নিজস্ব প্রতিবেদক
পবিত্র ঈদুল আজহার সরকারি বর্ধিত ছুটিকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী ভ্রমণপিপাসুদের ঢল নেমেছে। চাঙা হয়ে উঠেছে দেশের পর্যটন খাত। কর্মব্যস্ত জীবনের কান্তি দূর করতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মানুষ ছুটে গেছেন সাগর, পাহাড় ও অরণ্যঘেরা মায়াবী জনপদগুলোতে। হোটেল-রিসোর্টগুলোর প্রায় শতভাগ কক্ষ আগে থেকেই বুকড হয়ে যাওয়ায় পর্যটন ব্যবসায়ীদের মুখে দীর্ঘ সময় পর হাসির রেখা দেখা গেছে।
পর্যটন খাত সংশ্লিষ্টদের ধারণা সারা দেশে আনুমানিক ৮ থেকে ১০ লাখেরও বেশি অভ্যন্তরীণ পর্যটকের সমাগম হয়েছে। যদিও সরকারিভাবে পুরো দেশের মোট পর্যটকের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে দেশের প্রধান পর্যটন কেন্দ্রগুলোর হোটেল বুকিং ও প্রতিদিনের দর্শনার্থীদের ভিড় বিশ্লেষণ করে এই সংখ্যা অনুমান করা হয়েছে।
দেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজারের সুগন্ধা, লাবণী ও কলাতলী পয়েন্ট এখন উৎসবমুখর। তীব্র রোদ উপেক্ষা করেই হাজার হাজার মানুষ মেতেছেন সমুদ্রস্নানে। কেউ ঘোড়ায় চড়ছেন, কেউ বিচ বাইক কিংবা জেটস্কি নিয়ে উল্লাসে মাতাছেন। এছাড়া মেরিন ড্রাইভ ও হিমছড়িতেও ছিল দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়।
সাগরকন্যা কুয়াকাটায় একই সাথে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখতে ছুটির তৃতীয় দিন থেকে ভিড় কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। জিরো পয়েন্ট ছাড়াও লেবুর বন, ঝাউবন ও গঙ্গামতি সৈকতে পর্যটকদের আনাগোনা ছিল চোখে পড়ার মতো।
রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ির সাজেক ভ্যালিতে পাহাড়ের চূড়ায় মেঘের স্পর্শ নিতে প্রতিদিন প্রায় তিন থেকে চার হাজার পর্যটক সমাগম হচ্ছে। সেখানকার ১২৫টিরও বেশি কটেজ ও রিসোর্টে কোনো আসন খালি নেই। রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদে বোট রাইডিং, ঝুলন্ত সেতু ও পলওয়েল পার্কে পর্যটকদের উপস্থিতি ছিল ব্যাপক। এদিকে খাগড়াছড়ির আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র ও রিছাং ঝরনাতেও ঘরমুখো মানুষের সমাগম লক্ষ্য করা গেছে।
সিলেটের গোয়াইনঘাটের জাফলং, বিছনাকান্দি এবং রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্টে জল-পাথরের খেলা দেখতে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এবং সবুজে ঘেরা চা বাগানগুলোর সৌন্দর্য উপভোগ করতে বিপুলসংখ্যক মানুষ বুকিং দিয়েছেন স্থানীয় রিসোর্টগুলোতে। নিরাপত্তা ও প্রশাসনের বক্তব্য পর্যটকদের নিরাপত্তা ও যেকোনো ধরনের হয়রানি বন্ধে বিশেষ তৎপরতা দেখা গেছে ট্যুরিস্ট পুলিশের। কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর মনিরুল ইসলাম জানান, লাবণী, কলাতলী ও সুগন্ধা পয়েন্টে কুইক রেসপন্স টিম ও মোবাইল টিম সার্বক্ষণিক কাজ করছে। লাইফগার্ডের সহায়তায় অনিরাপদ জোনে সমুদ্রস্নানে পর্যটকদের সতর্ক করা হচ্ছে।
এছাড়া পর্যটন স্পটগুলোতে অতিরিক্ত ভাড়া বা খাবারের দাম নিয়ন্ত্রণে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নজরদারিও সচল রয়েছে।
ফাঁকা ঢাকায় উৎসবের আমেজ
এদিকে পবিত্র ঈদুল আজহার টানা ছুটিতে ফাঁকা ঢাকায় চলছে উৎসবের আমেজ। তীব্র রোদ ও গরম উপেক্ষা করে রাজধানীর বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে ভিড় করছেন কয়েক লাখ মানুষ। ২৬ মে থেকে গতকাল পর্যন্ত নগরীর ব্যস্ত সড়কগুলো ফাঁকা থাকলেও বিনোদন কেন্দ্রগুলো ছিল লোকে লোকারণ্য। পরিবার-পরিজন ও শিশুদের নিয়ে একটু স্বস্তির খোঁজে নগরবাসী দলে দলে ছুটে গেছেন চিড়িয়াখান, বোটনিকেল গার্ডেন, রমনা পার্ক, রবীন্দ্র সরোবর, হাতিরঝিল, লালবাগের কেল্লা, আহসান মঞ্জিলসহ নগরীর বিভিন্ন বিনোদন স্পটে।
তীব্র রোদ আর ভ্যাপসা গরমের ক্লান্তি ভুলে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষ মেতে উঠেছেন ঈদ উন্মাদনায়। বরাবরের মতোই মানুষের প্রধান আকর্ষণ ছিল মিরপুর জাতীয় চিড়িয়াখানা। বিশেষ করে শিশুদের বন্যপ্রাণীর সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে অভিভাবকরা এখানে ভিড় জমান।
চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ জানায়, ঈদের ছুটির দিনগুলোতে প্রতিদিন এখানে ১ থেকে ১.৫ লক্ষাধিক দর্শনার্থীর সমাগম ঘটেছে। তীব্র গরমে বাঘ, সিংহ ও জলহস্তী খাঁচার পানিতে অলস সময় পার করলেও দর্শনার্থীদের উৎসাহে কোনো কমতি ছিল না। বিশেষ করে চিড়িয়াখানায় সদ্য যুক্ত হওয়া বিরল প্রজাতির অ্যালবেনো বাফেলো (সাদা মহিষ) দেখতে খাঁচার সামনে মানুষের ভিড় ছিল সবচেয়ে বেশি।
অন্যদিকে খোলা আকাশের নীচে মুক্ত বাতাস আর পানির সৌন্দর্য উপভোগ করতে অনেকে বেছে নিয়েছেন হাতিরঝিল-ধানমন্ডিসহ সবুজঘেরা প্রকৃতি। প্রতিদিন বিকেলে হাতিরঝিল এলাকায় তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। লেকের পাড়ে বসে ঠাণ্ডা বাতাস উপভোগ করার পাশাপাশি ওয়াটার ট্যাক্সির আনন্দ ভ্রমণে মেতেছিলেন হাজারো মানুষ।
একই চিত্র দেখা গেছে ধানমন্ডি লেক ও রবীন্দ্র সরোবর এলাকায়ও। লেকের শান্ত পানিতে প্যাডেল চালিত নৌকা বা বোট রাইডিং করতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ পরিবারসহ ছুটে এসেছেন। এছাড়া কলাবাগান শিশু পার্কের রাইডগুলোতেও ছিল শিশুদের কোলাহল ও দীর্ঘ লাইন। ধানমন্ডি লেক ও রবীন্দ্র সরোবর এলাকায় প্রতিদিন অর্ধলক্ষ মানুষের সমাগম হয়েছে। লেকের শান্ত পানিতে প্যাডেল চালিত নৌকা বা বোট রাইডিং করতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ পরিবারসহ ছুটে এসেছেন।



