এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা বাতিল

সংসদ প্রতিবেদক
Printed Edition
  • সংসদ সদস্যের ওপর হামলা দুঃখজনক : স্পিকার
  • বিরোধীদলীয় নেতার আহ্বান : সংসদে আমাদের আচরণ যেন দায়িত্বশীল হয়

সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা বাতিল করে জাতীয় সংসদে বিল ‘দ্য মেম্বার্স অব পার্লামেন্ট (রেমিউনারেশন অ্যান্ড অ্যালাওয়েন্সেস) (সংশোধন) অ্যাক্ট-২০২৬’ পাস হয়েছে। আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান বিলটি পাসের প্রস্তাব সংসদ অধিবেশনে উত্থাপন করলে সরকার ও বিরোধীদলের সদস্যদের কণ্ঠভোটে তা সর্বসম্মিতে পাস হয়।

গতকল রোববার স্পিকার মেজর (অব:) হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে বহুল আলোচিত এই বিলটি পাসের সময় অধিবেশনে উপস্থিত অধিকাংশ সদস্য টেবিল চাপড়ে এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান। বিলটি পাস হওয়ায় এখন থেকে সংসদ সদস্যরা (এমপি) আর শুল্কমুক্ত সুবিধায় গাড়ি আমদানির সুযোগ পাবেন না। সাধারণ নাগরিকদের মতো সংসদ সদস্যদেরও গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে নির্ধারিত শুল্ক ও কর প্রদান করতে হবে। এত দিন সংসদ সদস্যরা কোনো প্রকার শুল্ক বা ট্যাক্স ছাড়াই বিদেশ থেকে দামি গাড়ি আমদানির আইনি সুবিধা ভোগ করতেন।

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়, জনগণের সেবা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর সংসদ সদস্যদের নিজের নামে শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানি এক দিকে যেমন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, অন্য দিকে তেমনি এ ধরনের শুল্কমুক্ত সুবিধা কর প্রদানের ক্ষেত্রে দেশের মালিক জনগণের সাথে দৃশ্যমান বৈষম্য তৈরি করে। এই পরিপ্রেক্ষিতে সংসদ নেতার দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে জাতীয় সংসদের সদস্যদের জন্য বিদ্যমান শুল্কমুক্ত গাড়ি সুবিধা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় ব্যয় সঙ্কোচন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি এবং নাগরিকদের সাথে সাম্য প্রতিষ্ঠাকল্পে উক্ত সুবিধা বাতিল করার জন্য এই বিলটি আনা হলো।

উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন ধরেই সংসদ সদস্যরা শুল্কমুক্ত সুবিধায় বিলাসবহুল গাড়ি আমদানি করে আসছিলেন, যা নিয়ে জনমনে সমালোচনা ছিল। নতুন এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সেই দীর্ঘদিনের প্রথার অবসান ঘটল। এর আগে ২৩ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদের সভায় সংসদ সদস্যদের এই সুবিধা বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়। তার আগে সরকার ও বিরোধীদলের পক্ষ থেকে শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত জানানো হয়।

বিরোধীদলীয় নেতার আহ্বান : সংসদে আমাদের আচরণ যেন দায়িত্বশীল হয়

সংসদ প্রতিবেদক জানান, সরকারি দলের সদস্যদের উদ্দেশ্য করে সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে আমরা যখন কথা বলব, তখন আমাদের (সবার) কথাগুলো যেন দায়িত্বশীল হয়।

গতকাল রোববার সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদের অধিবেশনের ২১তম দিনে সরকারি দলের এক সদস্যের বক্তব্যের জবাব দিতে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে তিনি এ কথা বলেন।

তার আগে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো: রাজীব হাসান জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের সংখ্যা নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতার দেয়া তথ্যের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যেখানে সরকারি গেজেটে ৮৪৪ জন শহীদের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১৪০০ শহীদের কথা বলা হয়েছে, সেখানে বিরোধীদলীয় নেতা গত ১৪ এপ্রিল এক অনুষ্ঠানে কিভাবে ১২০০ শহীদের বাসায় যাওয়ার দাবি করেন। একে তিনি ইতিহাসের নতুন বিকৃতি এবং ‘শহীদ ব্যবসা’র অপচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করেন।

জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সংসদ সদস্য আমাকে কোড করে একটি কথা বলেছেন। বিষয়টি জুলাই শহীদদের সাথে সম্পর্কিত। তিনি বলেছেন, শহীদদের সংখ্যা যদি ৮০০ প্লাস হয়, তাহলে আমি এক হাজার ২০০ বাড়িতে গেলাম কিভাবে? ফ্যামিলিতে গেলাম কিভাবে? ওনাকে এখানে আমি এখন দেখছি না। তিনি থাকলে বলতাম যে, হিসাবটা প্রতিমন্ত্রীর কাছ থেকে বুঝে নেয়ার জন্য। সালাউদ্দিন টুকু সাহেব তার বক্তব্যে নিজেই বলেছেন যে, শুধু জাতীয়তাবাদী দল এবং তার অঙ্গসংগঠনের লোকেরাই শহীদ হয়েছে ১ হাজারের ঊর্ধ্বে। আমি যদি তার কথাটাই সমর্থন করি, তাহলে হিসাব এখান থেকেই তিনি পাবেন। আমার কাছে কষ্ট করে আসতে হবে না।

তিনি আরো বলেন, আমি আনঅথেন্টিক কোনো কথা বলিনি। এই ব্যাপারে আমাদের কাছে একটা কমপ্লিট প্রোফাইল আছে। এখানে উপস্থিত অনেকে আমাদের সেই প্রোফাইল পেয়েছে। আমাদের ওয়েবসাইটে অ্যাভেইলেবল। চেক, ক্রস চেক করে আমরা নিশ্চিত হওয়ার পরই তালিকাগুলো করেছি। এ ব্যাপারে আমার কথা নয়, এই দেশের কোনো সংস্থার উদ্ধৃতি নয়; জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি বলেছে, এই সংখ্যাটা এক হাজার ৪৫১।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, বিভিন্ন জায়গায় যখন যাই, কিছু মানুষ আসেন; তারা মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। এরপর বলেন, আমার বাবাটার কোনো খবর আপনাদের কাছে আছে কি না? ওই যে দুই দিন ইন্টারনেট বন্ধ করে মানুষ খুন করে গুম করা হয়েছে, তাদের হিসাব তো কেউ দিচ্ছে না। এ সংখ্যা তো আরো বেশি।

তিনি বলেন, জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে আমরা যখন কথা বলব, তখন আমাদের কথাগুলো যেন দায়িত্বশীল হয়।

জাতীয় সংসদে নিজের নিরাপত্তা চাইলেন বিরোধীদলীয় এমপি

সংসদ প্রতিবেদক জানান, জাতীয় সংসদে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের জীবনের নিরাপত্তা চাইলেন নেত্রকোনা-৫ আসনের বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য জামায়াত নেতা অধ্যাপক মাসুদ মোস্তফা।

গতকাল বিকেলে সংসদ অধিবেশন শুরু হলে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে তিনি তার ওপর হামলার ঘটনা তুলে ধরেন। মাসুদ মোস্তফা বলেন, গত ২৪ এপ্রিল সন্ধ্যায় নেত্রকোনা-৫ (পূর্বধলা) আসনের আতকাপাড়া পেট্রল পাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইন দেখে সেখানে খোঁজখবর নিতে গেলে বিএনপির নামধারী কিছু সন্ত্রাসী তার ওপর হামলা চালায় এবং গাড়ি ভাঙচুর করে। এ সময় তারা পাশের মসজিদে গেলে সেখানেও ঘেরাও করে তাকে ও তার নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করা হয়। মসজিদের দরজা ভাঙার চেষ্টা করা হয়। সেখানে পেশাদার সন্ত্রাসী নিয়ে আসা হয় এবং আমাদের হত্যার চেষ্টা করা হয়। এ সময় প্রশাসনের সাহায্য চেয়েও পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় মামলায় ৯ জনকে আটক করলেও তাদের একজন মাত্র তালিকাভুক্ত আসামি। বাকিরা নিরীহ লোক। মাসুদ মোস্তফা এ সময় নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা, সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার ও তাদের উপযুক্ত বিচার দাবি করেন।

এ সময় স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংসদে দাঁড়িয়ে বলেন, এ ঘটনায় আমরা সবাই দুঃখিত। এ ঘটনায় ইতোমধ্যে ৯ জন গ্রেফতার হয়েছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের উপযুক্ত বিচারের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম বলেন, একজন সংসদ সদস্যের ওপর হামলা অত্যন্ত দুঃখজনক। পুরো সংসদই এ ব্যাপারে একমত। আপনি ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করুন।