রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি
পাহাড়, হ্রদ আর সবুজ প্রকৃতির মাঝে গড়ে ওঠা রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, একাডেমিক সম্প্রসারণ ও প্রশাসনিক গতিশীলতায় নতুন পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে। বিদায়ী ভিসি অধ্যাপক ড. মো: আতিউর রহমানের দায়িত্বকালীন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দৃশ্যমান পরিবর্তন যেমন প্রশংসা কুড়িয়েছে, তেমনি নতুন ভিসি হিসেবে অধ্যাপক ড. জয়নুল আবেদীন সিদ্দিকীর নিয়োগকে ঘিরেও তৈরি হয়েছে নতুন প্রত্যাশা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে রাবিপ্রবিকে আরো এগিয়ে নেয়ার সুযোগ এখন নতুন প্রশাসনের সামনে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে রাবিপ্রবির নতুন ভিসি নিয়োগ পেয়েছেন অধ্যাপক ড. জয়নুল আবেদীন সিদ্দিকী। তিনি ময়মনসিংহ ত্রিশালের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ এই শিক্ষাবিদকে ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে বলে সংশিষ্টরা জানিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় সচেতন মহলের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদায়ী ভিসি অধ্যাপক ড. মো: আতিউর রহমান দায়িত্ব পালনকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। নতুন একাডেমিক ভবন, প্রশাসনিক অবকাঠামো, গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণ, শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং ক্যাম্পাসের নান্দনিক উন্নয়নের মাধ্যমে রাবিপ্রবি দৃশ্যমান পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে বলে তারা উল্লেখ করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে পরিকল্পিত উন্নয়ন যুক্ত হওয়ায় রাবিপ্রবি এখন দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। কাপ্তাই হ্রদসংলগ্ন পাহাড়ি এই ক্যাম্পাসে গড়ে ওঠা নতুন স্থাপনা, সড়ক, সবুজায়ন ও সম্প্রসারিত অবকাঠামো শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অধ্যাপক ড. মো: আতিউর রহমান শক্ত মনোবল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা, বিতর্ক ও চাপের মধ্যেও তিনি উন্নয়ন কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা মনে করেন, তার সময়েই রাবিপ্রবি একটি সম্প্রসারিত ও বিকশিত বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ পেতে শুরু করে। তবে উন্নয়নের এই ধারার মাঝেই প্রশাসনিক নানা বিতর্ক, অভিযোগ ও আন্দোলনের ঘটনাও সামনে আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্র সংগঠন তার বিরুদ্ধে নিয়োগে অনিয়ম, প্রশাসনিক পক্ষপাত ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তোলে। আন্দোলনের অংশ হিসেবে ভিসির কার্যালয়ে তালা ঝুলানো ও ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটামও দেয়া হয়। যদিও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সব নিয়োগ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুসরণ করেই সম্পন্ন হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে এ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে ভিন্নমুখী প্রতিক্রিয়াও দেখা যায়। একাংশ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন, অন্য দিকে অভিযোগগুলোর স্বচ্ছ তদন্তের দাবিও ওঠে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে উন্নয়ন ও জবাবদিহিতা দুই বিষয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকের মতে, উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে প্রকল্প পরিচালক আবদুল গফুরের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
স্থানীয় বাস্তবতা, পাহাড়ি অঞ্চলের পরিবেশ ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের ক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রকল্প এগিয়ে নিতে সহায়ক হয়েছে। তারা মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে সমন্বিত নেতৃত্ব আরো ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারত। একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কার্যক্রম নিয়েও বিভিন্ন সময়ে আলোচনা সমালোচনা হয়েছে। স্থানীয় জনগণের সাথে যোগাযোগ, বিভিন্ন ইস্যুর উপস্থাপন ও তথ্য প্রচারের ক্ষেত্রে আরো সংবেদনশীল ভূমিকা প্রয়োজন ছিল বলে সংশিষ্টদের একাংশ মনে করেন। বিশেষ করে ক্যাম্পাসের জায়গার নামের বিষয় নিয়ে গণমাধ্যমে আলোচিত হওয়ার পর স্থানীয় পর্যায়ে নানা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল। তবে সব আলোচনা সমালোচনার পরও বিশ্ববিদ্যালয়ের দৃশ্যমান পরিবর্তন অস্বীকার করার সুযোগ নেই বলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তাদের ভাষ্য, রাবিপ্রবির বর্তমান সম্প্রসারিত ক্যাম্পাস, নতুন ভবন, শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বিদায়ী ভিসির দায়িত্বকালকে স্মরণীয় করে রাখবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী আবেগঘন প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, একটি উন্নয়নমুখী অধ্যায়ের সমাপ্তি হলেও সামনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে। তাদের প্রত্যাশা, নতুন ভিসি অধ্যাপক ড. জয়নুল আবেদীন সিদ্দিকী অতীতের ইতিবাচক অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন এবং স্বচ্ছতা, সংলাপ ও অংশগ্রহণমূলক প্রশাসনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে আরো উচ্চতায় পৌঁছে দেবেন। রাবিপ্রবি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাহাড়ের বুকজুড়ে গড়ে ওঠা এই বিশ্ববিদ্যালয় এখন শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং রাঙ্গামাটির সম্ভাবনা, স্বপ্ন ও আধুনিক শিক্ষার প্রতীক। বিদায়ী উপাচার্যের অবদানকে সম্মানের সাথে স্মরণ করে নতুন নেতৃত্বকে স্বাগত জানিয়ে তারা একটি স্থিতিশীল, গবেষণামুখী ও উন্নত রাবিপ্রবির প্রত্যাশা করছেন।



