- যুক্তরাষ্ট্রে রূপরেখা প্রস্তুত
- পাল্টা প্রস্তুতি ইরানের
- সঙ্ঘাত বিস্তৃত হচ্ছে গাজা লেবানন সিরিয়ায়
চলমান ইরান সঙ্কটকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কা দ্রুত বাড়ছে। কূটনৈতিক আলোচনা কার্যত স্থবির হয়ে পড়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে আরো বিস্তৃত সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি জোরদার করেছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সূত্রে জানা গেছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো নেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পরিস্থিতি এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সামরিক, অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক- তিনটি ক্ষেত্রেই বৈশ্বিক অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
চীন সফর শেষে ওয়াশিংটনে ফেরার পথে এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে ট্রাম্প ইরানের সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, প্রস্তাবের প্রথম অংশই তার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। একই সাথে তিনি সতর্ক করে বলেন, কোনো সমঝোতা না হলে ইরানকে ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ করে দেয়া হতে পারে। তার এ বক্তব্যের পরপরই ওয়াশিংটনের কৌশলগত অবস্থান আরো কঠোর হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
যুদ্ধের রূপরেখার প্রস্তুতি যুক্তরাষ্ট্রের
মার্কিন প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পেন্টাগন এরই মধ্যে সম্ভাব্য নতুন সামরিক অভিযানের রূপরেখা প্রস্তুত করেছে। পূর্বে স্থগিত হওয়া ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নতুন কাঠামো ও আরো বিস্তৃত সামরিক সক্ষমতা নিয়ে আবার চালু হতে পারে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ কংগ্রেসে সাক্ষ্য দেয়ার সময় জানান, প্রয়োজন হলে যুদ্ধকে আরো তীব্র করার পূর্ণ প্রস্তুতি যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য এ অভিযানে আগের তুলনায় অনেক বেশি সমন্বিত বিমান হামলা চালানো হতে পারে। লক্ষ্যবস্তু হিসেবে থাকবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, সামরিক অবকাঠামো, কমান্ড সেন্টার এবং ভূগর্ভের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো। বিশেষভাবে ইস্পাহানের ভূগর্ভের পারমাণবিক স্থাপনায় উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধ্বংস করতে মার্কিন বিশেষ বাহিনী মোতায়েনের বিকল্পও বিবেচনায় রয়েছে। যদিও সামরিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, এ ধরনের স্থল অভিযান দ্রুত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে এবং এতে বড় ধরনের প্রাণহানির ঝুঁকি রয়েছে।
মার্কিন সামরিক সূত্র বলছে, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে ৫০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় পাঁচ হাজার মেরিন সেনা ও ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের প্রায় দুই হাজার প্যারাট্রুপার প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে। পাশাপাশি দু’টি বিমানবাহী রণতরী, একাধিক ডেস্ট্রয়ার ও বিপুলসংখ্যক যুদ্ধবিমান মোতায়েন রাখা হয়েছে। তবে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত আলোচনায় স্বীকার করছেন, ইরানের বিরুদ্ধে দ্রুত ও নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন সহজ হবে না। কারণ সাম্প্রতিক হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও তেহরান তাদের অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও ভূগর্ভের সামরিক অবকাঠামো আবার সচল করতে সক্ষম হয়েছে।
ইরানের পাল্টা প্রস্তুতি
এ দিকে ইরানও পাল্টা যুদ্ধ প্রস্তুতি জোরদার করেছে। দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, যেকোনো আগ্রাসনের ‘উপযুক্ত ও কঠোর জবাব’ দিতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী প্রস্তুত। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালী ঘিরে ইরানের ৩৩টি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৩০টি আবার সক্রিয় করা হয়েছে। এর ফলে পারস্য উপসাগরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও আন্তর্জাতিক তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল নতুন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেছেন, ‘পছন্দের যুদ্ধ’ চালিয়ে গেলে ওয়াশিংটনকে আরো বড় অর্থনৈতিক মূল্য দিতে হবে। তার ভাষায়, হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে নতুন নিরাপত্তাব্যবস্থা শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর হিসেবে পরিচিত এই প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। ইরান ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছে, ভবিষ্যতে ‘বন্ধু ও নিরপেক্ষ’ দেশগুলোর জন্য প্রণালী খোলা রাখা হলেও যুক্তরাষ্ট্র-ঘনিষ্ঠ দেশগুলোর ক্ষেত্রে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা হতে পারে।
ইরানি পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির প্রধান ইব্রাহিম আজিজি জানিয়েছেন, শিগগিরই নতুন ট্রানজিট নীতিমালা ঘোষণা করা হবে। সেই নীতির আওতায় হরমুজ ব্যবহারকারী জাহাজ থেকে বিশেষ ফি আদায় এবং সামরিক জাহাজ চলাচলে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কার্যকর হলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে এবং তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে।
যুদ্ধ পরিস্থিতির চাপ ও কূটনৈতিক তৎপরতা
যুদ্ধ পরিস্থিতির চাপ ইতোমধ্যে ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, সামরিক উত্তেজনা ও বৈদেশিক বাণিজ্য সঙ্কটের কারণে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি ৫৩ শতাংশ ছাড়িয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। রান্নার তেলের মূল্যস্ফীতি ৩৭৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে জানানো হয়েছে। ইরানি রিয়ালের অবমূল্যায়নও অব্যাহত রয়েছে। ইরানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আলি জেইনিবান্দ স্বীকার করেছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির পাশাপাশি সরকারের নীতিগত দুর্বলতাও মূল্যবৃদ্ধির জন্য দায়ী। সরকার এখন ভর্তুকি বাড়ানো, বাজার নিয়ন্ত্রণ ও মজুদদারি দমনে নতুন উদ্যোগ নেয়ার কথা বলছে।
এ দিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও কূটনৈতিক তৎপরতা থেমে নেই। পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি আকস্মিক সফরে তেহরান পৌঁছেছেন। ইসলামাবাদ এখনো মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সাথে ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর বৈঠকেও ইরান সঙ্কট প্রধান আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। তবে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে কৌশলগত মতপার্থক্যের কারণে এখনো কোনো অভিন্ন অবস্থান গৃহীত হয়নি।
ন্যায্য অবস্থান নেয়ার আহ্বান ইরানি প্রেসিডেন্টের
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি ‘বাস্তবসম্মত ও ন্যায্য’ অবস্থান নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশ্ব ক্যাথলিক নেতার উদ্দেশে পাঠানো এক বার্তায় তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক নীতি শুধু ইরানের বিরুদ্ধেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইন, মানবিক মূল্যবোধ ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার বিরুদ্ধেও অবস্থান করছে। তিনি দাবি করেন, ইরান সবসময় কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষেই থেকেছে এবং পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনায় অংশ নেয়ার মধ্য দিয়ে সেই অবস্থান আবারো প্রমাণ করেছে।
চীনও প্রকাশ্যে যুদ্ধবিরোধী অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে। বেইজিং বলেছে, সঙ্ঘাত দীর্ঘায়িত হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, গোটা বৈশ্বিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহ, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সঙ্ঘাতের বিস্তার
অন্য দিকে সঙ্ঘাতের বিস্তার ইতোমধ্যে লেবানন, গাজা, পশ্চিমতীর ও সিরিয়াতেও নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দক্ষিণ লেবাননের টাইর, নাবাতিয়েহ ও সাইদন এলাকায় ইসরাইলি বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে, যদিও যুদ্ধবিরতি আরো ৪৫ দিনের জন্য বাড়ানো হয়েছে। মানবিক সংগঠন মেডিসিনস সান্স ফ্রন্টিয়ার্স চিকিৎসাকর্মীদের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। সংস্থাটির লেবানন মিশনের প্রধান জেরেমি রিস্টোর্ড বলেছেন, আহত মানুষকে উদ্ধার করতে গিয়ে চিকিৎসাকর্মীদের নিহত হওয়া আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
গাজাতেও সঙ্ঘাত অব্যাহত রয়েছে। ইসরাইল দাবি করেছে, হামাসের শীর্ষ সামরিক নেতা ইজ্জাল দ্বীন আল হাদাদ এক হামলায় নিহত হয়েছেন, যদিও হামাস আনুষ্ঠানিকভাবে তা নিশ্চিত করেনি। একই সাথে অধিকৃত পশ্চিমতীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা, কৃষিজমি দখল, মসজিদে অগ্নিসংযোগ ও গ্রেফতারের ঘটনা বেড়েছে। জাতিসঙ্ঘের কর্মকর্তা রমিজ আলাকবারোভ এসব হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, ধর্মীয় স্থান ও বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর আক্রমণ পরিস্থিতিকে আরো অস্থিতিশীল করে তুলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সঙ্কট আর কেবল যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বা ইসরাইল-ইরান দ্বন্দ্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য, বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা, সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ, আন্তর্জাতিক অর্থনীতি এবং বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে উত্তেজনা যদি আরো বৃদ্ধি পায়, তাহলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ, তেলের মূল্য এবং বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতিতে নতুন ধাক্কা আসতে পারে। একই সাথে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন এক দীর্ঘস্থায়ী ও বহুমাত্রিক যুদ্ধের আশঙ্কাও ক্রমেই বাস্তব হয়ে উঠছে।
হরমুজ প্রণালী ইস্যুতে জাতিসঙ্ঘ প্রস্তাব সমর্থনকারী দেশগুলোকে হুমকি
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান নৌপথ হরমুজ প্রণালী নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত জাতিসঙ্ঘের খসড়া প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও তেল পরিবহনের নিরাপত্তা নিয়ে সৃষ্ট এই উদ্বেগের মধ্যে এবার সরাসরি হুঁশিয়ারি সঙ্কেত দিয়েছে ইরান।
তেহরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়া হয়েছে, হরমুজ প্রণালীসংক্রান্ত এই মার্কিন খসড়া প্রস্তাবের পেছনে যেসব দেশ সহ-উদ্যোক্তা হিসেবে থাকবে কিংবা সমর্থন জোগাবে, ওই অঞ্চলে যেকোনো সম্ভাব্য সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির জন্য তাদের ‘আন্তর্জাতিক দায়’ বহন করতে হবে। বার্তা সংস্থা আলজাজিরা জানায়, জাতিসঙ্ঘে নিযুক্ত ইরানের মিশন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক বিবৃতিতে এই কড়া বার্তা দিয়েছে। ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র এই প্রস্তাবের সমর্থনকারী দেশগুলোর তালিকাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। এর মাধ্যমে তারা মূলত নিজেদের ‘অবৈধ কর্মকাণ্ড ও সামরিক আগ্রাসনের’ পক্ষে একটি ভুয়া আন্তর্জাতিক ঐকমত্যের রূপ দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, কোনো ধরনের রাজনৈতিক অজুহাত কিংবা কূটনৈতিক আড়াল তৈরি করে এই দেশগুলো তাদের আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা থেকে পার পাবে না। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র, বাহরাইন ও পারস্য উপসাগরীয় অন্যান্য দেশের যৌথ সমর্থনে আনা ওই খসড়া প্রস্তাবে ইরানি হামলা বন্ধ করার দাবি জানানো হয়েছে। একই সাথে উপসাগরীয় আন্তর্জাতিক পানিসীমায় বাণিজ্যিক ও নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা পুরোপুরি পুনঃপ্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেয়া হয়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ হামলার ইউএইর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল সৌদি ও কাতার
ইরানের হামলার জবাবে দেশটিতে যৌথ সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার জন্য সৌদি আরব ও কাতারকে রাজি করানোর চেষ্টা করেছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। তবে তাদের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে বলে ব্লুমবার্গের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে যৌথ আগ্রাসন চালানোর পরপরই সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানসহ উপসাগরীয় নেতাদের সাথে বেশ কয়েকবার ফোনে কথা বলেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আগ্রাসনের জবাবে তেহরান উপসাগরীয় দেশগুলোকে লক্ষ্য করে হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়ে। ২০২১ সালে ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ চুক্তির অধীনে ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা সংযুক্ত আরব আমিরাতকে এই প্রতিশোধের মূল ধাক্কাটা সামলাতে হয়েছে। দেশটির ওপর প্রায় তিন হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আঘাত হেনেছে।
তবে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য নেতা ইরানের ওপর সমন্বিতভাবে হামলা চালানোর বিষয়ে মোহাম্মদ বিন জায়েদের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। এই প্রতিবেদনটি স্পষ্ট করে দেয়, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কিভাবে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে উত্তেজনা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। অথচ অভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে উপসাগরীয় দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের এক হওয়ার কথা ছিল। এখন জানা যাচ্ছে, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত উভয় দেশই ইরানের ওপর প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়েছিল। তবে তারা তা করেছিল যার যার মতো আলাদাভাবে। বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের হামলাগুলো ছিল নিয়ন্ত্রিত এবং দেশটি দ্রুতই তার মিত্র পাকিস্তানের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাকে সমর্থন করার দিকে মনোযোগ দেয়। বিপরীতে, সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের জ্বালানি কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, এপ্রিলের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র যখন যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিচ্ছিল, ঠিক সেই সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত পারস্য উপসাগরে অবস্থিত ইরানের ‘লাভান দ্বীপে’ আঘাত হানে। এই হামলার ফলে সেখানে একটি বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটে এবং কয়েক মাসের জন্য ওই কেন্দ্রের উৎপাদনক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন যুদ্ধবিরতির পক্ষে কথা বলছিলেন, তখন এই ঘটনাটি উত্তেজনা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছিল।
পারমাণবিক প্রযুক্তির মাধ্যমে লাখো শিশুর জীবন রক্ষা করছে ইরান
ইরানে নবজাতকদের জটিল বংশগত বিপাকজনিত রোগ শনাক্তে উন্নত পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহার বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বর্তমানে জন্ম নেয়া প্রতিটি শিশুকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ৫৮ ধরনের মেটাবলিক রোগের পরীক্ষা করা হচ্ছে, যেখানে ব্যবহৃত হচ্ছে ট্যান্ডেম মাস স্পেকট্রোমেট্রি (এমএস/এমএস) প্রযুক্তি।
ইরানি গণমাধ্যমের দাবি, এই উন্নত চিকিৎসাসেবা ও পরীক্ষাব্যবস্থার সাথে জড়িত রয়েছে বহুল আলোচিত ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ব্যবহার। বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসাক্ষেত্রে এমন বিস্তৃত নবজাতক স্ক্রিনিং কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পারা দেশের সংখ্যা বিশ্বে খুবই কম। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে বিতর্ক থাকলেও, দেশটি বহু বছর ধরে একই প্রযুক্তিকে শিশুদের জীবনরক্ষার কাজে সফলভাবে ব্যবহার করে আসছে।
দুই দশকের বেশি সময়ের কর্মসূচি
ইরানে নবজাতক স্ক্রিনিং কার্যক্রম প্রথম শুরু হয় ২০০২ সালে। শুরুতে জন্মগত হাইপোথাইরয়েডিজম, ফেনাইলকিটোনুরিয়া (পিকেইউ) এবং গ্লুকোজ-৬-ফসফেট ডিহাইড্রোজেনেজ ঘাটতি শনাক্তের মধ্য দিয়ে এই পরীক্ষা চালু করা হয়। পরবর্তী সময়ে পারমাণবিক চিকিৎসাপ্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতির মাধ্যমে পরীক্ষার পরিধি বাড়িয়ে বর্তমানে ৫৮টি জটিল মেটাবলিক রোগ শনাক্তের সক্ষমতা অর্জন করেছে দেশটি।



