দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বরাবর এক জটিল সমীকরণ। ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা ও অর্থনৈতিক নির্ভরতার গভীর বন্ধন সত্ত্বেও এ সম্পর্কে সবসময় এক অদৃশ্য টানাপড়েন কাজ করেছে। বিশেষ করে ভারতের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে ভারতীয় জনতা পার্টি বিজেপির উত্থান এবং আদর্শিক অবস্থান এ সমীকরণকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে। দেশটির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদল এবং সেখানে বিজেপির শক্তিশালী অবস্থান বাংলাদেশের জন্য শুধু কূটনৈতিক নয়; বরং নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার দিক থেকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে- ‘ভারতের বিজেপি কি বাংলাদেশের জন্য বিপদ’? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের কয়েকটি স্তরে বিশ্লেষণ করতে হবে- রাজনৈতিক আদর্শ, সীমান্ত বাস্তবতা, পানিবণ্টন, নিরাপত্তাঝুঁকি এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির কাঠামো। একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ও দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষক হিসেবে যখন আমরা এ সঙ্কটের মূলে দৃষ্টিপাত করি, তখন দেখি এটি কেবল দু’টি দেশের সম্পর্ক নয়; বরং একটি বৃহৎ রাষ্ট্রের আধিপত্যবাদী আচরণের বিরুদ্ধে একটি ছোট রাষ্ট্রের টিকে থাকার লড়াই।
একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত অনিবার্য কারণে সমর্থন জুগিয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে ভারতের আচরণে একধরনের ‘বড় ভাই’ সুলভ আচরণের প্রকাশ ঘটতে থাকে। ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নে ভারত যতটা অনীহা দেখিয়েছে, বাংলাদেশ ততটা আন্তরিক ছিল। বেরুবাড়ি হস্তান্তর থেকে শুরু করে তিন বিঘা করিডোর- প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে দীর্ঘকাল অপেক্ষা করতে হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে গত পাঁচ দশকে ভারত বাংলাদেশের সাথে যে বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে, তা মূলত একমুখী। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ, দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপের মালিকানা নিয়ে জটিলতা এবং ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে মরুকরণ প্রক্রিয়া শুরু করা ছিল স্বাধীনতার-পরবর্তী সময়ে ভারতের বৈষম্যমূলক আচরণের প্রাথমিক উদাহরণ। ভারতের নীতি ছিল দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহারে অটল থাকা; কিন্তু ঢাকার ন্যায্য দাবিগুলো দিল্লি বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রেখেছে। এ বৈষম্যের বীজ থেকে ধীরে ধীরে বাংলাদেশের জনমানসে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে (২০০৯-২৪) ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে বলা হতো ‘সোনালি অধ্যায়’; কিন্তু এ অধ্যায়ের পাতা উল্টালে দেখা যায়, এটি ছিল মূলত একপক্ষীয় সুবিধা দেয়ার ইতিহাস। শেখ হাসিনা সরকার ভারতের প্রায় সব দাবি পূরণ করে; কিন্তু জাতীয় স্বার্থের মৌলিক দাবিগুলো আদায় করতে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়। নিরাপত্তার চরম ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও এবং দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন উপেক্ষা করে ভারতকে নামমাত্র মাশুলে ট্রানজিট ও করিডোর সুবিধা দেয়া হয়। ফলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সাথে সংযোগ সহজ হলেও বাংলাদেশের সড়ক ও অবকাঠামোর ওপর বিপুল চাপ তৈরি হয়েছে, যার কোনো অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণ আদায় করা সম্ভব হয়নি।
চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের অবাধ অনুমতি দেয়া হয়েছে, যা ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্যের অর্থনীতির চাকা সচল করেছে। অথচ বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা ভারতের বাজারে প্রবেশ করতে গিয়ে পদে পদে শুল্ক ও অশুল্ক বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। আবার ভারতের উলফাসহ বিভিন্ন বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীকে নির্মূল করতে বাংলাদেশ সরাসরি ভারতকে সহযোগিতা করেছে। তার প্রতিদান হিসেবে ভারত বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংস করতে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করেছে। আওয়ামী লীগ সরকার আমলে এ একমুখী সম্পর্কে বাংলাদেশ প্রকৃতপক্ষে একটি নির্ভরশীল রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল, যার মূল্য দিতে হয়েছে জাতীয় মর্যাদা বিসর্জন দিয়ে।
বিএসএফের সীমান্ত হত্যা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ওপর নগ্ন আঘাত। প্রতিদিন সাধারণ নাগরিকদের ওপর গুলি চালানো ভারতের ‘বন্ধুত্বের’ সংজ্ঞাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর এই পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটেছে। দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব প্রায়শই সীমান্তবাসীদের ‘উইপোকা’ বা ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে সম্বোধন করে ঘৃণা ছড়ায়। এ জন্য বাংলাদেশী হত্যা করেও বিএসএফ একধরনের দায়মুক্তি ভোগ করে। বাংলাদেশের বিগত সরকারগুলো প্রতিটি হত্যার পর কেবল ‘উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছে; কিন্তু সীমান্তে হত্যার বিনিময়ে ভারতকে দেয়া সুবিধাগুলো বন্ধ করার মতো শক্ত অবস্থান নিতে পারেনি।
গঙ্গা পানি চুক্তির সুফল বাংলাদেশ পূর্ণাঙ্গভাবে পায়নি, আর তিস্তা চুক্তি তো এখন এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বিজেপির উত্থান তিস্তায় পানি পাওয়া আরো অনিশ্চিত করে তুলেছে। বিজেপি এবং তৃণমূল উভয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির স্বার্থে তিস্তাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। বর্ষাকালে ভারতের গজলডোবা বা ফারাক্কার গেট খুলে দিয়ে বাংলাদেশে কৃত্রিম বন্যা সৃষ্টি করা এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি আটকে রেখে উত্তরাঞ্চলকে মরুভূমি বানানো- এই ‘হাইড্রো-হেজেমনি’ বা পানির আধিপত্যবাদের মাধ্যমে বাংলাদেশকে এক ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। পানির রাজনীতির কারণে বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তা চরম ঝুঁকিতে পড়েছে।
ভারতের নদী সংযোগ প্রকল্প (রিভার ইন্টারলিংকিং প্রজেক্ট) বাংলাদেশের নদ-নদীর অস্তিত্ব মুছে দেয়ার এক নীল নকশা। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের প্রধান নদীগুলো শুকিয়ে যাবে, যা এ অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতি ও প্রাণবৈচিত্র্য ধ্বংস করে দেবে। এটি কোনো সাধারণ প্রতিবেশী দ্বন্দ্ব নয়, এটি এক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আরেক রাষ্ট্রের পরিবেশগত যুদ্ধ।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, এটি একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় এজেন্ডার বাস্তবায়ন। ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক ভোটার বাদ পড়া এবং এনআরসি ও সিএএ’র মাধ্যমে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রহীন করার যে প্রক্রিয়া ভারতে চলছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশে। বিজেপি নেতারা বারবার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, তারা ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ বাংলাদেশে পুশব্যাক করবেন। ‘অনুপ্রবেশকারী’ তকমাটি মূলত বাঙালি মুসলিমদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। যদি পশ্চিমবঙ্গে আসামের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে লাখ লাখ মানুষ রাষ্ট্রহীন হয়ে সীমান্তে ভিড় জমাবে, যা বাংলাদেশের জন্য দ্বিতীয় একটি ‘রোহিঙ্গা সঙ্কটের’ মতো বা তার চেয়েও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এটি কেবল মানবিক সঙ্কট নয়, এটি বাংলাদেশের সামাজিক স্থিতিশীলতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার পরিকল্পিত চক্রান্ত। ইতোমধ্যে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে ঘরছাড়া মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। তারা সীমান্তবর্তী এলাকায় আশ্রয় নিচ্ছেন। বাংলাদেশ যদি এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে মেনে নেয়, তাহলে সম্পদ ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে; আর যদি সীমান্ত বন্ধ করে দেয়, তাহলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আসবে। বিজেপির উত্থান বাংলাদেশের জন্য এক অনতিক্রম্য কূটনৈতিক ও মানবিক দুর্যোগের ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানের সাথে সাথে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের প্রবণতা বেড়েছে। ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার এবং মুসলিমবিদ্বেষী প্রচারণায় সীমান্তের এপারের সমাজব্যবস্থায় একধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার সমাজগুলো একে-অপরের সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত। ভারতের অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অস্থিরতা সৃষ্টির সুযোগ করে দেয়, যা উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে। ভারতীয় গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় বাংলাদেশী মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে, যা দুই দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে বিদ্বেষের বীজ বপন করছে। এটি একটি ইচ্ছাকৃত নীতি- যেখানে ভারতের অভ্যন্তরীণ সমস্যা থেকে জনগণের দৃষ্টি সরাতে একটি বহিঃশত্রুর সৃষ্টি করা হয়, আর সেই বহিঃশত্রু হিসেবে প্রতিবেশী মুসলিমপ্রধান বাংলাদেশকে বেছে নেয়া হচ্ছে। বিজেপি যত বেশি পশ্চিমবঙ্গে শক্তিশালী হবে, এ উত্তেজনা তত বেশি বাড়বে। ফলে বাংলাদেশকে বহুমাত্রিক চাপ মোকাবেলা করতে হবে- এক দিকে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ, অন্য দিকে সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তত্ত্বে একটি শব্দ আছে- ‘ফিনল্যান্ডাইজেশন’। যেখানে একটি ছোট দেশ বৃহৎ প্রতিবেশীর স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে নিজের সার্বভৌমত্ব ও নীতি বিসর্জন দেয়। বিগত ১৫ বছর বাংলাদেশ মূলত এই পথে হেঁটেছে; কিন্তু এখন সময় এসেছে ‘প্রাগম্যাটিক’ বা বাস্তববাদী কূটনীতির। ঢাকাকে বাস্তবতা উপলব্ধি করতে হবে, দিল্লি কখনো সমান অংশীদার হিসেবে আমাদের দেখেনি; বরং কৌশলগত স্বার্থ চরিতার্থ করতে বাংলাদেশকে একটি বাফার স্টেট হিসেবে ব্যবহার করেছে। তাই এখন দরকার নতুন কৌশলগত দিকনির্দেশনা। প্রথমত, ভারতকে দেয়া ট্রানজিট, বন্দরসুবিধা এবং করিডোরকে পানিবণ্টন ও সীমান্ত হত্যার সাথে শর্তযুক্ত করতে হবে। অর্থাৎ- ‘নো ওয়াটার, নো ট্রানজিট’ নীতি নিতে হবে।
যতক্ষণ পর্যন্ত তিস্তার পানি না আসবে এবং সীমান্ত হত্যা বন্ধ না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো একপক্ষীয় সুবিধা দেয়া যাবে না। দ্বিতীয়ত, পানিবণ্টন ও সীমান্ত হত্যার বিষয়টি কেবল দ্বিপক্ষীয় আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ না রেখে জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক ফোরামে জোরালোভাবে উত্থাপন করতে হবে। বাংলাদেশকে আরো কূটনৈতিক সক্রিয়তা দেখাতে হবে। সেই সাথে বিশ্বমনে ভারতের এই আচরণের বিরুদ্ধে নিন্দা সৃষ্টি করতে হবে। তৃতীয়ত, সীমান্তের সম্ভাব্য ‘পুশইন’ ঠেকাতে বিজিবিকে আধুনিকায়ন এবং সীমান্তে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। সীমান্তে প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে, যাতে বিএসএফের কোনো উসকানি দ্রুত চিহ্নিত ও প্রতিহত করা যায়। সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস করা চলবে না।
চতুর্থত, ভারতের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা কমিয়ে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অন্যান্য শক্তিগুলোর (যেমন- চীন, তুরস্ক, জাপান বা মুসলিম বিশ্ব) সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। বাংলাদেশকে বহুমুখী কূটনীতি গ্রহণ করতে হবে, যাতে একক কোনো শক্তির ওপর নির্ভরশীল না হয়ে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
পঞ্চমত, দেশের সব রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির মধ্যে ভারতের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা জরুরি। আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনীতির দিক থেকে দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে শক্তিশালী করতে হবে। সর্বশেষে, জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে- গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের মাধ্যমে ভারতের ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে নাগরিকদের অবহিত করতে হবে। তবেই জনমতের চাপে সরকার শক্ত অবস্থান নিতে বাধ্য হবে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তন কেবল একটি রাজ্যের ক্ষমতার পালাবদল নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। বিজেপির আদর্শিক অবস্থান, নিরাপত্তা নীতি, পানি রাজনীতি এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা- সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের জন্য একটি জটিল ও অনিশ্চিত পরিস্থিতি তৈরি করছে। এ মুহূর্তে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, কিভাবে এ অনিশ্চয়তার মধ্যেও জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা যায়। কূটনীতির ভাষায় কথা বললে যেমন বোঝানো যায়, তেমনি সোজাসাপ্টা কথাও বলা দরকার। আগামী দিনে যদি বিজেপি আরো শক্তিশালী হয় এবং কেন্দ্র ও রাজ্য উভয় স্থানে নিয়ন্ত্রণ প্রবল হয়, তাহলে তারা যে বাংলাদেশের ওপর চাপ প্রয়োগ করবে, তা বলাই বাহুল্য। সেই চাপের সামনে বাংলাদেশ যদি নতি স্বীকার করে, তবে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের অর্থ ফুরিয়ে যাবে।
‘ভারতের বিজেপি-বাংলাদেশের বিপদ’- শিরোনামটি কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়; বরং এটি একটি নিরেট বাস্তবতা। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক চিরস্থায়ী শত্রুতা বা বন্ধুত্বের ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে পারস্পরিক স্বার্থের ওপর। বাংলাদেশ যদি বাস্তববাদী এবং দূরদর্শী নীতি গ্রহণ করতে পারে, তবে এ বিশাল চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করা সম্ভব; অন্যথা ভারতের রাজনীতির আগুনে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ভস্মীভূত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। দায়িত্বটা এখন বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের হাতে। স্মরণে রাখতে হবে, যে জাতি নিজের স্বার্থ রক্ষায় সময়মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়, পরাধীনতার অন্ধকারে ডুবে যাওয়াই সেই জাতির নিয়তি।
লেখক : অধ্যাপক (অব:), সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়



