অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
পুঁজিবাজারের সুদিন ফিরতে শুরু করেছে। একটি গতিশীল পুঁজিবাজারের প্রত্যাশায় বছরের পর বছর অপেক্ষা করা বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হতে চলেছে। গতকাল দেশের পুঁজিবাজারগুলো উন্নতির ধারাবাহিকতায় টানা নবম দিন পার করল। গত ১৯ মে থেকে ঘুরে দাঁড়ানো বাজারগুলো গতকাল সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসেও সূচকের উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। উন্নতি ঘটেছে দেশের প্রধান পুঁজিবাজারটির লেনদেনেও। লেনদেনের শুরুতে বড় ধরনের বিক্রয়চাপ সৃষ্টি হলেও পরবর্তীতে তা সামলে নেয় বাজারগুলো।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৩৩ দশমিক ৩৪ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। ৫ হাজার ৪৪১ দশমিক ৬৬ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি বৃহস্পতিবার দিনশেষে পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৪৭৫ দশমিক ০০ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ১১ দশমিক ১৯ ও ৯ দশমিক ৯০ পয়েন্ট। দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই এদিন ৮২ দশমিক ৩৪ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। ১৫ হাজার ১৮৫ দশমিক ৬৭ পয়েন্ট থেকে যাত্রা করা সূচকটি গতকাল লেনদেন শেষে স্থির হয় ৫ হাজার ২৬৮ দশমিক ০৩ পয়েন্টে। একই সময় সিএসইর দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ৭৭ দশমিক ৯০ ও ৪৯ দশমিক ৩০ পয়েন্ট।
সূচকের পাশাপাশি গতকাল ডিএসইর লেনদেনেও বড় ধরনের উন্নতি ঘটে। প্রধান পুঁজিবাজারটির গতকাল ১ হাজার ৩৫১ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা পুঁজিবাজারটির বিগত আট মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং আগের দিন অপেক্ষা ৭২ কোটি টাকা বেশি। গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বরের পর ডিএসইর লেনদেন আর এ পর্যায়ে পৌঁছেনি। ওই দিন ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা লেনদেন নিষ্পত্তি করেছিল ডিএসই। আগের দিন বুধবার ডিএসইর লেনদেন ছিল ১ হাজার ২৭৯ কোটি টাকা। তবে গতকাল লেনদেন কমেছে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে। গতকাল সিএসই ২৭ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে, যা আগের দিনের চেয়ে ৪ কোটি টাকা কম। বুধবার ৩১ কোটি টাকার লেনদেন ছিল বাজারটির।
এ দিকে বিগত আটদিনের ধারাবাহিক উন্নতির পর গতকাল সকালে লেনদেনের শুরুতেই বড় ধরনের বিক্রয়চাপের মুখে পড়ে দেশের দুই পুঁজিবাজার। ঢাকায় প্রধান সূচকটি লেনদেন শুরুর পনের মিনিটের মাথায় ২০ পয়েন্টের মতো কমে যায়। তবে ইতোমধ্যে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পুনর্গঠনের খবর বাজারে চলে আসলে দ্রুতই বিক্রয়চাপ সামলে নেয় বাজারগুলো। দিনের বাকি সময় বাজার নতুন করে গতি ফিরে পায়। এতে দিনশেষে দুই পুঁজিবাজারের সবগুলো সূচকেরই উন্নতি ঘটে।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, আট দিন টানা ঊর্ধ্বমুখী থাকার পর গতকাল সপ্তাহের শেষদিন বাজার সংশোধনের পথে ছিল। সে হিসাবে শুরুতেই এ বিক্রয়চাপ তৈরি হয়। কিন্তু বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যানসহ নতুন কমিশন নিয়োগের খবরে বিনিয়োগকারীদের মাঝে নতুন করে উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়, যা বিক্রয়চাপ সামলে দিনশেষে সূচককে ঊর্ধ্বমুখী করতে ভূমিকা রাখে। তাদের মতে, বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘদিন ধরে কমিশন পুনর্গঠনের জন্য অপেক্ষায় ছিলেন। বিভিন্ন সময় তারা এ দাবি নিয়ে রাস্তায়ও নেমেছেন। এখন তাদের দীর্ঘদিনের এ দাবি পূরণ হওয়ায় বিনিয়োগে নতুন করে উৎসাহ পাচ্ছেন তারা। গতকালের বাজার আচরণ তারই প্রতিফলন।
এ কথার বাস্তবতার দেখা মিলল বিভিন্ন ব্রোকার হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের ট্রেডিং ফোরগুলোতে বিনিয়োগকারীদের সাথে আলাপ করে। কমিশন পুনর্গঠনের খবরে তারা খুবই উল্লসিত। নয়া দিগন্তকে তারা বলেন, আগের কমিশন বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ ছিল। তারা নানা ধরনের সংস্কারের কথা বললেও বাজারে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণে ব্যর্থ ছিল। বিশেষ করে দুর্বল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের সুরক্ষা দিতে পারেনি বিগত কমিশন। হাজার হাজার বিনিয়োগকারী এ কারণে তাদের পুঁজির বেশির ভাগ হারিয়েছে। অথচ দুই বছরের বেশি সময় একই কমিশন তাদের দায়িত্ব পালন করে। এসব বিষয় বিনিয়োগকারীদের কমিশনের প্রতি অনাস্থা তৈরি করে যার নেতিবাচক প্রভাব ছিল বাজারে।
গতকাল ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল ব্যাংকিং খাতের এনসিসি ব্যাংক। ৩৩ কোটি ৯৮ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ২ কোটি ১৯ লাখ ৮২ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ৩৩ কোটি ৯১ লাখ টাকায় ১ কোটি ২ লাখ ৮০ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে তথ্য প্রযুক্তি খাতের কোম্পানি জেনেক্স ইনফোসিস ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে। ডিএসইর লেনদেনে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস, মনুস্পুল পেপার, মুন্নু সিরামিকস, কাসেম ইন্ডাস্ট্রিজ, লাভেলো আইসক্রিম, যমুনা ব্যাংক, সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স ও মীর আকতার হোসাইন।
গতকাল ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ কোম্পানি ছিল জেনেক্স ইনফোসিস লিমিটেড। কোম্পানিটির ১০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে গতকাল। ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল সাধারণ বীমা কোম্পানি রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স। মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে সোনারগাঁও টেক্সটাইলস, আনোয়ার গ্যালভেনাইজিং, প্রিমিয়ার সিমেন্ট, নর্দার্ন ইন্স্যুরেন্স, সিলকো ফার্মা, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স, সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স ও ত্বাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্স।
একই সময় ডিএসইর দরপতনের শীর্ষে ছিল যমুনা ব্যাংক। বিগত অর্থবছরের লভ্যাংশ ঘোষণার রেকর্ড পরবর্তী মূল্য সমন্বয়ে ৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ দর হারায় কোম্পানিটি। ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ দর হারিয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস। দরপতনে ডিএসইর শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে, এফএএস ফিন্যান্স, হাইডেলবার্গ সিমেন্ট, মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক, এনসিসিবি ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, বে লিজিং, এপেক্স স্পিনিং ও এপেক্স ট্যানারি।



