অবহেলিত পথশিশুদের বিবর্ণ শৈশব, নেই নাগরিক অধিকার

Printed Edition

আবদুল কাইয়ুম

  • মাদকসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে
  • মেয়ে পথশিশুর ৮২ শতাংশই নির্যাতনের শিকার
  • প্রয়োজন রাষ্ট্র ও সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ

রাজধানীর পল্টন মোড়ে মেট্রোরেলের নিচে মিটমিটে আলোয় কাগজ মুড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে চার-পাঁচজন পথশিশু ও যুবক। পাশে বসে কয়েকজন কাগজে আঠা ভরে নেশা করছে। নেই কোনো ছাউনি; ময়লা কাপড় আর খোলা আকাশই তাদের আশ্রয়। যেখানে রাত, সেখানেই ঘুম।

কৌতূহল নিয়ে এগোতেই ঘুরে বসে আজিজ নামের এক পথশিশু। তার ভাষায়, ‘পুরো ঢাকাই আমাদের ঘর। রাস্তার ধারে বা পার্কে কাগজ বিছিয়ে রাত কেটে যায়।’ ছোটবেলা থেকেই রাস্তায় বড় হওয়া আজিজ জানায়, মা অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন, বাবার পরিচয় সে জানে না। ‘আমাদেরও ইচ্ছে করে নিজের বাড়িতে থাকতে। একমুঠো খাবারের জন্য মার খেতে ভালো লাগে না। বাধ্য হয়েই এই জীবন বেছে নিতে হয়েছে।’

পড়াশোনা ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায় কি না জানতে চাইলে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে সে বলে, ‘প্রতি রাতে স্বপ্ন দেখি স্কুলে যাব, পরিবারের সাথে থাকব। কিন্তু আমাদের জীবন বদলাতে কেউ এগিয়ে আসে না। কেউ কেউ খাবার দেয়; কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য কিছু করে না।’ একই চিত্র এলিফ্যান্ট রোড এলাকায়। রাস্তার পাশে কাগজ টাঙিয়ে দুই সন্তান নিয়ে থাকেন ফরিদা বেগম। পদ্মার ভাঙনে গ্রাম হারিয়ে স্বামী-সন্তানসহ ঢাকায় এসে আশ্রয়হীন হয়ে পড়েন। তার স্বামী ভাঙারি কুড়িয়ে যা আয় করেন, তাতেই কোনো রকমে দিন চলে। ‘শীত-বৃষ্টিতে খুব কষ্ট হয়। আমাদের খোঁজ কেউ নেয় না,’ বলেন তিনি।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিন দেখা যায়, অসংখ্য ভাসমান মানুষ কাগজ, পলিথিন টানিয়ে বা ওভারব্রিজের নিচে অস্থায়ী আশ্রয় গড়ে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের প্রধান জীবিকা ভাঙারি কুড়ানো ও ভিক্ষাবৃত্তি। এদের অনেকেই গাঁজা, ইয়াবা, মদ, সিগারেট, এমনকি জুতার আঠা (ডেনড্রাইট) নেশায় আসক্ত। এতে অল্পবয়সেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ছে অনেকেই; সঠিক চিকিৎসার অভাবে অকালমৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে।

ভাসমান জনগোষ্ঠীর বড় অংশই জন্মনিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্রবিহীন। ফলে তারা ভোটাধিকারসহ বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। রাতে আশ্রয়ের খোঁজে সরকারি স্থাপনা বা আবাসিক এলাকায় গেলে মারধর, গালাগাল, এমনকি যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। নারী পথশিশুদের অবস্থা আরো শোচনীয়; যৌন নিপীড়ন ও পাচারের ঝুঁকি তাদের নিত্যসঙ্গী। অনেক শিশুই নদীভাঙন, দারিদ্র্য বা পারিবারিক নির্যাতনের কারণে রাস্তায় আসে। কেউ জন্ম থেকেই ভাসমান জীবনে বেড়ে ওঠে। শিক্ষা ও নিরাপদ পরিবেশের অভাবে তাদের একাংশ জীবিকার তাগিদে চুরি, ছিনতাই, মাদক পরিবহন কিংবা যৌন ব্যবসার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে পড়ে।

রাজধানীর কমলাপুর, বিমানবন্দর ও টঙ্গী রেলস্টেশন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, রমনা পার্ক, দোয়েল চত্বর, গাবতলী, সদরঘাটসহ বিভিন্ন ফুটওভারব্রিজ ও উন্মুক্ত স্থানে রাত কাটায় অসংখ্য পথশিশু।

জাতিসঙ্ঘের সংস্থা ইউনিসেফের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে আনুমানিক ৩৪ লাখ পথশিশু রয়েছে; এদের এক-তৃতীয়াংশ মেয়ে। মেয়েদের ৮২ শতাংশ কোনো না কোনো নির্যাতনের শিকার। শিশু আইন ২০১৩-এ পুনর্বাসনের বিধান থাকলেও সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রের সীমিত সক্ষমতার কারণে অধিকাংশই রাস্তায় রয়ে যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক পথশিশু মেয়ে দিনে প্রায় ১২ ঘণ্টা কাজ করে মাসে গড়ে দুই থেকে তিন হাজার টাকা আয় করে, যা দিয়ে ন্যূনতম চাহিদাও মেটে না। প্রায় ৪২ শতাংশ শিশু কোনো না কোনোভাবে মাদকে জড়িত।

অন্য একটি জরিপে উঠে এসেছে, ৭৯ শতাংশ পথশিশু জীবনের কোনো একপর্যায়ে মানসিক, শারীরিক ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়। পিতৃপরিচয় না থাকায় ৭৬ শতাংশ পথশিশুকে মানসিক নিপীড়ন, হেনস্তা, অশ্লীল ভাষায় গালাগাল শোনাসহ বিভিন্ন ধরনের কটূক্তির শিকার হতে হয়। তা ছাড়া শুধু শারীরিক নির্যাতনের শিকার ৬২ শতাংশ পথশিশু। দৈনিক গড়ে ১০ ঘণ্টা ভিক্ষা করে একটি পথশিশু। ৩৫ শতাংশ শিশু ভিক্ষা করার কথা স্বীকার করেছে। ৪২ শতাংশ শিশু রাস্তায় বিভিন্ন জিনিস বিক্রি করে। ৯৫ দশমিক ৫ শতাংশ পথশিশু প্রাতিষ্ঠানিক বা অপ্রাতিষ্ঠানিক কোনো ধরনের পড়াশোনা করছে না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর পথশিশু জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, পথশিশুদের বড় অংশ ঢাকা বিভাগে অবস্থান করছে; তাদের ৮২ শতাংশ ছেলে, ১৮ শতাংশ মেয়ে। অধিকাংশেরই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সাথে কোনো সংযোগ নেই। জরিপ বলছে, ৫৪ শতাংশ পথশিশুর বয়স ১০ থেকে ১৪ বছর। এদের বড় অংশটিই ধূমপান ও মাদকে আসক্ত। অদ্ভুত বিষয় হলো, ৬৪ শতাংশ পথশিশু আর তাদের পরিবারে ফিরে যেতে চায় না।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘পথশিশুরাও দেশের নাগরিক। সুযোগ পেলে তারাও নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে।’ তিনি আবাসিক আশ্রয়কেন্দ্র, প্রাথমিক ও কারিগরি শিক্ষা এবং বৈধ নাগরিকত্ব নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পথশিশুদের অপরাধী হিসেবে দেখলে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন সমন্বিত নীতি, কার্যকর পুনর্বাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ। রাষ্ট্রের পাশাপাশি এনজিও, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সমাজের বিত্তবানদেরও এগিয়ে আসা উচিত। তাদের মতে, এই শিশুদের সঠিক সুরক্ষা ও কারিগরি শিক্ষা দিতে পারলে তারা দেশের সম্পদে পরিণত হবে। নতুবা তারা সমাজের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে এবং কিশোর গ্যাংয়ের মতো অপরাধী চক্র গড়ে তুলবে। পথশিশুদের অন্ধকার জীবনে আলোর মুখ দেখাতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেয়া সময়ের দাবি।