ফারাক্কা লংমার্চের ৫০ বছর

নতুন গঙ্গা চুক্তিতে ন্যায্য হিস্যার দাবি

Printed Edition
ফারাক্কা অভিমুখে ঐতিহাসিক লংমার্চের ৫০ বর্ষপূর্তি উদযাপন কমিটির সংবাদ সম্মেলন : নয়া দিগন্ত
ফারাক্কা অভিমুখে ঐতিহাসিক লংমার্চের ৫০ বর্ষপূর্তি উদযাপন কমিটির সংবাদ সম্মেলন : নয়া দিগন্ত

রাজশাহী ব্যুরো

ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চের ৫০তম বর্ষপূর্তি সামনে রেখে আবারো সরব হয়েছে উত্তরাঞ্চলের পানি আন্দোলন। গঙ্গা-পদ্মার পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় পরিবেশ, কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবন-জীবিকা ভয়াবহ সঙ্কটে পড়েছে দাবি করে নতুন গঙ্গা চুক্তিতে বাংলাদেশের পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। বৃহস্পতিবার রাজশাহী নগরীর একটি রেস্টুরেন্টের কনফারেন্স রুমে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এই দাবি তোলেন।

বক্তারা স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯৭৬ সালের ১৬ মে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে লাখো মানুষ রাজশাহীর মাদরাসা ময়দান থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটের উদ্দেশে পদযাত্রা করেছিলেন। কানসাটের সমাবেশে ভাসানী ফারাক্কা বাঁধকে ‘মরণ ফাঁদ’ আখ্যা দিয়ে ঘোষণা করেছিলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ এক আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পায় না’। ওই লংমার্চের পর আন্তর্জাতিক পরিসরে ফারাক্কার বিরূপ প্রভাব তুলে ধরতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৭ সালে দুই দেশের মধ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যাতে গ্যারান্টি কজের মাধ্যমে বাংলাদেশ নূ্যূনতম ২৭ হাজার ৬০০ কিউসেক পানি পাওয়ার নিশ্চয়তা পেত; কিন্তু ১৯৮২ সালের সমঝোতাস্মারকে সেই গ্যারান্টি কজ বাদ দেয়া হয়।

সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি গঙ্গায় পানিপ্রবাহ ছিল ৯০ হাজার ৭৩০ কিউসেক, যা ২০২৪ সালের একই দিনে নেমে আসে ৭৫ হাজার ৪০৯ কিউসেকে। মাত্র এক বছরে প্রবাহ কমেছে ১৫ হাজার ৩২১ কিউসেক।

বক্তারা অভিযোগ করেন, গত পাঁচ দশকে ফারাক্কার কারণে গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকায় ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় নেমে এসেছে। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে নদী সঙ্কুচিত হয়েছে, তলদেশ ভরাট হচ্ছে পলি ও বালুতে। গঙ্গার ডলফিন, ঘড়িয়াল এবং পদ্মার ইলিশ প্রায় হারিয়ে গেছে, বিলুপ্ত হয়েছে কয়েক প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণী। নদীকেন্দ্রিক জীবিকা হারিয়েছেন লাখো মানুষ। উত্তরাঞ্চলে সেচ সঙ্কট তীব্র হয়েছে, বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রায় সব গভীর নলকূপ অকেজো হয়ে পড়েছে এবং ভূগর্ভের পানির স্তর নেমে যাওয়ায় আর্সেনিক দূষণও বাড়ছে। অন্য দিকে দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধিতে কৃষি উৎপাদন কমছে এবং হুমকির মুখে পড়ছে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। বক্তারা ১৯৭৭ সালের গ্যারান্টি কজ পুনর্বহাল, বাংলাদেশ-ভারত-নেপাল ও চীনকে অন্তর্ভুক্ত করে নতুন যৌথ নদী কমিশন গঠন এবং জাতিসঙ্ঘের ১৯৯৭ সালের আন্তর্জাতিক পানি সনদে বাংলাদেশের স্বাক্ষরের দাবি জানান। পাশাপাশি ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারে বাংলাদেশের আর্থিক ও পরিবেশগত ক্ষতির হিসাব নিরূপণ করে ক্ষতিপূরণ আদায়েরও আহ্বান জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলন থেকে আগামীকাল শনিবার বেলা ৩টায় রাজশাহীর বড়কুঠী পদ্মাপাড়ে আয়োজিত গণজমায়েতে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে ফারাক্কা লংমার্চের ৫০ বর্ষপূর্তি উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট এনামুল হক, সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট হোসেন আলী পিয়ারা, হেরিটেজ রাজশাহীর সভাপতি ও নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী, ড্যাবের রাজশাহী সভাপতি ডা: ওয়াসিম হোসেন এবং তৌফিকুর রহমান লাবলুসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।