বিশেষ সংবাদদাতা
- সব ব্যাংক পর্যালোচনায় আরো খারাপ তথ্য পাওয়া যাবে
- শুধু জ্বালানি খাতেই মূলস্ফীতি এখন ১৪ শতাংশের বেশি
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সঙ্কট, ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুরতা এবং রাজস্ব আহরণে সীমাবদ্ধতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব সমস্যার সমাধানে স্বল্পমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতের স্বাস্থ্যের ধারায় কোনো উন্নতি নেই। খেলাপি ঋণ কমেনি বরং প্রকৃত সমস্যা আড়ালেই আছে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, সবগুলো ব্যাংক পর্যালোচনা করে দেখা হলে দেখা যাবে খেলাপি ঋণের আরো খারাপ চিত্র আসতে পারে। মূল্যস্ফীতি এখনো সহনীয় নয়। আর শুধু জ্বালানি খাতেই মূল্যস্ফীতি এখন ১৪ শতাংশের বেশি।
রাজধানীর ধানমন্ডিস্থ সংস্থার নিজস্ব কার্যালয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ‘বাংলাদেশ অর্থনীতি : উত্তরণকালীন সময়ে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন উপস্থাপনার মাধ্যমে এই মূল্যায়ন তুলে ধরেন। বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন সংস্থাটির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান, জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশহিয়াত প্রিয়তি, এ এস এম শামীম আলম শিবলী, তামীম আহমেদ।
কোনো উন্নতি নেই ব্যাংকিং খাতে
উপস্থাপনায় ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনীতির কিছু সূচকে স্বস্তির আভাস মিললেও তা স্থায়ী নয়। বরং কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো এখনো রয়েই গেছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩৫.৭ শতাংশ। যা ২০২৬ সালের মার্চে কমে ৩২.২৬ শতাংশে নেমে আসে। তবে এই হ্রাসকে প্রকৃত অর্থে সম্পদ মানের উন্নতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন এবং রাইট-অফের মতো ব্যবস্থা ব্যাংকগুলোর প্রকৃত অবস্থা আড়াল করেছে। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের শেষ সময়ে এসে আর্থিক খাত, সামাজিক খাত এবং উৎপাদনশীল খাত নানা ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে। এসব চাপ নতুন নয়। বরং কয়েক বছর ধরেই তা দৃশ্যমান। মূল্যস্ফীতি, সরকারি অর্থায়ন, ব্যাংকিং খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে সঙ্কট ও চাপ বিদ্যমান, তা থেকে এখনো পুরোপুরি উত্তরণ সম্ভব হয়নি।
বেসরকারি খাতে ঋণ চাহিদা দুর্বল
ড. ফাহমিদা বলেন, ঋণ-ক্ষতি সংরক্ষণ (লোন লস প্রভিশনিং) ঘাটতির কিছু উন্নতি দেখা গেলেও তা সম্পদের গুণগত মান উন্নত হওয়ার ইঙ্গিত দেয় না। বরং রাইট-অফ ও পুনর্গঠনের কারণে সূচকগুলো কিছুটা ভালো দেখাচ্ছে। ব্যাংক খাতে অন্তর্নিহিত ঋণঝুঁকি এবং খেলাপি ঋণসংক্রান্ত দুর্বলতা এখনো উচ্চপর্যায়ে রয়েছে। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে তারল্য পরিস্থিতিরও একটি ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালের মে মাসে মোট তরল সম্পদের বিপরীতে অতিরিক্ত তারল্যের হার ছিল ৪৩ শতাংশ। যা ২০২৬ সালের মার্চে বেড়ে ৫৫ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে অ্যাডভান্স-ডিপোজিট রেশিও (এডিআর) ০.৮৯ থেকে কমে ০.৮৪ হয়েছে। এর অর্থ ব্যাংকগুলোর হাতে অর্থ থাকলেও ঋণ বিতরণে সতর্কতা বেড়েছে এবং বেসরকারি খাতে ঋণ চাহিদা দুর্বল রয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের জন্য সংস্কার দরকার
ব্যাংক খাত সংস্কারের বিষয়ে সিপিডি বলছে, ১৭টি ব্যাংকের সম্পদমান পর্যালোচনা (অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ) শুরু হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি ব্যাংকের পর্যালোচনায় প্রকাশিত হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি খেলাপি ঋণের তথ্য পাওয়া গেছে। এতে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থার সাথে প্রকাশিত তথ্যের বড় ধরনের পার্থক্যের ইঙ্গিত মিলেছে। এ অবস্থায় সিপিডি কঠোর ঋণ শ্রেণিকরণ ও প্রভিশনিং নীতি বাস্তবায়ন, নিয়ন্ত্রক শিথিলতা ধীরে ধীরে প্রত্যাহার, পুনঃতফসিলের সুযোগ সীমিত করা এবং পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠিত ঋণসহ প্রকৃত খেলাপি ঋণের তথ্য প্রকাশের সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও তদারকি সক্ষমতা আরো জোরদার করতে হবে।
মূল্যস্ফীতির চাপ, ক্রয়ক্ষমতা কমছে
ফাহমিদা বলেন, মূল্যস্ফীতির চাপ এখনো কমেনি। বরং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে দীর্ঘমেয়াদি ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সঙ্কটগুলো সরাসরি দেশের বাজারে প্রভাব ফেলছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ৯.০৪ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮.৩৯ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯.৫৭ শতাংশ। জ্বালানি, পরিবহন ও সেবাখাতের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত রয়েছে। মজুরি বৃদ্ধির হার ৮.১৬ শতাংশ হলেও মূল্যস্ফীতির হার তার চেয়ে বেশি থাকায় মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমছে।
রাজস্ব প্রবৃদ্ধি অর্জন অবাস্তব
রাজস্ব সম্পর্কে সিপিডি বলছে, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্য অপারেশনালি অবাস্তব হয়ে পড়েছে। জুলাই-মার্চ সময়ে রাজস্ব আদায় বেড়েছে মাত্র ৬.৯ শতাংশ। এখন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শেষ প্রান্তিকে ৮৪.৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। যা বাস্তবে অর্জন করা কঠিন। এনবিআরের কর আদায়ে কিছু উন্নতি হলেও জুলাই-এপ্রিল সময়ে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা। একই সাথে আইএমএফের রাজস্ব সংগ্রহ সংক্রান্ত শর্ত পূরণ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। আইএমএফের শর্ত ছিল, প্রতি বছর রাজস্ব আদায় ০.৫ শতাংশ হারে বাড়ানো। সেটা হচ্ছে না।
বাড়ছে না প্রত্যাশিত বিনিয়োগ
সিপিডি জানায়, বেসরকারি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। রাজনৈতিক ও নীতিগত অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদহার এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিনিয়োগ স্থবির থাকলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। সরকারের ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নেয়ার পরিমাণ ২০ শতাংশ বেড়েছে। যা বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধিতে প্রভাব পড়বেই
ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জ্বালানি মূল্য বাড়ানোর বিষয়টি আমি দু’ভাবে দেখতে চাই। প্রত্যক্ষভাবে যারা ভোগ করেন তাদের জন্য এটা অবশ্যই বাড়তি বোঝা হবে। আর অপ্রত্যক্ষ যারা, বিশেষ করে উৎপাদনকারী, রফতানিকারক, আমদানি প্রতিস্থাপক শিল্পের উদ্যোক্তার উপর যে প্রভাব পড়বে সরকার অন্য পদক্ষেপ দিয়ে এটা পুষিয়ে দিতে পারে। তিনি বলেন, জ্বালানি মূল্য বেড়েছে, প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমে যেতে পারে, এমন একটা আশঙ্কা থাকতে পারে। তবে সরকার যদি পুষিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে কোনো পদক্ষেপ না রাখে তাহলে এই আশঙ্কাটা থাকে। সরকারের সেই সুযোগ আছে।
সিপিডির গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশিয়াত প্রিয়তি বলেন, সম্প্রতি বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।



