আবুল কালাম
বাংলাদেশে দূষণ নিয়ন্ত্রণে বিগত দেড় যুগ ধরে গ্রহণ করা সরকারি উদ্যোগের ১ শতাংশও সফল হয়নি। সংশ্লিষ্ট দফতর, আইন এবং প্রশাসনের উপস্থিতি থাকলেও কার্যকর বাস্তবায়নহীনতার কারণে দূষণ দ্রুত দানবের আকার ধারণ করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দূষণের প্রধান কারণগুলো চিহ্নিত হলেও তা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা দেশের জন্য একটি বড় ব্যর্থতা হিসেবে রেকর্ডে থাকবে। এতে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও নাগরিকদের জীবন ঝুঁকিতে পড়ছে।
গত মাসে বিশ্বব্যাংক ‘পরিবর্তনের নিঃশ্বাস : ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমি ও হিমালয়ের পাদদেশে পরিষ্কার বাতাসের সমাধান’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের দূষণের প্রধান ছয় উৎস চিহ্নিত করেছে : রান্নায় জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার; ইটভাটা ও শিল্প-কারখানায় ফিল্টারবিহীন জ্বালানি পোড়ানো; পুরনো ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন; কৃষিজ ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানো; অপরিকল্পিত সার ব্যবস্থাপনা এবং খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে শীতকালে বায়ুর মান ভয়াবহ পর্যায়ে নেমে যাওয়ার পেছনে এ কারণগুলো মূল ভূমিকা রাখছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত দুই দশকে দেশে দূষণ বেড়েছে ৬৬ শতাংশ, যার ফলে মানুষের গড় আয়ু সাড়ে পাঁচ বছর কমেছে। বিগত সরকারগুলো দূষণ রোধে নানান উদ্যোগ গ্রহণ করলেও, বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়ে এক শতাংশেরও কম অগ্রগতি হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে শীতের আগে কাঁচা রাস্তা সংস্কার, ধুলা কমাতে পানি ছিটানো, ইটভাটা ও শিল্প-কারখানায় দূষণ নিয়ন্ত্রণ, পুরনো যানবাহন উচ্ছেদ, গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক উদ্যোগে অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা জোরদার করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এ ছাড়া পরিবেশ সুরায় ১০০ দিনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলেও, তা ফাইলবন্দী অবস্থাতেই থেকে গেছে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও দূষণ নিয়ন্ত্রণে একাধিক পদপে গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে : ঢাকায় ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণ ও রাস্তার পৃষ্ঠ ঢেকে রাখা; ঘের বা বেড়া স্থাপন এবং গাড়ির মাধ্যমে পানি ছিটানো; বিআরটিএ’র মাধ্যমে পুরনো যানবাহন অপসারণ ও নতুন যানবাহন চালু; আধুনিক বায়ুমান পর্যবেণ ব্যবস্থা স্থাপন; বৈশ্বিক মান অনুসারে নির্গমন মান উন্নয়ন; স্যানিটারি ল্যান্ডফিল ও বর্জ্য দহন কেন্দ্র চালু এবং পরিচ্ছন্ন রান্নার জন্য এলপিজি ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান।
তবে সংশ্লিষ্ট দফতরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ‘যে সরকার ১৬ বছরে এক শতাংশ কাজ করতে পারেনি, সেই কাজ এক বছরে করা সম্ভব নয়। আমরা যা করতে পারি, তাই করেছি।’
বায়ুদূষণের পরিসংখ্যান : ১৯৯৮-২০২৩ : কণাদূষণ বেড়েছে ৬৬.২%; মানুষের জীবনকাল হ্রাস : ২.৪ বছর; বছরে দূষণের শিকার হয়ে মারা যাচ্ছে ৯০ লাখ মানুষ।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, মূলত নভেম্বর থেকে মার্চ মাসে সবচেয়ে বেশি বায়ুদূষণ হয়। এর মূল কারণ : স্থানীয় ইটভাটা ও শিল্পকারখানার কার্যক্রম; বর্জ্য পোড়ানো; ট্রান্স-বাউন্ডারি দূষণ (উত্তর থেকে প্রবাহিত); কম বৃষ্টিপাতের কারণে ধুলা ও কণা বায়ুতে স্থায়ীভাবে থাকে। প্রতি বছর বায়ুদূষণ ২ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, যার মধ্যে আন্তঃমহাদেশীয় বায়ুদূষণ : ৩০%; রান্নার কাঠ/জ্বালানি : ২৮%; বিদ্যুৎকেন্দ্র : ২৪%; ইটভাটা : ১৩-১৫%; নির্মাণকাজ : ১১%; বর্জ্য পোড়ানো : ১১%; যানবাহন : ৫%।
পরিবেশ অধিদফতরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘দেশের বাইরের ৩৫% দূষণ নিয়ন্ত্রণে আমাদের হাত নেই। অন্য দিকে স্থানীয় নির্মাণ কাজ ও অবৈধ কার্যক্রমও আইন মেনে চলছে না। তাই শাস্তি কঠোর করা হচ্ছে।’
তিনি জানান, ইটভাটার েেত্র অবৈধ ইটভাটাগুলো বন্ধ করার চেষ্টা চলছে। নতুন কোনো ইটভাটাকে ছাড়পত্র দেয়া হবে না। পুরনো বাস ও ট্রাক যেগুলোর ফিটনেস সার্টিফিকেট নেই এবং যেগুলোর ‘ইকোনমিক লাইফ’ শেষ হয়েছে, সেগুলো রাস্তা থেকে সরানো হবে। কঠিন বর্জ্য পোড়ানোও নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি : বর্ষাকালে বায়ু ভালো থাকলেও জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের দূষিত বায়ু প্রবেশ করে। এতে শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। বিগত দেড় দশক ধরে দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারি উদ্যোগগুলো কার্যকর হয়নি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও সীমিত সময় ও সম্পদের মধ্যে যতটা সম্ভব করেছে, তবে সমস্যার মূল উৎস- বিশেষ করে ট্রান্স-বাউন্ডারি দূষণ এবং স্থানীয় অবৈধ কার্যক্রম- নিয়ন্ত্রণের জন্য আরো শক্তিশালী, বহুমুখী এবং স্থায়ী নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের প্রয়োজন।



