক্ত আজান আওয়াইস ও ইমাম উল হক বাংলাদেশের বোলারদের খুব বেশি সুযোগ দেননি। দু’জন মিলে যোগ করেন ১০৬ রান। ইমাম ৪৫ রান করে মেহেদী হাসান মিরাজের শিকার হন। ৭২ বলে ৬টি চারের সাহায্যে ইনিংসটি সাজান তিনি। ইমাম উল হক আউট হলেও অন্যপ্রান্তে অনড় ছিলেন আওয়াইস। অভিষেক টেস্টেই নিজেদের জান চেনালেন তিনি। দিন শেষে অপরাজিত আছেন ৮৫ রানে। ১৩৩ বলে ইনিংসে কোনো ছক্কা না থাকলেও ছিল ১২টি চার। তাকে সঙ্গ দিয়েছেন আবদুল্লাহ ফজল, যার সংগ্রহ ৭৮ বলের ইনিংসে ৬টি চারের সাহায্যে ৩৭ রান। অভিজ্ঞ ব্যাটার বাবর আজম চোট না পেলে একাদশে সুযোগ হতো না আজান আওয়াইস বা আবদুল্লাহ ফজলের থেকে যেকোনো একজনের। আর সুযোগ পেয়ে তা কাজে লাগাতে ভুল করেননি টপ অর্ডারের এই দুই ব্যাটার। বাংলাদেশের হয়ে একমাত্র উইকেটটি নিয়েছেন মিরাজ।
সংক্ষিপ্ত স্কোর : দ্বিতীয় দিন
বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস : ১১৭.১ ওভারে ৪১৩/১০ (শান্ত ১০১, মুমিনুল ৯১, মুশফিক ৭১, লিটন ৩৩, তাসকিন ২৮, তাইজুল ১৭, সাদমান ১৩, মিরাজ ১০, এবাদত ০, নাহিদ ৪*; আব্বাস ৫/৯২, আফ্রিদি ৩/১১৩, হাসান ১/৭৫, নোমান ১/৮০)।
পাকিস্তান প্রথম ইনিংস : ৪৬ ওভারে ১৭৯/১ (আজান আওয়াইস ৮৫*, ইমাম উল হক ৪৫, আব্দুল্লাহ ফজল ৩৭*; মিরাজ ১/৩৭, তাসকিন ০/৪০, নাহিদ ০/৪৭, এবাদত ০/৩৮, তাইজুল ০/১২)।
দ্বিতীয় দিন : পাকিস্তান ২৩৪ রানে পিছিয়ে।



