পশ্চিমবঙ্গে অস্থিরতা ও সম্প্রীতির চ্যালেঞ্জ

পশ্চিমবঙ্গের এই রাজনৈতিক রূপান্তর যেন কোনোভাবেই সাম্প্রদায়িক বিভাজনের কারণ না হয়। সুস্থ রাজনীতি, অন্তর্ভুক্তিমূলক সুশাসন এবং প্রতিবেশীসুলভ মৈত্রীর মাধ্যমেই কেবল দক্ষিণ এশিয়ার এই গুরুত্বপূর্ণ অংশে শান্তি বজায় রাখা সম্ভব। উগ্রতার জয় নয়, সম্প্রীতির জয়ই হোক ২০২৬ সালের প্রকৃত ম্যান্ডেট। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ হলো— উভয় দেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা

২০২৬ সালের মে মাস পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভাবনীয় পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে থাকবে। দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটিয়ে এক বিশাল জনম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে ভারতীয় জনতা পার্টি-বিজেপি। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার এই পালাবদল স্বাভাবিক হলেও নির্বাচন-উত্তর সহিংসতা ও ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক উগ্রতা এখন কেবল রাজ্যের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; বরং দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনীতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য এক কঠিন পরীক্ষা। একটি দেশে বা রাজ্যে যখন জয়-পরাজয়কে কেন্দ্র করে উগ্রতা ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, তখন গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল হয়।

নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি-বিজেপি ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। বিপরীতে, তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) ৮০টি আসনে সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। এই বিশাল রাজনৈতিক রদবদল কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়; বরং রাজ্যের সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক বুননে এক গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। হিন্দু ভোটের প্রায় ৬৫-৭০ শতাংশ বিজেপির বাক্সে পড়েছে, যা গত নির্বাচনের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। অন্য দিকে মুসলিম ভোটের প্রায় ৮৫-৯০ শতাংশ তৃণমূলের পক্ষে থাকলেও আসন বিন্যাসে তা প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হয়েছে। উত্তরবঙ্গ এবং দক্ষিণবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে (যেখানে মতুয়া এবং অন্যান্য রাজবংশী সম্প্রদায়ের প্রভাব বেশি) বিজেপি বিপুল জয় পেয়েছে। এসব এলাকায় ‘নাগরিকত্ব’ এবং ‘অনুপ্রবেশ’ ইস্যুগুলো সাম্প্রদায়িক উত্তাপ বাড়িয়েছিল।

বীরভূম, উত্তর চব্বিশপরগনা এবং মালদহের মতো মিশ্র জনবসতিপূর্ণ এলাকায় রাজনৈতিক সংঘর্ষে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পুলিশ ইতোমধ্যে চার শতাধিক মানুষকে গ্রেফতার করেছে। বিজয়ী শিবিরের কিছু নেতার বিজয়োল্লাস এবং উসকানিমূলক স্লোগান সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজয়ী নেতাদের উগ্র বক্তব্য যদি নিয়ন্ত্রণে না আনা হয়, তবে তা সুশাসনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। নির্বাচন কমিশন প্রদত্ত তথ্য, এনডিটিভি এবং আনন্দবাজার পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী, সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতির ভয়াবহতা উঠে এসেছে। বর্তমানে রাজ্যে শান্তি রক্ষায় প্রায় ৭০০ ইউনিট কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়োজিত আছে, যা পরিস্থিতির সংবেদনশীলতা নির্দেশ করে।

বিজয়ী শিবিরের কিছু নেতার দায়িত্বজ্ঞানহীন উগ্র বক্তব্য এবং মাঠপর্যায়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও সাম্প্রদায়িক সঙ্ঘাত জনমনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে বিজয়ীর ভাষা ও আচরণ হওয়া উচিত মার্জিত ও অন্তর্ভুুক্তিমূলক। যখন এই ভাষা উগ্রতা ও সহিংসতায় রূপ নেয়, তখন তা প্রশাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আস্থা কমিয়ে দেয়। পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে বা ভারতের কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারকদের এটি বুঝতে হবে, রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক এবং জনমানসের আবেগ সবসময় এক পথে চলে না। রাজনীতি হওয়া উচিত জনকল্যাণের প্রতিযোগিতা, প্রতিহিংসার লড়াই নয়।

পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রদায়িক স্থিতিশীলতার সাথে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ভৌগোলিক সান্নিধ্য ও সাংস্কৃতিক অভিন্নতার কারণে পশ্চিমবঙ্গের যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বিশেষত মুসলমানরা আক্রান্ত হওয়ার খবর বা গুজব বাংলাদেশে দ্রুত মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ওপারে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ব্যাহত হলে এপারে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, যা বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে। এটি একটি অশুভ চক্রের জন্ম দেয়, যা উভয় দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তিশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করে।

ভারত সরকারের নীতিনির্ধারকদের একটি রূঢ় বাস্তবতা মাথায় রাখা প্রয়োজন— বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের ভারতের প্রতি নমনীয় বা সহযোগিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেও এ দেশের সাধারণ জনগণের একটি বড় অংশের মধ্যে প্রবল ভারতবিরোধী মনোভাব বিদ্যমান। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে ভারতের প্রভাব ও নীতি নিয়ে যে ঐতিহাসিক সংশয় বা বিরোধিতা রয়েছে, তা উপেক্ষা করা আত্মঘাতী হতে পারে। কেন এই বিরোধিতা? দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি, সীমান্তে বিএসএফের হাতে বাংলাদেশী নাগরিকদের মৃত্যু এবং বিভিন্ন সময়ে ভারতীয় নেতাদের দেয়া ‘অনুপ্রবেশকারী’-বিষয়ক উগ্র বক্তব্য সাধারণ মানুষের মনে এই ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের নেতারা যখন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ফায়দা লুটতে উগ্র সাম্প্রদায়িক বা বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্য দেন, তখন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ভারতবিদ্বেষ আরো কয়েকগুণ বেড়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে বুঝতে হবে, বাংলাদেশের জনগণের এই ভারতবিরোধী মনোভাব কেবল আবেগ নয়, এটি তাদের জাতীয় আত্মমর্যাদার সাথে যুক্ত।

বিজেপি নেতৃত্বকে নিশ্চিত করতে হবে— তাদের ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ স্লোগান যেন কেবল ভোটের বুলিতে সীমাবদ্ধ না থাকে। মুসলমানদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে হবে। সৎ প্রতিবেশীসুলভ আচরণের অর্থ হলো— একে-অপরের অভ্যন্তরীণ স্পর্শকাতরতাকে সম্মান জানানো। দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে কেবল সরকারি পর্যায়ে নয়; বরং জনগণের পর্যায়ে আস্থা তৈরির জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

বাংলাদেশের জনগণের ভারতবিরোধী ঐতিহ্যগত মনোভাবকে প্রশমিত করতে হলে ‘সৎ প্রতিবেশীসুলভ আচরণ’ এবং পশ্চিমবঙ্গের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষা করার কোনো বিকল্প নেই।

নবনির্বাচিত নেতারা যদি ‘বিগ ব্রাদার’সুলভ মনোভাব পরিত্যাগ করে উগ্র বক্তব্য পরিহার করে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মৈত্রীপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করে, তবে বাংলাদেশের জনগণের ক্ষোভ প্রশমিত হতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেবল রাজনীতির নয়; বরং নাড়ির সম্পর্ক। এই অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা দেখা দিলে তা উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোকে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ করে দিতে পারে। এতে ভারতের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থমকে যাবে। তাই এই অঞ্চলকে শান্তিপূর্ণ হিসেবে টিকিয়ে রাখতে ভারত সরকারের দায়বদ্ধতা সবচেয়ে বেশি।

দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক হৃৎপিণ্ড হিসেবে পরিচিত পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ উভয় অঞ্চলই এখন উন্নয়নের মহাসড়কে রয়েছে। কোনো অঞ্চলে যদি নিয়মিত সঙ্ঘাত ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার শঙ্কা থাকে, তবে সেখানে বিদেশী বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে। বেনাপোল-পেট্রাপোল বা হিলি সীমান্তের মাধ্যমে যে বাণিজ্য চলে, তা রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ব্যাহত হলে দুই দেশের সাধারণ মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যায় এবং সাধারণের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। শত্রুতার কারণে দুই দেশের ব্যবসাবাণিজ্য ও কানেক্টিভিটি প্রকল্পগুলো বাধার সম্মুখীন হতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান নাজুক পরিস্থিতিতে শান্তি বজায় রাখতে ভারত সরকারকে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে : ক. রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে উঠে সব ধর্মের মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। খ. গুজব ও সাম্প্রদায়িক উসকানি বন্ধে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষাকারী বিশেষ পর্যবেক্ষণ সেল গঠন করা যেতে পারে। গ. বিজয়কে দম্ভ নয়; বরং সেবার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে উগ্রবাদ বর্জন করতে হবে। ভারত সরকারকে এটি প্রমাণ করতে হবে, তারা কেবল বাংলাদেশের সরকারের বন্ধু নয়; বরং বাংলাদেশের সাধারণ মানুষেরও প্রকৃত বন্ধু। মনে রাখতে হবে, পশ্চিমবঙ্গের শান্তি ও সম্প্রীতি রক্ষা করা কেবল দিল্লির দায়িত্ব নয়, এটি ঢাকা-দিল্লি বন্ধুত্বের এক অগ্নিপরীক্ষা।

পশ্চিমবঙ্গের এই রাজনৈতিক রূপান্তর যেন কোনোভাবেই সাম্প্রদায়িক বিভাজনের কারণ না হয়। সুস্থ রাজনীতি, অন্তর্ভুক্তিমূলক সুশাসন এবং প্রতিবেশীসুলভ মৈত্রীর মাধ্যমেই কেবল দক্ষিণ এশিয়ার এই গুরুত্বপূর্ণ অংশে শান্তি বজায় রাখা সম্ভব। উগ্রতার জয় নয়, সম্প্রীতির জয়ই হোক ২০২৬ সালের প্রকৃত ম্যান্ডেট। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ হলো— উভয় দেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা।

লেখক : অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা

[email protected]