পিপিপির ৭ প্রকল্পের খরচ ১.২২ লাখ কোটি টাকা

উন্নয়ন বাজেট ২০২৬-২৭

হামিদুল ইসলাম সরকার
Printed Edition

  • মাতারবাড়ী এলএনজি টার্মিনাল প্রকল্প ৩০ হাজার কোটি টাকার
  • কমলাপুর মাল্টি মোডাল হাব নির্মাণে ব্যয় ২২ হাজার ৫০ কোটি টাকা

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের উন্নয়ন বাজেটে (এডিপি) বিদেশী অর্থায়নের মতোই সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) ভিত্তিক ৮০টি প্রকল্প নিয়েছে সরকার। প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারকে টাকার জন্য বিভিন্ন সংস্থা ও দেশের পিছে ঘুরতে হবে। পিপিপি’র শুধু সাতটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়নেই লাগবে এক লাখ ২১ হাজার ২৯১ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। অবকাঠামো উন্নয়ন, যোগাযোগব্যবস্থা সম্প্রসারণ, জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার লক্ষ্যেই এসব প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। এখানে মাতারবাড়ী ল্যান্ড বেজড এলএনজি টার্মিনাল প্রকল্পে ৩০ হাজার কোটি টাকা এবং ঢাকার কমলাপুর মাল্টি মোডাল হাব নির্মাণে ২২ হাজার ৫০ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে বলে পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য থেকে জানা গেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রকল্পগুলোর আর্থিক সমঝোতা, ভূমি অধিগ্রহণ, পরিবেশগত অনুমোদন এবং সময়মতো বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

পরিকল্পনা কমিশন তথ্য সূত্রে জানা গেছে, নতুন অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ধরা হয়েছে তিন লাখ কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে এক লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে এক লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা অর্থায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। পিপিপি প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাবে এবং সরকারের ওপর সরাসরি অর্থায়নের চাপ কমবে। একই সাথে বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নির্বাচিত সাতটি পিপিপি প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে- পরিবহন, সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও নগর অবকাঠামো খাতের উদ্যোগ। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পায়নের গতি বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ ধরা হয়েছে মাতারবাড়ী ল্যান্ড-বেজড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন প্রকল্পে। এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ হাজার ৩৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানিচাহিদা পূরণ এবং আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করাই প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য। বতর্মানে এটি চুক্তি স্বাক্ষর পর্যায়ে রয়েছে।

আর রেলভিত্তিক আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কমলাপুর মাল্টি মোডাল হাব প্রকল্পে ব্যয়ের প্রস্তাব রাখা হয়েছে ২২ হাজার ৫৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। রাজধানীর গণপরিবহন, আন্তঃনগর রেল, মেট্রোরেল এবং বাস যোগাযোগকে সমন্বিত করাই এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য। এটির টিএ ডেভেলপমেন্ট পর্যায়ে রয়েছে। সামুদ্রিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে চট্টগ্রাম বন্দরের বে টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭ হাজার ৭৫৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের পণ্য হ্যান্ডলিং সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে এবং জাহাজজট কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এ দিকে রাজধানীর যানজট নিরসনে ঢাকা আউটার রিং রোড প্রকল্পে বিনিয়োগ ধরা হয়েছে ১২ হাজার ৯৯৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। একই সাথে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩ হাজার ২৬৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ঢাকা ইস্ট ওয়েস্ট এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে নির্মাণে ১৭ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। তিনটি প্রকল্পই রাজধানী ও আশপাশের এলাকার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। দুটো প্রকল্পের কাজ টিএ ডেভেলপমেন্ট পর্যায়ে রয়েছে।

সড়ক যোগাযোগ খাতে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার হাইওয়ে উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয়ের প্রস্তাব রাখা হয়েছে ১২ হাজার ৪২৭ কোটি টাকা। পর্যটন, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রকল্পটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। এটির বিস্তারিত সমীক্ষা কার্যক্রম চলমান আছে। অন্য দিকে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাথে বিকল্প সংযোগ গড়ে তুলতে পাটুরিয়া-গোয়ালন্দ এলাকায় দ্বিতীয় পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা। পদ্মা সেতুর ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় সড়ক নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বাড়াতে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।

চলতি এডিপিতে ৮১ প্রকল্প : পরিকল্পনা কমিশন ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে মোট ৮১টি পিপিপি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে পরিবহন, সড়ক অবকাঠামো, অর্থনৈতিক অঞ্চল, স্বাস্থ্যসেবা ও নগর উন্নয়ন খাতের উদ্যোগ রয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণ, অর্থায়ন চূড়ান্তকরণ, দরপত্র প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয় ঘাটতির কারণে বেশ কিছু প্রকল্প প্রত্যাশিত গতিতে এগোতে পারেনি। ফলে কয়েকটি প্রকল্পের বাস্তবায়ন সময়সীমা পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের অভিমত : পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জাইদি সাত্তার সম্প্রতি এক আলোচনায় মন্তব্য করেন, সরকারি বিনিয়োগের দক্ষতা বাড়াতে হবে এবং উন্নয়ন ব্যয়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে। বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার ও দীর্ঘমেয়াদি সুফল বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন।

অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন বাজেট ক্রমেই ঋণনির্ভর হয়ে পড়ছে। তাই নতুন বড় অবকাঠামো প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে আর্থিক টেকসইতা ও বিনিয়োগের প্রত্যাশিত ফলাফল সতর্কতার সাথে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তার মতে, পিপিপি মডেল সরকারি অর্থায়নের চাপ কমাতে পারে, তবে প্রকল্পের অর্থনৈতিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে।