জুলাইবিপ্লবের পর এর ব্যাপ্তি বৈধতা ও যৌক্তিকতা নিয়ে অনেকে কথা বলছেন। এ ব্যাপারে প্রশ্ন তোলা, জুলাই ঘোষণাপত্রের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য নেতিবাচক ভূমিকা সব কিছুরই সুবিধাভোগী হবেন তারা, যারা জুলাইবিপ্লবের ভয়ে গা ঢাকা দেন। ৫ই আগস্টের পর বিভিন্ন দলের প্রভাবশালী নেতারা মিডিয়ায় যেসব বক্তব্য দেন তা থেকে এখন তারা প্রায় ১৮০ ডিগ্রি ডিগবাজি দিয়েছেন। জুলাই ঘোষণার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় দ্বিমত থাকা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু বিপ্লবকে যারা খাটো করছেন তারা মূলত ফ্যাসিবাদী প্রোপাগান্ডা এবং বয়ানকেই সরাসরি সমর্থন করছেন।
যারা এখনো জুলাইবিপ্লবের যৌক্তিকতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন, তারা ভুলে যাচ্ছেন যে, ৩৬ জুলাই জাতিকে প্রকৃত স্বাধীনতা ও মুক্তি এনে দিয়েছিল। রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের পুনর্জন্ম দিয়েছিল। ৫ আগস্ট অনেক জাতীয় নেতার কান্নাভেজা স্বীকৃতি জাতি আজও ভুলে যায়নি। এখনকার সামনের সারির নেতাদের অনেকেই তখন প্রকাশ্য মিডিয়ায় এ আন্দোলনের সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন।
ফ্যাসিবাদের পতনের পর তারা খোড়লের ভেতর থেকে বেরিয়ে এ বিপ্লবের মহানায়ক সাজার চেষ্টা করেন। তরুণদের, ছাত্রছাত্রীদের, সাধারণ জনগণের সম্পৃক্ততার কথা তারা অবলীলায় অস্বীকার করছেন। অথচ এ বিপ্লবের নায়ক, কুশীলব এ দেশের মুটে মজুর ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন ব্যতিরেকে তাদের রক্তস্রোতের অর্জনকে বাস্তব রূপ দেয়া সম্ভব নয়।
এই বিপ্লবের একটি বড় দুর্বলতা মিডিয়ার আদর্শিক পরিবর্তন করতে না পারা। এসব মিডিয়া এবং তথাকথিত সুশীলসমাজের এক অংশ বিপ্লবের প্রথম থেকেই একে ‘মব’ ও ‘জঙ্গি উত্থান’-এর লেবাস চাপানোর যারপরনাই চেষ্টা চালান। বিপ্লবের গতিধারাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ধারায় ফেরার চেষ্টাকে অবদমনের চেষ্টা করেন। তারা বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে নিয়েছেন সরকারি দলের ছত্রছায়ায়। তাদের প্রভাবে সরকারি দলের প্রথম সারির অনেক নেতাই এখন বিপ্লবকে খাটো করছেন। বিপ্লবের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের অনেকে এখন কথিত দুর্নীতির দায়ে অন্তর্বর্তী সরকারের বিচারের দাবি তুলছেন। দেশের প্রায় সব ক’টি ইলেকট্রনিক মিডিয়া জুলাইবিপ্লব ও বৃহত্তর জাতীয় চেতনাবিরোধী ভূমিকাকে দায়মুক্তি দেয়ার চেষ্টা করছে। বিদেশী মিডিয়াগুলো এখনো আমাদের জাতীয় সাংস্কৃতিক ধারার বিপরীত অবস্থানে রয়ে গেছে। ভিনদেশীয় সংস্কৃতির অবারিত দুয়ার জুলাইবিপ্লবের চেতনা ক্ষুণ্ন করবেই।
যারা জুলাইবিপ্লবকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারেননি, তারা চতুরতার সাথে অত্যন্ত সফলভাবে অন্তর্বর্তী সরকার, বিশেষ করে ডক্টর ইউনূসকে কোণঠাসা করতে পেরেছিলেন যেন তিনি কোনো সংস্কারমূলক কাজ করতে না পারেন। দেড় বছরে ১৪৩টি ধর্মঘট, যমুনা ঘেরাও অন্য কোনো সরকারের সময় কোনো দিন হয়নি, ভবিষ্যতেও হওয়ার সম্ভাবনা কম। যারা এসব কর্মযোগের হোতা, তারা এখন ঘরে বসে আয়েশি জীবনযাপন করছেন মুখে তালা লাগিয়ে।
এসব নেতার কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখা দরকার গণতন্ত্রের নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতার স্বার্থে, সরকারের স্বার্থে। কারণ আস্তিনের ভেতরে লুকানো সাপ যেকোনো সময় ছোবল মারতে পারে। এরাই অতীতে বাধার প্রাচীর তৈরি করেছিল দেশের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিতে। স্তুতিবাদের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়েছিল নিজ স্বার্থ হাসিলের জন্য। একই সাথে যারা অন্যদের প্ররোচনায় অন্তর্বর্তী সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে মব সন্ত্রাস সৃষ্টি করেছিল, তাদের মুখোশ খুলে দেয়ার এখনই মোক্ষম সময়।
জুলাইবিপ্লবের বর্ষপূর্তিতে দেখছি বিভিন্ন টকশোতে অনেকেই বিপ্লব ও বিপ্লবের কুশীলবদের নিয়ে অবলীলায় চরম অশ্রদ্ধাভরে বক্তব্য দিচ্ছেন। এটি স্বাভাবিক। কারণ ফ্যাসিবাদ পতনে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার দুঃখে তারা মুহ্যমান। অবস্থা যাই হোক, জুলাই সনদের বাস্তবায়নের মাধ্যমে জুলাই শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং জাতির প্রত্যাশা পূরণের কোন বিকল্প নেই, এ কথা সবাইকে বুঝতে হবে।
জুলাই এখন শুধু ক্যালেন্ডারের একটি পাতা নয়- নয় একটি মাস। জুলাই একটি ইতিহাস। ভয়কে জয় করার ইতিহাস। তারুণ্যের দৃপ্ত পদযাত্রায় রক্তস্নাত অবিস্মরণীয় বিপ্লবের ইতিহাস। জাতির পুনর্মুক্তির ইতিহাস। ২৪-এর জুলাই শুধু বর্ষার মেঘঢাকা মাস ছিল না, ছিল প্রত্যাশার মাস। ঘুরে দাঁড়ানোর মাস। আত্মোপলব্ধির দুর্নিবার চেতনার স্ফুলিঙ্গে শাণিত একটি নাম। স্বাধীনতা, স্বকীয়তা, সার্বভৌমত্বের রক্তাক্ত পতাকায় জড়ানো এই জুলাইবিপ্লব নিয়ে যারা বিতর্কের অবতারণা করছেন তারা ভুলে যাচ্ছেন যে, জুলাই না থাকলে তারাও থাকবেন না।
লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ



