মুফতি আহমাদুল্লাহ মাসউদ
(গত দিনের পর)
প্রকৃত তাওয়াক্কুল : প্রকৃত তাওয়াক্কুল হলো ইসলামের নির্দেশিত পথ। অর্থাৎ জানাশোনা ও বিচক্ষণতা অনুযায়ী পরিশ্রম করা কিন্তু ফলাফলের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রক আল্লাহ তায়ালা। আমরা কারণ অনুযায়ী চেষ্টা করি কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কোনো ফলাফল নেই। এই তাওয়াক্কুল আমাদের হৃদয়ে নিশ্চয়তা দেয়, আতঙ্ক দূর করে এবং আমাদের পরিশ্রমকে পূর্ণতা দেয়। কারণ, চেষ্টার পরও যদি আমাদের কাক্সিক্ষত ফল এই দুনিয়াতে না আসে, তার মানে আমাদের পরিশ্রম বৃথা গেছে, এমন ভাবা ভুল; বরং আল্লাহ তায়ালা আমাদের সেই চেষ্টা এবং নেক ইচ্ছার প্রতিদান আখিরাতে আরো বড় ও মহৎভাবে দেবেন। এক সময় আমরা উপলব্ধি করব, সেই কাক্সিক্ষত জিনিসটি তখন না পাওয়াই আমাদের জন্য প্রকৃত কল্যাণকর ছিল। কেননা, কখনো কখনো আমাদের স্বপ্ন পূরণ না হওয়াই আল্লাহর এক গভীর দয়া, যা আমাদের জন্য সত্যিকারের মঙ্গল নিশ্চিত করে।
রিজিক আহরণের উপায় : যেহেতু আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, প্রতিটি বান্দার রিজিক নির্ধারিত, তাই আমাদের উচিত আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রেখে আমাদের যোগ্যতা অনুযায়ী রিজিক অনুসন্ধান করা। প্রকৃতপক্ষে, মানুষের রিজিকের পরিমাণ সব জায়গায় এক রকম নয়। কেউ পরিশ্রমের মাধ্যমে যা অর্জন করে, তা তার জীবিকা বা প্রয়োজনীয় আয় হিসেবে যথেষ্ট হয়ে যায়। আর কারোটা হয় না। কারণ আল্লাহ কিছু বান্দার জন্য রিজিক প্রসারিত করেন, আবার কারো জন্য তা সীমিত রাখেন। এতে তার অগাধ জ্ঞান ও পরম প্রজ্ঞা নিহিত রয়েছে। অতএব, কোনো মুসলিম আর্থিকভাবে সচ্ছল হলেও হঠাৎ তার রিজিক সীমিত হয়ে যেতে পারে। ইসলামে এমন কিছু কার্যকর উপায় শেখানো হয়েছে যা অনুসরণ করলে আল্লাহ তার রিজিক প্রসারিত করতে পারেন। কখনো কখনো রিজিকের সীমাবদ্ধতা ঘটে কোনো পাপ বা গুনাহের কারণে। তার কয়েকটি নিম্নে তুলে ধরা হলো :
পাপ ও অবাধ্যতা : পাপ ও অবাধ্যতা হলো রিজিককে বিলম্বিত বা বাধাগ্রস্ত করার প্রধান কারণ। আল্লাহ তায়ালা আমাদের রিজিক বরাদ্দ করে রেখেছেন। কিন্তু তিনি আমাদের পাপ ও অনৈতিকতার কারণে তা বিলম্বিত বা সীমিত করে দেন। যদি কোনো মুসলিমের রিজিক দেরিতে আসে বা কমে যায় এবং এর পেছনে তার পাপ থাকে, তবে তার কর্তব্য হলো সেই পাপ থেকে তাওবা করা, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং আন্তরিকভাবে তাঁর কাছে ফিরে আসা। নবী সা: বলেছেন, ‘নিশ্চয় মানুষ তার অপরাধের কারণে রিজিক থেকে বঞ্চিত হবে।’ (ইবনে মাজাহ-৪০২২)। এটি আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। আর যদি কেউ অবাধ্যতা ও পাপাচারে লিপ্ত থাকে, তারপরও তার রিজিকে কোনো সঙ্কীর্ণতা না আসে, তাহলে বুঝতে হবে সে অচিরেই আল্লাহর কঠিন পাকড়াওয়ে আপতিত হবে। এদের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘আর কাফেররা (অপরাধীরা) যেন কিছুতেই মনে না করে, আমি ওদেরকে যে অবকাশ দিচ্ছি (সম্পদ-সময়, ইত্যাদি দিয়ে) তা তাদের জন্য মঙ্গলজনক। প্রকৃতপক্ষে আমি তো ওদেরকে অবকাশ দেই কেবল এই জন্য যে, যাতে ওদের পাপ আরো বৃদ্ধি পায়। আর পরিশেষে ওদের জন্য আছে অপমানকর শাস্তি।’ (সূরা আলে-ইমরান-১৭৮)
তাই, অবাধ্যতায় লিপ্ত থাকার সময় রিজিকের যে আধিক্য থাকে তা মূলত প্রকৃত প্রাচুর্য নয়; বরং তা হলো শাস্তি বৃদ্ধির কারণ। কেননা, পাপ কখনো কল্যাণ বয়ে আনে না; বরং তা মানুষকে দুর্ভিক্ষ ও দারিদ্র্যের দিকে ধাবিত করে।
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা না করা : পরিবার ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা রিজিককে বাধাগ্রস্ত করে। যদি কোনো ব্যক্তির রিজিক কমে যায় বা বিলম্ব হয়, তার উচিত আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করা। যারা ইতঃমধ্যেই সম্পর্ক রক্ষা করে আসছে, তাদেরও ধারাবাহিকভাবে তা চালিয়ে যাওয়া উচিত, যেন আল্লাহ তাদের রিজিককে আরো বেশি বরকতময় করেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি চায় তার রিজিক প্রসারিত হোক এবং আয়ু দীর্ঘ হোক, সে যেন আল্লাহকে ভয় করে এবং আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (মাজমাউজ জাওয়ায়েদ-১৩/৪৬৫)। আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখার অর্থ হলো- কথা ও কাজে তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করা। তাদের খোঁজ-খবর নেয়া। শরিয়তের সীমায় থেকে সময়-সুযোগে তাদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করা। সামর্থ্য অনুযায়ী প্রয়োজনে তাদেরকে সাহায্য করা। এবং তাদের কল্যাণ সাধনের প্রচেষ্টা করা।
দান-সদকায় রিজিক বৃদ্ধি : সদকা হলো রিজিক আহরণের একটি প্রধান উপায়। যে ব্যক্তি তার অর্থ দিয়ে সদকা করে, আল্লাহ তার ধন-সম্পদ বৃদ্ধি করে দেন। পবিত্র কুরআনে এসেছে, ‘আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দান-সদকাকে বর্ধিত করেন। আর আল্লাহ পছন্দ করেন না কোনো অবিশ্বাসী পাপীকে।’ (সূরা বাকারা-২৭৬)। হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত, রাসূল সা: বলেছেন, মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি ব্যয় করো, হে আদম সন্তান! আমিও তোমার প্রতি ব্যয় করব।’ (বুখারি-৫৩৫২) রাসূল সা: বলেন, ‘সদকা সম্পদ কমায় না (বরং বৃদ্ধি করে)’ (মুসলিম-২৫৮৮)
রিজিক নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা কাম্য নয় : মানুষের যাপিত জীবনে রিজিক একটি অপরিহার্য উপাদান। কিন্তু একটি সত্য সর্বদা মনে রাখা দরকার, রিজিক মানুষের হাতে নয়; বরং এটি একমাত্র আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে। আল্লাহ তায়ালা তাঁর কিতাবে ঘোষণা করেছেন, পৃথিবীতে যত জীব আছে, তাদের রিজিক তিনি নিজেই নিয়ন্ত্রণ করেন। এমনকি আকাশে উড়ন্ত পাখি থেকে শুরু করে মাটির নিচে লুকানো কীটপতঙ্গ পর্যন্ত প্রতিটি প্রাণীর জন্য তিনিই রিজিক নির্ধারিত করেন।
আমরা মানুষ প্রায়ই রিজিক নিয়ে অযথা উৎকণ্ঠায় ভুগি। ভবিষ্যতে কি খাব, সন্তানদের কীভাবে লালন-পালন করব, জীবনের প্রয়োজন মেটাব কিভাবে? এসব চিন্তায় আমরা অস্থির হয়ে পড়ি। অথচ আল্লাহর প্রতিশ্রুতি খুবই পরিষ্কার। তিনি বলেন-‘তোমাদের রিজিক আসমানে রয়েছে এবং যা কিছু তোমাদের জন্য প্রতিশ্রুত, সেটিও। অর্থাৎ রিজিক ইতঃমধ্যেই ঠিক করা আছে, সময়মতো তা পৌঁছবে, কেউ তা আটকাতে পারবে না। এ থেকে আমরা শিক্ষা পাই মানুষের দায়িত্ব হলো চেষ্টা করা, আর ফলাফলের বিষয়টি আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেয়া। সুতরাং, রিজিক নিয়ে উৎকণ্ঠার কোনো কারণ নেই। দুশ্চিন্তায় ভোগার পরিবর্তে একজন মুসলিমের উচিত আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা, হালাল পথে পরিশ্রম করা ও আল্লাহর কাছে দোয়া করা।
লেখক : শিক্ষক, জামিয়া নুরিয়া ইসলামিয়া, কামরাঙ্গিরচর, ঢাকা



