মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের বিচারিক কাজ শেষ

ইনুর মামলার রায় যেকোনো দিন

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়েছে। কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার অভিযোগে দায়ের করা এই মামলার রায় যেকোনো দিন ঘোষণা করতে পারেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

নিহতদের মধ্যে রয়েছেন শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ।

গতকাল বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চে প্রসিকিউশন ও আসামিপরে যুক্তিতর্ক শেষ হয়। এই ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো: মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। পরে আদালত মামলাটি রায়ের জন্য অপেমাণ (সিএভি) রাখেন। রায়ের জন্য নির্দিষ্ট কোনো তারিখ এখনো ঘোষণা করা হয়নি। গত ২ এপ্রিল আসামিপরে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হয়েছিল।

ট্রাইব্যুনালে হাসানুল হক ইনুর উপস্থিতিতে গতকাল যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ। আসামিপে ছিলেন আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী, সিফাত মাহমুদ শুভ ও আবুল হাসান।

শুনানি শেষে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘হাসানুল হক ইনু ১৪ দলীয় জোটের শরিক হিসেবে আওয়ামী লীগ সরকারের সব কর্মকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। সুপিরিয়র কমান্ড, ইন্ডিভিজুয়াল রেসপনসিবিলিটি এবং ক্রিমিনাল কন্সপিরেসি সব কিছুই আদালতে তুলে ধরা হয়েছে।’

২০২৪ এর ১৯ জুলাই ও ৪ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে ইনুর ফোনালাপ প্রমাণ হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করা হয় বলে তিনি জানান। চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘কথোপকথনের মধ্যে কারফিউ জারি, আন্দোলনকে বিভক্ত করে জঙ্গি কার্ড খেলা এবং কুষ্টিয়ায় পুলিশকে নির্দেশনা দেয়ার বিষয়গুলো ছিল। ছাত্র-জনতাকে হত্যার যে পরিকল্পনা ও হত্যাকাণ্ড হয়েছে, তা এই কথাবার্তায় সুস্পষ্ট, যা তিনি অস্বীকার করেননি।’

১৪ দলের বৈঠকে ইনুর উপস্থিতি এবং কারফিউতে তার সমর্থন ছিল দাবি করে তিনি বলেন, ‘একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে জনগণের ভাষা বুঝতে না পেরে উল্টো দমনপীড়ন বেছে নিয়েছিলেন তিনি। জনগণকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করা হয়েছে।’ ট্রাইব্যুনালে ৯ জন সাীর পাশাপাশি ফোনালাপের রেকর্ড, পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশন ফুটেজ দাখিল করে সর্বোচ্চ শাস্তি চাওয়া হয়েছে বলে জানান আমিনুল ইসলাম।

এদিকে ইনুর বিরুদ্ধে আনা আটটি অভিযোগ প্রমাণে প্রসিকিউশন ‘সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ’ হয়েছে দাবি করে ইনুর আইনজীবী সিফাত মাহমুদ বলেন, ‘জুলাই-আগস্টের হতাহতের ঘটনার সাথে হাসানুল হক ইনুর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তিনি ওই সময় কোনো সাংবিধানিক বা প্রশাসনিক পদে ছিলেন না।’ আন্দোলনকে ‘নন-ইন্টারন্যাশনাল আর্মড কনফিক্ট’ আখ্যা দিয়ে এ আইনজীবী বলেন, ‘সন্ত্রাসী ও জঙ্গি গোষ্ঠী ছাত্র আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করে রাষ্ট্রের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হয়েছিল। হাসানুল হক ইনু ছাত্র-জনতার পে ছিলেন, তবে নাশকতাকারীদের বিরুদ্ধে ছিলেন।’

ফোনালাপের বিষয় অস্বীকার না করে তিনি বলেন, এই কথোপকথনে তাকে অভিযুক্ত করার মতো কোনো উপাদান নেই, বরং এটিই তার প্রধান ডিফেন্স (আত্মপ সমর্থন)। কারণ সেখানে আন্দোলনকারীদের ঘরে ফেরার আহ্বান এবং ক্যাজুয়ালিটি বা গুলি না চালানোর কথা বলা হয়েছে। প্রসিকিউশনের বিরুদ্ধে ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তুলে সিফাত মাহমুদ বলেন, ‘পুনর্গঠিত প্রসিকিউশন টিম জুলাই-আগস্টের ঘটনাকে ব্যবহার করে বীর মুক্তিযোদ্ধা হাসানুল হক ইনুসহ স্বাধীনতার পরে শক্তিকে ঘায়েল এবং স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে মহিমান্বিত করার ষড়যন্ত্র করছে।’

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যাসহ আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগে ইনুর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে এ মামলা করে প্রসিকিউশন। অভিযোগগুলো হলো, হাসানুল হক ইনু তৎকালীন মতাসীন ১৪-দলীয় জোটের অন্যতম শরিক দল জাসদের প্রধান হিসেবে ঊর্ধ্বতন অবস্থানে থেকে ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ‘মিরর নাউ’ নামে ভারতের মুম্বাইভিত্তিক একটি গণমাধ্যমে আন্দোলন দমন এবং আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক ট্যাগ প্রদান এবং তাদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের উসকানি প্রদান করেন।

দুই. চব্বিশের ১৯ জুলাই গণভবনে শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে ও হাসানুল হক ইনুর উপস্থিতিতে ১৪ দলীয় জোটের সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় কোটা সংস্কার ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে দেশব্যাপী সেনা মোতায়েন করে নিরীহ, নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ দেয়া হয় এবং তা সরকার কার্যকর করে। এই নির্দেশ দেয়ার সাথে তৎকালীন ১৪ দলীয় জোট সরকারের অংশীদার জাসদের সভাপতি হিসেবে ইনু তার ঊর্ধ্বতন অবস্থান থেকে সরাসরি সম্পৃক্ত হয়ে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন। সেই সাথে তিনি প্ররোচনা দিয়েছেন, উসকানি দিয়েছেন ও সহায়তা করেছেন।

তিন. হাসানুল হক ইনু ওই বছরের ২০ জুলাই দুপুরে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে তার নিজ জেলা কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন করেন। আন্দোলনকারীদের ছবি দেখে তালিকা প্রণয়ন ও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।

চার. শেখ হাসিনার সাথে ইনু সার্বণিক যোগাযোগ রা করতেন। আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্র (লেথাল উইপন) ব্যবহার করে, ছত্রীসেনা নামানো, হেলিকপ্টার দিয়ে গুলি করে হত্যা, আটক ও নির্যাতনের ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা করেন এবং শেখ হাসিনাকে এমন পরামর্শ দিতেন ইনু।

পাঁচ. ওই বছরের ২৭ জুলাই ইনু নিউজ টোয়েন্টিফোর চ্যানেলে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী, জঙ্গি, সাম্প্রদায়িক ইত্যাদি ট্যাগ প্রদান করে উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান করেন। সেই সাথে কারফিউ জারি করে মারণাস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারের হত্যাকাণ্ড সংঘটনসহ নির্যাতন-নিপীড়নকে কৌশলে সমর্থন করেন।

ছয়. ২৯ জুলাই শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের সভায় ইনু উপস্থিত ছিলেন। আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক ট্যাগ প্রদান করেন তিনি। হাসানুল হক ইনু জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দেন এবং এর মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ১৪ দলীয় জোটের সশস্ত্র ক্যাডারের হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনকে বৈধতা দেয়।

সাত. চব্বিশের ৪ আগস্ট আন্দোলন দমনে কারফিউ জারি করে গুলিবর্ষণসহ শেখ হাসিনার গৃহীত পদপে অনুমোদন করেন ইনু। শেখ হাসিনার সাথে টেলিফোনে এসব পদপে বাস্তবায়নে ষড়যন্ত্র, সহায়তায় সম্পৃক্ত ছিলেন ইনু। পাশাপাশি তিনি নিজ দলের নেতাকর্মীদের নির্দেশ প্রদান করেন।

আট. চব্বিশের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা, হাসানুল হক ইনু ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফের ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা ও নির্দেশের পরিপ্রেেিত আওয়ামী লীগ, এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী ও পুলিশ নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন স্থানে গুলি চালায়। এতে সেদিন আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী (বাবু), আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, মো: উসামা, বাবলু ফরাজী ও ইউসুফ শেখ নামের ছয়জন নিহত হন।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট রাজধানীর উত্তরা থেকে ইনুকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে গত বছরের ২ নভেম্বর এ মামলায় অভিযোগ গঠন করে তার বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল।