বিশ^সাহিত্য : নতুন জানালা

আহমদ মতিউর রহমান : শিরিন সরুরের বইয়ে সত্য উচ্চারণ

Printed Edition
আহমদ মতিউর রহমান : শিরিন সরুরের বইয়ে সত্য উচ্চারণ
আহমদ মতিউর রহমান : শিরিন সরুরের বইয়ে সত্য উচ্চারণ

সার্কভুক্ত আমাদের প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কায় সাহিত্য চর্চা আন্তর্জাতিক পরিসরে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিকভাবে সর্বাধিক প্রশংসিত শ্রীলঙ্কান লেখকদের মধ্যে রয়েছেন মাইকেল ওন্দাৎজে, মিশেল ডি ক্রেটসার, রমেশ গুনেসেকেরা, শ্যাম সেলভাদুরাই এবং শেহান করুণাতিলকা। তারা সবাই কমনওয়েলথ রাইটার্স প্রাইজের পাশাপাশি বুকার প্রাইজ, গভর্নর জেনারেল’স অ্যাওয়ার্ড এবং গ্রেশিয়েন প্রাইজের মতো অন্যান্য সম্মাননাও লাভ করেছেন। এর মধ্যে করুণাতিলকা ২০২২ সালে বুকার পুরস্কার লাভ করেন। তবে এই তালিকায় মুসলমানদের নাম তেমন একটা পাওয়া যায় না। এর মধ্যে শিরিন আব্দুল সরুর কিছু কাজ করেছেন। সাহিত্য ও সংস্কৃতি পাশাপাশি হাত ধরে চলে। সংস্কৃতি অর্থ চিৎপ্রকর্ষ বা মানবীয় বৈশিষ্ট্যের উৎকর্ষ সাধন। অধিকারের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। শ্রীলঙ্কায় মানবীয় উৎকর্ষ সাধনে যারা কাজ করছেন, অধিকার আদায়ে কাজ করেছেন তাদের মধ্যে শিরিন আবদুল সরুর নামটি উল্লেখযোগ্য। ‘মুসলিমস ইন পোস্ট ওয়ার শ্রীলঙ্কা’ (২০২১) শিরিন সরুরের সম্পাদিত একটি গ্রন্থ। নন ফিকশন এই বইটিতে তিনি সত্য তুলে ধরেছেন এবং এ কারণে প্রশংসিত হয়েছেন। তিনি ২০১৭ সালে মানবাধিকার ও আইনের শাসনের জন্য ফ্রাঙ্কো-জার্মান পুরস্কার লাভ করেন। একই বছরে তিনি অশোকা ফেলো হন। তার সম্পাদিত আরেকটি বই হচ্ছে ‘আওয়ার স্ট্রাগলস, আওয়ার স্টোরিস’ (২০১৪)।

২০১৯ সালে শ্রীলঙ্কায় ইস্টার বোমা হামলা এবং পরবর্তী মুসলিমবিরোধী দাঙ্গার পর সরুর শ্রীলঙ্কায় ইসলামোফোবিয়া এবং মুসলিমদের লক্ষ্য করে সহিংসতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। তিনি গোটাবায়া রাজাপাকসের সরকারকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য এবং ভুল তথ্য প্রচারের জন্য অভিযুক্ত করেছেন। তিনি বোমা হামলার পর আইন এবং হয়রানির মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরা মুসলিম মহিলাদের লক্ষ্যবস্তু করার সরকারি পদক্ষেপেরও সমালোচনা করেছেন। বিশেষ করে নারী মুসলিম আইনজীবী এবং বিচারপতিদের আবায়া পরা থেকে বিরত রাখতে ২০২৩ সালে শ্রীলঙ্কার সুপ্রিম কোর্টের পোশাক বিধি সংশোধন করা হয়েছিল।

শিরিন সরুর ১৯৬৯ সালে শ্রীলঙ্কার (তৎকালীন সিলন) উত্তর প্রদেশের মান্নারে একটি তামিলভাষী মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বেড়ে ওঠার সময় শিরিন একটি বহু-ধর্মীয় পাড়ায় বাস করতেন যেখানে তামিলভাষী হিন্দু, মুসলিম এবং খ্রিষ্টানরা শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করত। শৈশবে তার বাবা, যিনি একজন শিক্ষা কর্মকর্তা এবং প্রাক্তন শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক ও পরে প্রিন্সিপাল ছিলেন, তাকে মুসলিম মেয়েদের জন্য বিরল স্বাধীনতা দিয়েছিলেন।

শিরিন আব্দুল সরুর এভাবে শ্রীলঙ্কান শান্তি ও নারী অধিকার কর্মী হয়ে ওঠেন। শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের সহায়তার জন্য শিরিন মান্নার নারী উন্নয়ন ফেডারেশন প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি নারী কর্ম নেটওয়ার্ক নামক সংগঠনের অধীনে একটি ঐক্যবদ্ধ শ্রীলঙ্কান নারী আন্দোলন গড়ে তোলার জন্যও কাজ করেন।

শিরিন সরুর শ্রীলঙ্কার উত্তরে বেড়ে ওঠেন এবং গৃহযুদ্ধের সহিংসতা সরাসরি প্রত্যক্ষ করেন। ১৯৯০ সালে তার পরিবারকে মান্নার-এর বাড়ি থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে একটি অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের শিবিরে স্থানান্তরিত করা হয়। তার বাবা শিবিরের বাস্তুচ্যুত মানুষদের সাহায্য করার জন্য একটি সামাজিক সংগঠন তৈরি করেন এবং সরুর তার সাথে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেন। শিরিন সরুর তার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১১ সালে ব্রেমেন শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। ২০১১ সালে শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় তার প্রচেষ্টার জন্য সরুর ইউএনডিপি থেকে এন-পিস অ্যাওয়ার্ডের প্রথম প্রাপকদের মধ্যে ছিলেন। শ্রীলঙ্কার সাংবাদিক সুলোচনা পেরিস শিরিন সরুর এবং এই সম্মাননা নিয়ে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র তৈরি করেন।