নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অগ্নিশিখা ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিার্থী আবু সাঈদ হত্যার দায়ে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক দুই সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে অন্য তিনজনকে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও শিকসহ অপর ২৫ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন- বিচারক মো: মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। রায়ের দিন গ্রেফতারকৃত ছয়জন আসামি উপস্থিত ছিলেন।
রায় ঘোষণার সময় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মোহাম্মদ মিজানুল ইসলাম, প্রসিকিউটর আব্দুস সোবহান তরফদার ও প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম, প্রসিকিউটর মঈনুল করীম, ব্যারিস্টার শাঈখ মাহাদী, তারেক আব্দুল্লাহ উপস্থিত ছিলেন। আসামিপে ছিলেন আইনজীবী আমিনুল গণি টিটো, আজিজুর রহমান দুলুসহ আরো কয়েকজন। পলাতক আসামিদের পে ছিলেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী সুজাদ মিয়া। এ ছাড়া আসামিদের পরিবারের একজন করে সদস্যকে এদিন ট্রাইব্যুনালে রাখা হয়েছিল।
রায়ের পর্যবেণে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান রায়ের শুরুতে বলেন, আজ যার রায় ঘোষণা করা হবে, তিনি জুলাই গণ-আন্দোলনের প্রথম শহীদ। তিনি দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়েছিলেন। ভেবেছিলেন তার সামনে যারা ছিল, তারা সবাই মানুষ। ভেবেছিলেন তার কিছু হবে না। কিন্তু তারা মানুষ ছিল না। তারা অমানুষ হয়ে গিয়েছিল।
দুপুর সোয়া ১২টার দিকে এ মামলার সংপ্তি রায় পড়া শুরু হয়। এর আগে বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে আসামিদের ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় তোলা হয়। সকাল ৯টার দিকে এই মামলার গ্রেফতার আসামিদের ট্রাইব্যুনালে আনা হয়। রায় উপলে ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তা কিছুটা বাড়ানো হয়েছিল।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি হলো- পুলিশের সাবেক এএসআই মো: আমির হোসেন ও সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। রায়ে তিনজনকে দেয়া হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। তারা হলো- সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোতোয়ালি জোন) আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, তাজহাট থানার সাবেক অফিসার ইনচার্জ রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন ও বেরোবির সাবেক ক্যাম্প ইনচার্জ বিভূতি ভূষণ রায় ওরফে মাধব।
১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত সাতজন হলো- বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাবেক ভিসি ড. হাসিবুর রশিদ ওরফে বাচ্চু, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক পুলিশ কমিশনার মনিরুজ্জামান ওরফে বেল্টু, বেরোবির গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান, লোকপ্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডল ওরফে আসাদ, সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল, সহকারী রেজিস্ট্রার হাফিজুর রহমান ওরফে তুফান, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বেরোবি শাখার সভাপতি পোমেল বড়ুয়া।
অন্য দিকে সাতজনের পাঁচ বছরের সাজা হয়েছে। তারা হলেন- আরপিএমপির সাবেক উপপুলিশ কমিশনার আবু মারুফ হোসেন ওরফে টিটু, সাবেক অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার শাহ নূর আলম পাটোয়ারী ওরফে সুমন, বেরোবির সাবেক প্রক্টর শরীফুল ইসলাম, ছাত্রলীগের রংপুর শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ ওরফে দিশা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদুল হাসান ওরফে মাসুদ, বেরোবির অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মাহাবুবার রহমান ওরফে বাবু, রংপুর স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি ডা: সারোয়াত হোসেন ওরফে চন্দন।
তিন বছরের সাজাপ্রাপ্তরা হলেন, বেরোবির সেকশন অফিসার মনিরুজ্জামান পলাশ, বেরোবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহাফুজুর রহমান শামীম, সহসভাপতি ফজলে রাব্বী ওরফে গ্লোরিয়াস ফজলে রাব্বী, সহসভাপতি আখতার হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক সেজান আহম্মেদ ওরফে আরিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক ধনঞ্জয় কুমার ওরফে টগর, দফতর সম্পাদক বাবুল হোসেন, বেরোবির এমএলএসএস মোহাম্মদ নুরুন্নবী মণ্ডল।
এ ছাড়া এমএলএসএস এ কে এম আমির হোসেন ওরফে আমু ও সিকিউরিটি গার্ড নূর আলম মিয়ার দুই বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেয়া হয়। রায়ে মামলার ২৯নং আসামি প্রক্টর অফিসের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজের হাজতবাস কালীন সময়কে কারাবাস ধরার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং সাজার মেয়াদ পূর্ণ ধরে তাকে ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
আবু সাঈদ হত্যা মামলার ৩০ আসামির মধ্যে ছয়জন গ্রেফতার আছেন। তারা হলেন- এএসআই আমির হোসেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়, ছাত্রলীগ নেতা ইমরান চৌধুরী, রাফিউল হাসান রাসেল ও আনোয়ার পারভেজ। তাদের সবাইকে গতকাল ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। বাকি আসামিরা পলাতক আছেন।
মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাসহ স্যা দিয়েছেন ২৫ জন। তারকা সাী হিসেবে জবানবন্দী দিয়েছেন জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ও বর্তমান সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। তদন্ত কর্মকর্তা রুহুল আমিনের সা্েয উঠে এসেছে এ মামলার ৩০ আসামির আলাদা আলাদা দায়। তার জবানবন্দীতে নিজের তদন্তে পাওয়া ৩০ আসামির সবার ব্যক্তিগত দায় ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেন তিনি।
চিফ প্রসিকিউটরের প্রতিক্রিয়া
রায় ঘোষণার পর ব্রিফিংয়ে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমি প্রথমেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাই আমাদের এনটিভির সেই সাংবাদিক মঈনুল হককে। তার কাছে আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাই। তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তার ক্যামেরাম্যানসহ এই ভিডিও ধারণ করার কারণেই এই নির্মম হত্যাকাণ্ডটি সারা দুনিয়ার মানুষ, সারা পৃথিবী দেখতে পেয়েছিল। আমি সব সাংবাদিক বন্ধুদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাই এই জুলাই বিপ্লবের সময় আপনাদের জীবনবাজি রেখে বিভিন্ন গণমাধ্যম আপনারা যেভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আপনারা বিভিন্ন ফুটেজ ধারণ করেছেন এবং সেই ফুটেজগুলো আমাদেরকে দিয়ে যেভাবে সহযোগিতা করেছেন।
রায় নিয়ে প্রসিকিউশন সন্তুষ্ট কি না এমন প্রশ্নের জবাবে আমিনুল বলেন, ‘ওখানে আসলে ধরেন দুজনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে, তিনজনের যাবজ্জীবন হয়েছে। আর আমাদের যে ধরনের চার্জ ছিল তাদের ভূমিকা অনুযায়ী সেই সাজাগুলো হয়েছে বলে মনে হয়। তারপরও আমরা পূর্ণাঙ্গ জাজমেন্ট পাওয়ার পরে সেটা পর্যালোচনা করে যদি আমাদের কাছে মনে হয় যে, যেসব চার্জ থেকে তাদেরকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ থাকবে। সেগুলো পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি পাওয়া সাপেে আমরা সিদ্ধান্ত নেবো।
তিনি বলেন, আমরা সন্তুষ্ট বলতে আমরা তো ৩০ জনকে আসামি করেছিলাম। ৩০ জনকেই দণ্ডিত করা হয়েছে। কেউ কিন্তু এ মামলায় খালাস পায়নি। কোয়ান্টাম অব সেন্টেন্স হয়তো কম, কোনোটা বেশি মনে হতে পারে, সেটি বিচার্য বিষয় এবং সেখানে আমাদের ট্রাইব্যুনালের মাননীয় বিচারপতিগণ তারা স্যা প্রমাণের ভিত্তিতে হয়তো সেই সেন্টেন্সটা দিয়েছেন। আমরা যদি কোনো সেন্টেন্স মনে করি যে যেসব কাউন্ট থেকে তাদেরকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে, সেই জায়গাতে আমরা যদি মনে করি যে সেখানেও শাস্তি হতে পারত, সেটা আমরা পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পরে সিদ্ধান্ত নেবো আপিল করব কি না।
এক প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল বলেন, এখানে সুপিরিয়র কমান্ড রেসপন্সিবিলিটির জায়গা থেকে আগেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল, পুলিশের আইজিপি তাদের কিন্তু আরেকটি মামলায় শাস্তি হয়েছে। এই কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি কিন্তু সারা বাংলাদেশের সব েেত্রই কাজ করেছে। সেকেন্ডলি হচ্ছে, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ঘটনাটা ঘটেছে, সেখানে যারা সুপিরিয়র অফিসার ছিলেন তাদেরকেও কিন্তু এই মামলায় দণ্ডিত করা হয়েছে। অতএব, আমরা কোনোটাই, কোনো চার্জই আমরা প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছি বলে মনে করি না।
ব্রিফিংয়ে উপস্থিত আবু সাঈদের ভাই আবু হোসেনের কাছে জানতে চাওয়া হয়, রায় নিয়ে তারা সন্তুষ্ট কি না। জবাবে আবু হোসেন বলেন, ‘আমাদের অসন্তুষ্টির জায়গা হচ্ছে পুলিশের যারা গুলি করল, তারা একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে করেছে। যারা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিল, তাদের কারো ফাঁসি হয়নি। এ েেত্র আমাদের অসন্তুষ্টি আছে। আমরা অবশ্যই আপিল করব এটার জন্য। মামলার বাদি, নিহতের বড় ভাই রমজান আলী বলেন, ‘আমরা মনে করি এবং দেশের সব মানুষই মনে করে যে আজকে আমরা যে বিচার পেয়েছি, তাতে মোটামুটি আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু পুলিশের যারা রংপুরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, তাদের সাজা কম হয়েছে- এটা আমাদের মনে হয়। এবং ছাত্রলীগ সভাপতি যে পোমেল বড়ুয়া, তার ফাঁসি হওয়া দরকার ছিল। আমাদের পরিবারের প থেকে তার ফাঁসির দাবি করছি। আক্রমণাত্মক আকারে সে আবু সাঈদকে অনেক মারধর করেছে এবং অনেক ধমক দিছে এবং পিটাইছে। আসলেই তার বিচারটা আমাদের সঠিক মনে হলো না। আমাদের পরিবারের প থেকে পোমেল বড়ুয়ার বিচারে অসন্তোষ প্রকাশ করছি।’
আসামিপরে আইনজীবীর প্রতিক্রিয়া
ট্রাইব্যুনালের ঘোষিত রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তিন আসামির পরে আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু। মামলার গুরুত্বপূর্ণ নানা প্রশ্নের উত্তর অজানা রয়ে গেছে উল্লেখ করে আপিলে নতুনভাবে তুলে ধরা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। আসামি আনোয়ার পারভেজ, এএসআই আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়ের পে লড়েছেন আইনজীবী দুলু। রায়ের সংপ্তি অংশ অনুযায়ী আনোয়ার পারভেজ একটি অভিযোগে হাজতবাসকালীন দণ্ড পেলেও বাকি অভিযোগ থেকে খালাস পেয়েছেন। আমির হোসেন ও সুজন চন্দ্র পাঁচটি অভিযোগের মধ্যে চারটি থেকে খালাস পেলেও একটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। দুলু বলেন, আবু সাঈদের জব্দকৃত গেঞ্জিতে গুলির কোনো ছিদ্র পাওয়া যায়নি বলে আমরা যুক্তিতর্কে তুলে ধরেছিলাম। এ ছাড়া গুলিবিদ্ধ হওয়ার স্বাভাবিক কোনো চিহ্ন ল্য করা যায়নি। লাশের এক্স-রে বা রেডিওলজিক্যাল পরীা না করায় গুলির অস্তিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। একজন মানুষ গুলিতে নিহত হলে শরীরে সুস্পষ্ট প্রভাব থাকার কথা। কিন্তু এখানে সেই ধরনের আলামত অনুপস্থিত।
এই আইনজীবী বলেন, মামলায় আমরা লিখিত ও মৌখিক যুক্তিতর্কে যেসব ভিত্তিতে আসামিদের খালাস চেয়েছিলাম সেসব বিষয় পরিষ্কার হয়নি। কারণ আজ ‘সাবস্ট্যান্স অব ফাইন্ডিং’ এবং ‘অপারেটিভ পার্ট অব দ্য জাজমেন্ট’ ঘোষণা করেছেন ট্রাইব্যুনাল। অর্থাৎ রায়ের ডিগ্রি ও শাস্তির অংশ শুনেছি আমরা। তিনি বলেন, পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি সংগ্রহের জন্য এরই মধ্যে আবেদন করা হয়েছে। রায় হাতে পাওয়ার পর বিস্তারিত বিশ্লেষণ করে আপিল বিভাগে আপিল করা হবে। আশা করছি আপিলে ন্যায়বিচার পাবো।
আসামিদের হট্টগোল, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান
রায় ঘোষণার পর ট্রাইব্যুনালে হট্টগোল শুরু করেন সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা। ট্রাইব্যুনাল থেকে বের হওয়ার সময় তারা দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের সাথে ধাক্কাধাক্কি করেন। এ সময় সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে বলেন, ‘আমাদের ফাঁসানো হয়েছে, আমরা নির্দোষ।’ মৃত্যুদণ্ড পাওয়া এএসআই আমির হোসেন ট্রাইব্যুনাল থেকে বের হওয়ার সময় বলেন, ‘আমি পুলিশের চাকরি করি, হুকুমের গোলাম। আমাকে কেন মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। আমার সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে। আমি এ রায় মানি না।’
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিার্থী আবু সাঈদ গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। তাকে হত্যার ভিডিও সারা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি করে। ভিডিওতে দেখা যায়, আবু সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন আর পুলিশ তার বুকে একের পর এক গুলি করছে। এ হত্যাকাণ্ড আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং সারা দেশে ােভ ছড়িয়ে পড়ে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় গত বছরের ২৪ জুন ৩০ জনকে আসামি করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। পরে ৬ আগস্ট আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। ২৭ আগস্ট সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের মাধ্যমে এই মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। পরদিন আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন এ মামলার প্রথম সাী হিসেবে জবানবন্দী দেন। চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি এ মামলার স্যাগ্রহণ শেষ হয়। যুক্তিতর্ক শেষ হয় গত ২৭ জানুয়ারি।
রায়ে অসন্তোষ মা-বাবা, সাী ও সমন্বয়কদের
রংপুর ব্যুরো জানান, শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তার বাবা-মা, সহপাঠী ও সহযোদ্ধারা। আইনজীবী এবং রাষ্ট্রপরে সাথে আলাপ করে আপিল করার কথাও জানিয়েছেন তারা।
রংপুরের পীরগঞ্জের বাবুনপুর গ্রাম। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই রায়ের জন্য উৎকণ্ঠা নিয়ে অপো ছিল জুলাই বিপ্লবের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের বাবা-মা এবং পরিবারের। দুপুরে যখন রায় ঘোষণা করা হয় তখন অসন্তুষ্ট চিত্তে আবু সাঈদের কবরের পাশে আসেন মা মনোয়ারা বেগম এবং বাবা মকবুল হোসেন। তাদের সাথে ছিলেন হত্যা মামলার সাী এবং চাচাতো ভাই রুহুল আমিন। কিছুণ কবরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন তারা, পরে কথা বলেন সাংবাদিকদের সাথে।
ঘোষিত রায়ে তীব্র অসন্তোষ তাদের। মা মনোয়ারা বেগম কোনোভাবেই মানতে পারছেন না এই রায়। তিনি জানান, ‘আমার ছইলের জীবন দিয়া তো কিছুই হইল না। এই বিচারে শান্তি হয় নাই। মোরও শান্তি হইল না। হামার ছইলের আত্মাও শান্তি পাবার নয়। দুনিয়াত সঠিক বিচার নাই।’ মনোয়ারা বেগম আরো বলেন, ‘বিচার সঠিক হয় নাই আশা করছি প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়া এই বিচার সঠিক করবে। দুইটা আসামীর ফাঁসি দিছে। আরগুলাক ফাঁসি দেয় নাই। ছাত্রলীগের পোমেল বড়ুয়া আমার ছেলেকে খুব নির্যাতন করছে। কিন্তু তাকে মাত্র ১০ বছর কারাদণ্ড দিছে- এটাতে আমি খুবই অসন্তুষ্ট।’
মনোয়ারা বেগম প্রতিক্রিয়ায় আরো বলেন, ‘এলাও অনেকগুলো আসামিক ধরে নাই। আবু সাঈদ হত্যার সাথে জড়িত মূল আসামি সেগুলো পালাই গেছে। এখন সরকার হিসেবে তারেক জিয়ার কাছে সঠিক বিচারটা চাওছি। আরো বড় বড় নেতা, শিক কর্মকর্তা কর্মচারী, পুলিশের বড় বড় অফিসার, শেখ হাসিনা ভারতে পালায় আছি এবং আরো যারা ‘আমার ছইল হত্যা করবার হুকুম দেছে তাকেও ধরবার কওছি। হুকুমদাতার ঘরক ধরা হয় নাই। অনেকে বাইরে আছে ফির শাস্তি কম দেছে, পাঁচ বছর ১০ বছর এতে হামরা খুশি নাই। হামাক যেন আপিল করতে দেন।’
আর বাবা মকবুল হোসেনের কণ্ঠেও ােভের বারুদ। বললেন এই রায় কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। দেশের কোনো মানুষই এই রায় মেনে নেবে না। তিনি জানান, ‘দুইজনকে ফাঁসি দিয়েছে, তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে। এতে আমি সন্তুষ্ট নই।’ মকবুল হোসেন বলেন, “আরো লোকের ফাঁসি হওয়া উচিত ছিল। তবে ১ নম্বরে হলো পোমেল বড়ুয়া। উনি কিন্তু সাংঘাতিক দোষী। ছেলেকে বিনা দোষে অপদস্ত করেছে। গলা টিপে ধরেছিল। ছাত্রলীগের লিডার আমার ছেলের গাল বুকে থাপড়াইছে। আমার ছেলে রোকেয়া ভার্সিটির সমন্বয়ক হিসেবে বক্তব্য দিয়েছিল। বলেছিল আমি কোনো সরকারবিরোধী আন্দোলনে বক্তব্য দিচ্ছি না। আমি অধিকার আদায়ের জন্য বক্তব্য দিচ্ছি। যার কারণে এসে গলা টিপে ধরেছিল এই পোমেল বড়ুয়া। তার ফাঁসির রায় হলো না। আর মাত্র দুই জনের ফাঁসি এটায় সন্তুষ্ট নই আমরা।’ মকবুল হোসেন আরো বলেন, ‘যারা অপরাধী তারাই পালায় গেছে। এই যে পালাল আসাদ মণ্ডল। যদিও নাম বলা ঠিক না। আমার ছেলেক মারার জন্য উনি জড়িত ছিল। সেই জন্য বললাম। এইরকম যারা অপরাধী তারা অনেকে এড়িয়ে গেছে। পুলিশের বড় কর্মকর্তা তাদেরকে কোনো সাজা দেয়া হয়নি। শুধু কনস্টেবল এর ওপর দিয়ে গেল।’ তিনি বলেন, ‘যাদের আদেশে আমার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে তারাই বাঁচি গেল। বড় বড় অপরাধী বাঁচি গেছে। আইনজীবী এবং ছেলেদের সাথে পরামর্শ করে রাষ্ট্রপক্ষের সাথে পরামর্শ করে কি করা যাবে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। ’
শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার সাী এবং তার চাচাতো ভাই রুহুল আমিন জানান, ‘উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারাই গুলি করা এবং লাঠিচার্জ করার আদেশটা করেন। সে েেত্র যারা ইন্ধনদাতা যারা আদেশদাতা তাদেরকে ফাঁসি না দিয়ে দুইজন কনস্টেবলের উপর দিয়ে এই রায় ঘোষণা করল। এটা আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। অবশ্যই পরিবার, আইনজীবী এবং রাষ্ট্রের সাহায্য নিয়ে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে।’ রুহুল আমিন আরো বলেন, যাদেরকে যাবজ্জীবন দেয়া হয়েছে, তাদেরকে ফাঁসির রায় দেয়া উচিত ছিল। যারা ইন্ধনদাতা ছিল এই হত্যাকাণ্ডের সাথে, তাদেরকে এত কম শাস্তি দিয়ে রায় দিয়েছে এটা খুবই দুঃখজনক। এই ধরনের একটা মামলার রায় যদি শুধু দুইজনের উপর দিয়ে পার পায় তাহলে এটা খুবই দুঃখজনক। আমরা আশা করছি এই রায়ের যদি আপিল করে সাজা বাড়ানো যায় তাহলে অন্তত পরিবার থেকে সবাই খুশি থাকবে। ’
এ দিকে রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আবু সাঈদের সাথে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যোগ দেয়া সমন্বয়করা। আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিার্থী শামসুর রহমান সুমন বলেন, আমরা হতাশ হয়েছি। দীর্ঘ দুই বছর পর এই রায় দেয়া হলো। আমরা চেয়েছিলাম অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এই রায় দেয়া হোক কিন্তু সেটা হয়নি। বরং যে রায় দেয়া হয়েছে, তাতে শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে। মনে হচ্ছে যেন অভিযুক্তদেরকে দায়মুক্তি দেয়া হচ্ছে। এই রায় আমরা প্রত্যাখ্যান করছি। অবিলম্বে রায় রিভিউয়ের ব্যবস্থা করবার জন্য রাষ্ট্রপকে আহ্বান জানাচ্ছি। জাতীয় যুব শক্তির কেন্দ্রীয় সংগঠক মাসুম বিল্লাহ জানান, এই রায়ের মাধ্যমে প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হয়নি। এই রায়টির দিকেই তাকিয়ে ছিল দেশ এবং বিদেশের সর্বস্তরের মানুষ। কিন্তু খুবই হালকাভাবে দেয়া হলো এই রায়। এর মাধ্যমে পরবর্তী মামলাগুলোর ওপর এই রায়ের প্রভাব পড়বে।
তবে অসন্তুষ্ট হলেও রায় হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ডক্টর এম শওকত আলী। তিনি বলেন, সারা বিশ্ব দেখেছে কিভাবে আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ড জুলাই বিপ্লবের একটি অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট। কিন্তু যে রায় প্রদান করা হয়েছে, তাতে ন্যায়বিচার বিঘিœত হয়েছে বলে আমরা মনে করি। তবে দীর্ঘ দিন পর হলেও রায়টি যে দেয়া হয়েছে, তাতে আমি সন্তুষ্ট। কারণ এই রায় দেয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই আমি বিভিন্নভাবে কথা বলেছি। পরিবার, রাষ্ট্রপ ও সমন্বয়করা মিলে রায়ের ব্যাপারে আপিল করা হবে কি না সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।



