রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও শিক্ষাতত্ত্বের বহুল আলোচিত একটি ধারণা হলো, কোন শিক্ষাব্যবস্থার মান শুধু তার পাঠ্যক্রম, পরীক্ষা বা অবকাঠামো দিয়ে নির্ধারিত হয় না; সঙ্কটকালে সেই ব্যবস্থার সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, মানবিক সংবেদনশীলতা এবং শিক্ষার্থীদের সাথে আস্থার সম্পর্কই তার প্রকৃত শক্তির মাপকাঠি। শিক্ষাবিদ জন ডিউই বলেছিলেন, শিক্ষা কেবল জীবনের জন্য প্রস্তুতি নয়; এটি সমাজ, রাষ্ট্র ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি চলমান সামাজিক প্রতিষ্ঠান। তাই ইতিহাসে দেখা যায়, যখনই শিক্ষা প্রশাসন বাস্তবতা অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছে কিংবা শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক উদ্বেগকে গুরুত্ব দেয়নি, তখনই শিক্ষাঙ্গন অস্থির হয়ে উঠেছে।
১৯৬৮ সালের ফ্রান্সের ছাত্র আন্দোলন, দক্ষিণ কোরিয়ার গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব, বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, নব্বইয়ের গণ-আন্দোলন কিংবা সর্বশেষ জুলাই অভ্যুত্থান- সব ক্ষেত্রেই ছাত্রসমাজ ছিল পরিবর্তনের অগ্রভাগে। এসব ঘটনায় শিক্ষার্থীরা শুধু তাৎক্ষণিক কোনো ঘটনার প্রেক্ষিতে প্রতিক্রিয়া দেখায়নি; বরং দীর্ঘদিনের অসন্তোষ, নীতিগত অসঙ্গতি এবং আস্থার সঙ্কট এক সময় সংগঠিত প্রতিবাদের রূপ নিয়েছিল। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে সাম্প্রতিক এইচএসসি পরীক্ষা ঘিরে সৃষ্ট অস্থিরতাকেও নিছক পরীক্ষা স্থগিতের দাবি বা একটি বিতর্কিত মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সঙ্কট মোকাবেলা এবং রাষ্ট্র-শিক্ষার্থী সম্পর্কের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা নতুন করে সামনে এনেছে।
জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে দেশের মানুষ যখন টানা বর্ষণ, বন্যা ও জলাবদ্ধতার সাথে লড়াই করছিল, তখন আরেকটি দৃশ্যও সমানভাবে আলোচনায় উঠে আসে। হাতে প্রবেশপত্র, কাঁধে ব্যাগ নিয়ে কোমরসমান পানি ভেঙে পরীক্ষাকেন্দ্রে যাচ্ছে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। কোথাও নৌকায় করে কেন্দ্রে পৌঁছাতে হয়েছে, কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থেকেও পরীক্ষা দিতে হয়েছে। আবার অনেকেই নির্ধারিত সময়ে কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেনি। এমন অসহায় পরিস্থিতির মধ্যেও পরীক্ষা চলমান রাখার সিদ্ধান্ত ঘিরে যে বিতর্কের জন্ম হয়, তা কয়েক দিনের মধ্যেই দেশব্যাপী ছাত্র আন্দোলনে রূপ নেয়। পরে শিক্ষামন্ত্রীর কথিত ‘ফার্মের মুরগি’ মন্তব্য সেই ক্ষোভ আরো উসকে দেয়। ঢাকার সায়েন্স ল্যাব থেকে উত্তরা, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সামনে থেকে শুরু করে রাজশাহী, বরিশাল, কুমিল্লা, সিলেট, রংপুর- দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসে। তাদের দাবি ছিল পরীক্ষা স্থগিত করা, যারা পরীক্ষা দিতে পারেনি তাদের আবার সুযোগ দেয়া এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ।
যে কোনো গণতান্ত্রিক সমাজে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ করার অধিকার আছে। বিশেষ করে যখন তারা মনে করে কোনো সিদ্ধান্ত তাদের প্রতি অবিচার করেছে, তখন ক্ষোভ প্রকাশ করাও স্বাভাবিক। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, শিক্ষাঙ্গনের অস্থিরতা কখনোই জাতির জন্য কল্যাণকর নয়। কারণ শিক্ষাঙ্গন শুধু জ্ঞানচর্চার স্থান নয়; এখান থেকেই ভবিষ্যতের নেতৃত্ব তৈরি হয়। তাই এই আন্দোলনকে শুধু একটি পরীক্ষা বা একটি মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের কিছু অসন্তোষ, সিদ্ধান্তগত দুর্বলতা এবং শিক্ষাব্যবস্থার কিছু গভীর সঙ্কট, যা ধীরে ধীরে জমে এসে এই ঘটনায় বিস্ফোরিত হয়েছে।
প্রথমেই বলতে হয়, দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ ছিল। দেশের একাধিক জেলায় বন্যা, পাহাড়ি ঢল এবং জলাবদ্ধতার কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অসংখ্য ভিডিওতে দেখা গেছে, পরীক্ষার্থীরা ভেজা পোশাকে, নৌকায় কিংবা কোমরসমান পানি অতিক্রম করে কেন্দ্রে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। অনেক অভিভাবকও সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। এমন বাস্তবতায় পরীক্ষা কয়েক দিন পিছিয়ে দিলে শিক্ষাবর্ষে হয়তো সামান্য পরিবর্তন আসত, কিন্তু হাজারো শিক্ষার্থীর অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগ অনেকটাই কমানো যেত।
সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য ভিন্ন ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, আবহাওয়া অধিদফতর এবং মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করেই পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। সংসদে শিক্ষামন্ত্রীও বলেন, অধিকাংশ জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে বড় ধরনের সমস্যার তথ্য পাওয়া যায়নি। কিন্তু এখানেই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা সামনে আসে। কোনো দুর্যোগে শুধু দাফতরিক রিপোর্টের ওপর নির্ভর করলে অনেক সময় বাস্তব চিত্র ধরা পড়ে না। মাঠের মানুষের অভিজ্ঞতা, স্থানীয় পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য ঝুঁকিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পরে যখন বিভিন্ন গণমাধ্যমে বাস্তব পরিস্থিতির ছবি প্রকাশিত হতে থাকে, তখন সরকারি বক্তব্য এবং মানুষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মধ্যে একটি স্পষ্ট দূরত্ব তৈরি হয়। এই দূরত্বই মূলত মানুষের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যোগাযোগের ব্যর্থতা। সঙ্কটের সময় মানুষ শুধু সিদ্ধান্ত নয়, সিদ্ধান্তের পেছনের যুক্তিটিও জানতে ও বুঝতে চায়। রাষ্ট্র যদি সময়মতো পরিষ্কার, বিশ্বাসযোগ্য এবং সহানুভূতিশীল ভাষায় মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ভুল বোঝাবুঝি পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। এই ক্ষেত্রে সেটিই ঘটেছে। শিক্ষার্থীদের বড় অংশ মনে করেছে, তাদের কষ্ট ও বাস্তবতা যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। এরপর যখন শিক্ষামন্ত্রীর কথিত ‘ফার্মের মুরগি’ মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, তখন ক্ষোভ আরো তীব্র হয়ে ওঠে। যদিও পরে তিনি সংসদে দুঃখ প্রকাশ করেন, কিন্তু ততক্ষণে জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়ে গেছে।
বাস্তবতা হলো, একজন শিক্ষামন্ত্রী শুধু একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা নন; তিনি লাখো শিক্ষার্থীর কাছে অভিভাবকের প্রতীক। তাই তার প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি মন্তব্য এবং প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত সংযত হওয়া উচিত। সঙ্কটের সময় একটি অসতর্ক বাক্য যে, কখনো দীর্ঘদিনের আস্থাও নষ্ট করে দিতে পারে, এটাই তার প্রমাণ। বর্তমান ডিজিটাল যুগে একটি ছোট ভিডিও ক্লিপ বা কয়েক সেকেন্ডের বক্তব্যও মুহূর্তের মধ্যে কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে জনসম্পৃক্ত দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ভাষা ও আচরণে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সতর্ক হওয়া জরুরি। তাছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তো আছেই। তিলকে তাল করে ভিডিও ক্লিপ বানিয়ে অপপ্রচারের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করতে ভেতরের ও বাইরের শত্রুরা সর্বদা সচেষ্ট।
তবে এই আন্দোলনকে শুধু একটি মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া বললেও পুরো সত্য বলা হবে না। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা একের পর এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। করোনা মহামারীর দীর্ঘ শিক্ষাবিরতি, নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে বিতর্ক, পাবলিক পরীক্ষার কাঠামো পরিবর্তন, প্রশ্নপত্রের মান নিয়ে সমালোচনা, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা- এসব বিষয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগে থেকেই এক ধরনের মানসিক চাপ তৈরি করেছিল। ফলে দুর্যোগের মধ্যে পরীক্ষা নেয়ার সিদ্ধান্ত সেই জমে থাকা অসন্তোষেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে।
আরেকটি বিষয়ও এখানে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা দরকার। আন্দোলনের শুরুতে শিক্ষার্থীদের দাবির বড় অংশ ছিল বাস্তবসম্মত। পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা করার দাবি অযৌক্তিক ছিল না। প্রশ্নপত্রে ত্রুটি থাকলে সেটির সমাধানও কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে কিছু জায়গায় আন্দোলনের ভাষা ও পদ্ধতিতে পরিবর্তন দেখা যায়। বিভিন্ন স্থানে মহাসড়ক অবরোধ, দীর্ঘ সময় যান চলাচল বন্ধ রাখা এবং সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগে ফেলার ঘটনা ঘটে। গণতান্ত্রিক সমাজে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার অবশ্যই রয়েছে, কিন্তু সেই অধিকার অন্যের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে দীর্ঘ সময় ব্যাহত করার অনুমতি দেয় না। প্রতিবাদের শক্তি তখনই সবচেয়ে বেশি কার্যকর হয়, যখন তা নৈতিক অবস্থান ধরে রাখতে পারে।
এই ঘটনায় আরেকটি প্রশ্নও সামনে এসেছে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কি এখনো অতিরিক্ত পরীক্ষানির্ভর? একটি পরীক্ষার তারিখ কয়েক দিন পরিবর্তন করা নিয়ে এত বড় সঙ্কট কেন তৈরি হবে? উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই দুর্যোগ বা জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্প সময়সূচি, অঞ্চলভিত্তিক পরীক্ষা কিংবা নমনীয় মূল্যায়নপদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশেও দীর্ঘমেয়াদে এমন ব্যবস্থা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে, যেখানে শিক্ষার্থীর নির্দিষ্ট একদিনের লিখিত পরীক্ষা দিয়েই পুরো বছরের পড়াশোনার মূল্যায়ন হবে না। ধারাবাহিক মূল্যায়ন, বিদ্যালয়ভিত্তিক মূল্যায়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর মূল্যায়ন পদ্ধতি ধীরে ধীরে শক্তিশালী করা গেলে ভবিষ্যতে এমন সঙ্কট অনেকটাই এড়ানো সম্ভব।
সবচেয়ে বড় কথা, এই পুরো ঘটনায় সরকার, শিক্ষা প্রশাসন, শিক্ষক, অভিভাবক এবং শিক্ষার্থী সবারই কিছু না কিছু শেখার আছে। সরকারকে বুঝতে হবে, দুর্যোগের সময় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ মানুষের আস্থা বৃদ্ধিতে সহায়ক। শিক্ষার্থীদেরও মনে রাখতে হবে, তাদের ন্যায্য দাবির অবশ্যই গুরুত্ব পাওয়া উচিত, তবে দাবি আদায়ের পদ্ধতিও হতে হবে এমন, যাতে সাধারণ মানুষের সমর্থন অটুট থাকে এবং তাদের ভুল সিদ্ধান্তের সুযোগ নিয়ে যেন পরাজিত অপশক্তি দেশ ও মানুষের ক্ষতি করতে না পারে।
শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ যত বেশি অস্থির হবে, ক্ষতি শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদেরই হবে। কারণ হারিয়ে যাওয়া ক্লাস, পিছিয়ে পড়া পাঠক্রম কিংবা দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার মূল্য একসময় তাদেরই দিতে হবে।
২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষা ঘিরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সেটিকে তাই কোনো এক পক্ষের জয় বা পরাজয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি একটি সতর্কবার্তা- আমাদের শিক্ষা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সঙ্কট ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষার্থীদের সাথে যোগাযোগের পদ্ধতি নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। শিক্ষা এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে অনমনীয়তা নয়, প্রজ্ঞা ও সহমর্মিতাই কার্যকর সমাধান। আমরা যদি এই ঘটনাকে সেই শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে পারি, তবেই ভবিষ্যতে শিক্ষাঙ্গন আরো স্থিতিশীল, মানবিক এবং আস্থাশীল হয়ে উঠবে।
লেখক : অধ্যাপক (অব:), সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়



