দিল্লির দরবারে একি হাহাকার

মাঠে নামার পর দেখা যায়Ñ ফুটবলটা পর্যন্ত কিনে দিতে হয় আমাদের। এমনকি তাদের দলের জার্সির খরচ না দিলে খেলা হবে না বলে হুমকি দিয়ে বসে। বাধ্য হয়ে সেই হুমকি মেনে নিতে হয়। আসলে এতদিন ফাঁকা মাঠে গোল দিয়ে আসছিল ‘বন্ধুদেশ’। এখন সেই মাঠে শক্তিশালী খেলোয়াড় হিসেবে হাজির হয়েছে চীন। বেইজিংয়ের লেজ ধরে এসেছে ইসলামাবাদ

ওই যে রূপকথায় একটা হাঁস ছিল, সোনার ডিমপাড়া হাঁস। গৃহস্থের খামারে প্রতিদিন সোনার ডিম দিত সেই হাঁস। ডিম বিক্রি করে ফুলেফেঁপে উঠেছিল গৃহস্থ। তারপরও তার আরো চাই। একদিন হাঁসের পেট কেটে সব ডিম বের করে নিতে চাইল; কিন্তু হাঁসের পেটের ভেতর একটা ডিমও পায়নি সে।

আমাদের ‘বন্ধুদেশে’র সোনার ডিমপাড়া হাঁস ছিল বাংলাদেশ। দীর্ঘসময় এখানে ছিল তাঁবেদার সরকার। তারা প্রতিদিন একটা করে ডিম দিয়ে আসত ভারতে। আদানির মাধ্যমে উপঢৌকন পাঠাত দিল্লির সিংহাসনে বসা নরেন্দ্র মোদিকে। দেশটির উত্তর-পূর্ব দিকের স্পর্শকাতর এলাকা সাতবোন। এই বোনদের জন্য ট্রানজিট চাইল ভারত। চাইল শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা। বন্দর ব্যবহারের অনুমতি চাইল। শেখ হাসিনা ছিলেন ‘উদার’। বন্ধুকে দেয়ার বেলায় কৃপণতা করেননি তিনি! দু’হাত খুলে দিয়েছিলেন। বিনিময়ে নিয়েছেন কী?

নেয়ার আনন্দ সে তো বড় নয়, দেয়ার আনন্দেই হোক জয়। কাউকে কিছু দিয়ে বিনিময় চাইতে হয় না, সেটি শেখ হাসিনা জানতেন।

প্রতিদিন একটা করে সোনার ডিম পেয়ে আরো বেশি লোভী হয়ে উঠেছিল ‘বন্ধু’। তারপর তারা চাইল হাঁসের পেট চিরে নিতে; কিন্তু এই ‘হাঁস’ কি আর রূপকথায় থাকে?

রূপকথায় গল্প যেমনখুশি তেমন করে টেনে নেয়া যায়। বাংলাদেশের মানুষকে টানা যায় না। এই দেশের মাটি সহনশীল, সহ্য করে; কিন্তু পেট চিরে নিতে চাইলে নীরব থাকে না। বর্ষায় এই মাটি কাদা হয়ে গলে যায়, চৈত্রে হয় রুক্ষ।

২০২৪ সাল বাংলাদেশ দেখিয়েছে। বাংলাদেশ যে তাদের জন্য রূপকথার কোনো প্লট নয়, সেই সত্যটা টের পেয়েছে ‘বন্ধুদেশ’। তারপরও হাল ছাড়তে রাজি হয়নি। আসলে লোভী গেরস্তদের একবারে শিক্ষা হয় না। বারবার লোভ করে। তারপর সব হারায়। ৯ বছরে যার আক্কেল হয় না, তার নব্বইয়েও হয় না।

একসময় বাংলাদেশের রাজনীতিতে চাউর ছিল, ‘বন্ধুদের’ আশীর্বাদ ছাড়া বাংলাদেশের নাকি টিকে থাকা সম্ভব নয়। এর বিপরীতে গিয়ে যারা বলতেন সম্ভব, তাদেরকে বিকৃত মস্তিষ্ক বলেও তকমা দেয়া হতো।

কিন্তু চব্বিশের পর কী দেখা গেল?

বাংলাদেশ কি টিকে থাকতে পেরেছিল? হ্যাঁ, পেরেছিল। আর এই সাফল্যই ছিল আধিপত্যবাদী শক্তির মূল ভয়ের কারণ। এ কারণেই তারা ‘বন্ধুদেশ’ ছাড়া বাংলাদেশের গতি নেই- অচল হয়ে পড়া এই পুরনো ধারণা নতুন করে সামনে আনার চেষ্টা করেছিল। সেই অপপ্রচারে কেউ বিভ্রান্ত হয়েছিল কি না, সেটি ভিন্ন প্রশ্ন। তবে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপ ভাবিয়ে তুলেছে ‘বন্ধুদেশে’র নীতিনির্ধারকদের। সেখানে লেগে গেছে হাহাকার। সরকার গঠনের পর জুলাই সনদ নিয়ে যখন টালবাহানা শুরু হলো, গণভোটের রায় পাশ কাটানো হলো, তখন মানুষের মনে সংশয় তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।

গণভোটের রায় এখনো তারা বাস্তবায়ন করেনি। তবে বাস্তবায়ন হতে পারে বলে একটা আশাবাদ ঘুরে বেড়াচ্ছে। মানুষ এক দিকে বুকভরা আশা, অন্য দিকে শঙ্কা নিয়ে তাকিয়ে আছে বিএনপির দিকে। যে ‘বন্ধুদেশ’ নিজেকে দক্ষিণ এশিয়ার ‘একমাত্র মোড়ল’ ভাবত, তার চোখের সামনে দিয়ে বাংলাদেশ সখ্য গড়ে তুলছে হিমালয় পেরিয়ে। এই সখ্য গোপন আঁতাত নয়, প্রকাশ্য এবং বাস্তবসম্মত। একেই বলা হয় ভারসাম্যপূর্ণ এবং কৌশলগত কূটনীতি।

সরকারের এই অবস্থান স্থায়ী হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে। কারণ আকাশে সিঁদুরে মেঘ ভাসলেও ঘরপোড়া গরু ভয় পায়। সেই ভয় থেকে মানুষের মনে শঙ্কা জাগা স্বাভাবিক। মানুষকে খুশি রাখতে হলে হাতি-ঘোড়া মারতে হয় না। কেবল মানুষের মনের কথাটা বোঝার চেষ্টা থাকলেই হয়। এই যে সরকারের একটা প্রতিনিধিদল চীন ঘুরে এলো, এতে মানুষ কতটা খুশি হয়েছে, সেটি অন্তত টের পেয়েছেন তারা। আর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফর যদি হয় চীনে, তাহলে সরকারের কতটা ইতিবাচক ইমেজ তৈরি হবে, সেটিও বোঝেন নীতিনির্ধারকরা।

বেইজিং যাওয়া মানে চীনের কব্জায় চলে যাওয়া নয়। এই সফরের মানে বাংলাদেশ একচেটিয়া দিল্লির দিকে হেলে নেই। একটা ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির গৌরব। তারপরও কথা থাকে- চীনের সাথে সম্পর্ক রেখে আমাদের কী লাভ?

লাভের হিসাব সোজাসাপটা, পশ্চিমারা একটা সহযোগিতা করার আগে দশটা শর্ত দিয়ে বসে। চীনের এই স্বভাব নেই। তারা বিনিয়োগ করার জন্যই বসে আছে। এর বিনিময়ে যা চায়, সেটি খোলাখুলিই বলে। চীন আমাদেরকে উন্নত প্রযুক্তি দেয়ার ক্ষমতা রাখে। আমাদের অবকাঠামো উন্নত করার ক্ষমতা রাখে। যেগুলোর কোনোটা দেয়ার মুরোদ ‘বন্ধুদেশে’র নেই। তাদের নিজেদের ভাণ্ডেই তো পর্যাপ্ত প্রযুক্তি নেই। সবচেয়ে বড় কথা, চীনের সাথে সম্পর্ক আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে দারুণ ভারসাম্য এনে দেবে; কিন্তু আমরা ভারসাম্যে থাকি, সেটি চায় না ‘বন্ধু’। বন্ধুর দরবার থেকে ইশারা-ইঙ্গিত করা হয়। ঠারেঠোরে বোঝানো হয়- এর সাথে মেশা যাবে না। ওর সাথে খেলা যাবে না!

আচ্ছা, ঠিক আছে। নাহয় কেবল ‘তোমার’ সাথেই খেললাম। মাঠে আসো দেখি, তুমি আমাকে কী দেবে, আর বিনিময়ে আমার থেকে কী নিতে চাও? এই আহ্বানে রাজি হয়ে যায় বন্ধু; কিন্তু মাঠে নামার পর দেখা যায়, ফুটবলটা পর্যন্ত কিনে দিতে হয় আমাদের। এমনকি তাদের দলের জার্সির খরচ না দিলে খেলা হবে না, বলে হুমকি দিয়ে বসে। বাধ্য হয়ে সেই হুমকি মেনে নিতে হয়। আসলে এতদিন ফাঁকা মাঠে গোল দিয়ে আসছিল তারা। এখন সেই মাঠে শক্তিশালী খেলোয়াড় হিসেবে হাজির হয়েছে চীন। বেইজিংয়ের লেজ ধরে এসেছে ইসলামাবাদ। একাত্তরের পর থেকে ইসলামাবাদ নিয়ে অস্বস্তি ছিল ঢাকার। আসলে এটা যত না অস্বস্তি তার চেয়ে বেশি ছিল ভারতের তৈরি করা দেয়াল। চব্বিশের পর সেই দেয়াল ভাঙতে শুরু করেছিল। আবার ভাঙা দেয়ালে ইট বসাতেও শুরু করেছিল আধিপত্যবাদীরা। কিন্তু নতুন বসানো সেসব ইট ডিঙিয়ে বাংলাদেশ সফরে চলে আসেন পাক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন রাজা নাকভি। এর আগে বাংলাদেশের সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নেতৃত্ব ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয় পাকিস্তানে। এই প্রশিক্ষণটা আগে হতো ভারতের ‘মুসৌরি’তে। চাউর আছে, সেখানে অনেককে হানিট্র্যাপে ফেলা হতো। পরে আদায় করে নেয়া হতো বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী চাওয়া।

এবার প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের ১২ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা প্রশিক্ষণের জন্য পাকিস্তান গেছেন। তারা লাহোরে সিভিল সার্ভিস একাডেমিতে (সিএসএ) প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। এর মধ্যেই ঢাকায় চলে এসেছেন পাক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন রাজা নাকভি। তিনি আসেন মিরপুরে বাংলাদেশ-পাকিস্তান ক্রিকেট খেলা উপলক্ষে; কিন্তু উপলক্ষটা কি কেবল খেলাই ছিল?

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পাকিস্তান এখন বড় খেলোয়াড়। আর পুরনো খেলোয়াড় চীন তো আছেই। এই দুই খেলোয়াড়ের সাথে সখ্য রাখলে মাঠে একচেটিয়া আধিপত্য দেখাতে পারবে না কেউ।

আধিপত্যের কথা উঠলে, পশ্চিমের ব্যাপারে অনেকেই নমনীয় হয়ে যান। তারা ইউরোপ আর আমেরিকার দিকে তাকিয়ে থাকতে পছন্দ করেন। তাদের ধারণা ইউরোপ-আমেরিকাই সবসময় বাংলাদেশের অর্থনীতি সচল রাখবে; কিন্তু পৃথিবী যে বদলে যাচ্ছে, বদলে গিয়েছে, সেই হিসাব আমরা রাখি না। পশ্চিমের সূর্য এখন পশ্চিম দিকেই হেলে যাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর সেই অজেয় মোড়ল নেই। সম্প্রতি চীন সফরে গিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তার মুখের ওপর আমেরিকাকে ‘পতনশীল শক্তি’ বলে দিয়েছেন শি। ইরানের সাথে যুদ্ধ বাধিয়ে আমেরিকা এখন পিছু হটছে। খোদ ট্রাম্পও সোশ্যাল মিডিয়ায় স্বীকার করেছেন, ভুল নীতির কারণে ভেতরে ও বাইরে বিপর্যয়ে পড়েছে আমেরিকা। এই বিপর্যয়ের পেছনে আছে দানব ‘ইসরাইল’। এই দানব আমাদের ‘বন্ধুদেশে’রও বন্ধু। তাদের পরামর্শে ইসরাইল থেকে আড়িপাতার প্যাগাসাস প্রযুক্তি এনেছিলেন শেখ হাসিনা। এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশে গুম-খুন আর নির্যাতন হয়েছে। ইসরাইল নামের সেই দানবের পাল্লায় পড়ে বন্ধুহারা হচ্ছে ‘বন্ধুদেশ’। ইমেজ সঙ্কটে পড়ছে আমেরিকা। ইরান-আমেরিকার মধ্যে মিটমাট করতে দূতিয়ালিতে হাজির পাকিস্তান।

সুতরাং বন্ধু বাড়াতে হবে আমাদের। তখন সেই ‘বন্ধু’ও বাধ্য হয়ে প্রতিযোগিতায় নামবে। কিছু নেয়ার জন্য হাত বাড়িয়ে রাখলে, আমরাও বিবেচনা করতে পারব, সেই হাতে আমাদের জন্য কিছু আছে কি না।

লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত