বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত আওয়ামী আমল ছিল দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর। এই অন্ধকার যুগের আগে চাঁদাবাজি এত ভয়াবহরূপে রাষ্ট্র ও সমাজে দেখা যায়নি। আওয়ামী আমলের ভয়াবহ এই বদরসম, প্রকাশ্য চাঁদাবাজির অপসংস্কৃতি এখনো চলছে। বাস্তবে চাঁদাবাজির পূর্ণ বিকাশ-বিস্তার ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে বিগত সাড়ে ১৫ বছরে।
চাঁদাবাজি একটি শব্দ। এর ভেতর লুকিয়ে আছে বহু বিশ্লেষণ- যেমন, ঘুষ, দুর্নীতি, সিন্ডিকেট, ঋণখেলাপি, অর্থপাচার, ব্যাংক লুট ও দখল, জনগণের অর্থে কানাডার বেগমপাড়ায় বাড়ি ক্রয়, অর্থ লুটে ভারতে গিয়ে নিরাপদ আশ্রয় নেয়া, বিভিন্ন দেশে নাগরিকত্ব কেনা ইত্যাদি। দেশবিরোধী এই দুষ্টচক্রের অনুচররা এখনো রাষ্ট্রযন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘাপটি মেরে বসে আছে। লুটেরাদের বিরাট অংশকে এই ল্যান্ডস্কেপে প্রকাশ করতে গেলে, শত খণ্ডের এক বিষাদসিন্ধু লিখতে হবে। তাই আজ শুধু চাঁদাবাজি প্রসঙ্গ এ নিবন্ধ থিতু থাকবে।
চাঁদাবাজি এখন অনেকাংশেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। প্রকৃত অর্থে চাঁদাবাজি এখন আর কোনো চারাগাছ নয়, মহীরুহে পরিণত হয়েছে। ডালপালা গজিয়ে বিস্তৃত এলাকা দখল করেছে। এর শিকড় কতটা গভীরে, কতটা উপরিভাগে বিস্তৃত, এর অনুসন্ধান এখনো বিপজ্জনক। তবু সমাজে এর প্রতিক্রিয়ার তত্ত্বতালাশ করা জরুরি। চাঁদাবাজির অর্থনীতির যে আনুমানিক হিসাব পাওয়া গেছে, তা এক শব্দে বলা যায় ভয়াবহ। মাত্র চারটি খাত থেকে বছরে আনুমানিক যে পরিমাণ চাঁদাবাজি হয়; এর অঙ্কটা প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকা, যার পুরোটা কালো টাকা।
চাঁদাবাজি নিয়ে গবেষণামূলক একটি নিবন্ধ
বাংলাদেশের চাঁদাবাজি একটি সুসংগঠিত অপরাধ হিসেবে দীর্ঘকাল ধরে বিদ্যমান, যাতে সময়ের সাথে সাথে ধরন ও কৌশলের পরিবর্তন ঘটেছে। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পরে দেশে চাঁদাবাজির প্রবণতা কমেনি, কেবল রূপ বদলেছে। অতীতে যারা সক্রিয় ছিল, এখনো ভোল পাল্টে সেই তারাও চাঁদাবাজিতে সক্রিয়।
চাঁদাবাজিতে রাজনৈতিক-প্রশাসনিক যোগসাজশ : বাংলাদেশে চাঁদাবাজি মূলত রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়, দলীয় ক্যাডার এবং আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর কিছু অসাধু সদস্যের যোগসাজশে বিকশিত হয়েছে।
প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ : এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং একটি গোষ্ঠীর নিয়মিত আয়ের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দোকানপাট, পরিবহন, নির্মাণ খাত, ইটের ভাটাসহ সবখানে চাঁদা নেয়ার অলিখিত একটি রীতি চালু আছে।
চব্বিশ পরবর্তী পরিস্থিতি : এ সময় থেকে চাঁদাবাজির ধরন বদলেছে। নতুন নতুন পক্ষ যুক্ত হয়েছে। ফুটপাথে হকারদের কাছে থেকে চাঁদা নেয়া একটি পুরনো কুপ্রথা, যা এখনো বহালতবিয়তে। পণ্য পরিবহনেও চাঁদা দিতে হয়, এতে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়। মার্কেট বা পরিবহন সমিতির নামে চাঁদা আদায়, যাকে প্রাতিষ্ঠানিক চাঁদাবাজি বলাই যুক্তিযুক্ত।
বর্তমানে আরো একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায় করা। লক্ষণীয়, চাঁদা না দিলে দলবদ্ধ হয়ে হাঙ্গামা করে দোকান বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়েও চাঁদবাজরা চাঁদাবাজি করছে। সেই সাথে প্রযুক্তির ব্যবহার করে তথ্য চুরি বা ব্ল্যাকমেইল করে টাকা আদায় করছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত দুর্বৃত্তরা। প্রকৃত বাস্তবতায় চাঁদাবাজির মতো অপকর্মে জড়িত চাঁদাবাজদের বিচার না হওয়া বা কার্যকর পদক্ষেপের অভাব এদের আরো উৎসাহিত করেছে। রাজনৈতিক আশ্রয় ও দলীয়করণ, আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর কিছু সদস্যের অসাধুতা, বিচারহীনতা এবং দ্রুত বিচারের অভাব, সামাজিক প্রতিরোধ বা প্রতিবাদ না থাকাই চাঁদাবাজির কারণ।
ঢাকার চাঁদাবাজি : ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঢাকা শহরে চাঁদাবাজির ধরন ও পৃষ্ঠপোষকতায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ২০২৬ সালের মে মাসের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে চাঁদাবাজি বেপরোয়া রূপ নিয়েছে। এখন স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও কিছু চিহ্নিত সন্ত্রাসী চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছে। অবস্থা এমন যে, খোদ ঢাকাতে অন্তর্বর্তী সরকার আমলে চাঁদাবাজি আগের চেয়ে ২০-৫০ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল বলে ব্যবসায়ী সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
চাঁদবাজি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ রাজধানীতে ১৪৮ অস্ত্রধারী চাঁদাবাজ চিহ্নিত করেছে, যারা পেশাদার। চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে পুলিশ ও র্যাব। মে ২০২৬-এর প্রথম কয়েক দিনে ১৫০ জনের বেশি চাঁদাবাজ ও তাদের সহযোগীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, প্রধানত ফুটপাথ, নির্মাণাধীন প্রকল্প, বাস-ট্রাক টার্মিনাল এবং বস্তি এলাকায় চাঁদাবাজি সবচেয়ে বেশি হয়। গুলশান, বাড্ডা ও রামপুরা- এসব এলাকায় অস্ত্রধারী চাঁদাবাজদের সবচেয়ে বেশি তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে মেরুল বাড্ডার ডিআইটি প্রজেক্ট এলাকায় মাছের আড়ত থেকে প্রতিদিন বড় অঙ্কের চাঁদা তোলা হয়। মিরপুর ১০, ১৩ ও মাজার রোড এলাকায় ফুটপাথ ও সড়কের দোকান থেকে প্রতিদিন চাঁদাবাজি হয়। গুলিস্তান ও পল্টনে ফুটপাথ চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে, যা সাধারণ মানুষের জন্য ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফুটপাথে ‘লাইনম্যান’ হিসেবে পরিচিত কিছু ব্যক্তি নিয়মিত চাঁদা সংগ্রহ করে, যারা আড়ালে রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় থাকে। শুধু ঢাকার ফুটপাথে হকারদের কাছ থেকে বছরে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজি হয়, যার দৈনিক পরিমাণ আট কোটি টাকার বেশি। ফুটপাথে চাঁদাবাজির বেলায় কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় থানার পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজদের পৃষ্ঠপোষকতা বা ভাগের অভিযোগ আছে।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও সায়েদাবাদে বাস-ট্রাকস্ট্যান্ড এবং সবজি বাজারকেন্দ্রিক চাঁদাবাজি বেপরোয়াভাবে হয়ে থাকে। অন্যান্য এলাকায় যেমন- মোহাম্মদপুর (বসিলা), কোতোয়ালি (বাবুবাজার), তেজগাঁও এবং উত্তরা এলাকাতেও চাঁদাবাজির আধিক্য রয়েছে। বর্তমান সময়ে চাঁদাবাজির তালিকায় বেশির ভাগ ক্ষমতাসীন দল ও এর অঙ্গসংগঠনের স্থানীয় নেতাকর্মীর নাম উঠে আসছে। বিশেষ করে মিরপুর, যাত্রাবাড়ী ও উত্তরখান এলাকায়। এ ছাড়া শীর্ষ সন্ত্রাসী যারা বিদেশে পলাতক তারা (যেমন, কলিং মেহেদী, জিসান, সুব্রত বাইন গ্রুপ) নিজ নিজ বাহিনীর মাধ্যমে চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে চাঁদাবাজির সুনির্দিষ্ট বার্ষিক অঙ্ক বের করা কঠিন হলেও বিভিন্ন খাতের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাবে, এটি হাজার হাজার কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ সালের এক তথ্যানুযায়ী, শুধু পরিবহন এবং ফুটপাথকেন্দ্রিক চাঁদাবাজির একটি বড় চিত্র পাওয়া যায় :
পরিবহন খাত : দেশে ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস ও মিনিবাস থেকে বছরে এক হাজার ৫৯ কোটি টাকা চাঁদা আদায় হয়। কিছু প্রতিবেদনে অঙ্কটি দুই হাজার কোটি টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। গণপরিবহনে মোট ছয় হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলে জানা গেছে। পরিবহন খাতে প্রতিদিন প্রায় ১০০ কোটি টাকার চাঁদা তোলা হয়।
অটোরিকশা : এক তথ্য অনুযায়ী, দেশের অটোরিকশাগুলো থেকে দৈনিক ১১০ কোটি টাকা হিসাবে বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজি হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর : চট্টগ্রাম বন্দরে প্রতি বছর ৯০০ কোটি টাকার চাঁদাবাজি হয় বলে জানা গেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশে চাঁদাবাজি বেড়েছে বলে আগের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা মন্তব্য করেছেন। যেখানে আগে এক টাকা চাঁদা নেয়া হতো, এখন সেখানে দেড় থেকে দুই টাকা পর্যন্ত নেয়া হচ্ছে। এ অঙ্কগুলো বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও দাবির ওপর ভিত্তি করে, যাতে সামগ্রিক চিত্র ধরে নেয়া যেতে পারে। বাংলাদেশে চাঁদাবাজির সাথে রাজনৈতিক বলয়ের ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতা অত্যন্ত গভীর। এটি একটি কাঠামোগত সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে চাঁদাবাজির ধরনে পরিবর্তন এলেও এর রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ হয়নি; বরং নতুন রূপে চলছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার মাত্রা ও এর প্রভাব সম্পর্কে আনুমানিক তথ্য
সর্বগ্রাসী পৃষ্ঠপোষকতা (৯০ শতাংশ পর্যন্ত) : গণমাধ্যমের অনুসন্ধান ও বিভিন্ন সূত্রের বরাতে দাবি করা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজির ঘটনার সাথে জড়িতদের ৯০ ভাগ কোনো না কোনোভাবে রাজনৈতিক নেতাকর্মী বা স্থানীয় প্রভাবশালী বলয়ের সাথে যুক্ত।
দলীয় পরিচয়ের আড়ালে চাঁদাবাজি : আওয়ামী সরকারের পতনের পর, নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিভিন্ন গ্রুপ বিশেষ করে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর (যুবদল, ছাত্রদল) স্থানীয় নেতাকর্মীর একাংশ চাঁদাবাজিতে লিপ্ত বলে অভিযোগ উঠেছে।
নতুন সিন্ডিকেট ও নিয়ন্ত্রণ : রাজধানীর গুলশান, কাওরান বাজার, গাবতলী ও বিভিন্ন বাস টার্মিনালে আগের সিন্ডিকেটের হাতবদল হয়ে নতুন রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।
গণপরিবহন, ফুটপাথ, কাঁচাবাজার, নির্মাণ খাত এবং সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার ও মালামাল সরবরাহে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় চাঁদাবাজি চলছে। এখানে বিভিন্ন ‘সমিতি’ বা ‘টার্মিনাল’-এর নামে চাঁদা তোলা হয়। বাস্তবতা হলো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের একাংশ বা স্থানীয় প্রশাসন-রাজনৈতিক চাপে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয় না, যা এ অপরাধকে আরো উৎসাহিত করছে। সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ স্বীকার করেছেন, ৫ আগস্টের পর চাঁদাবাজি বেড়েছে এবং তা বন্ধে রাজনৈতিক সরকারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
মূল্যায়ন : চাঁদাবাজি এখন আর শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কাঠামোয় পরিণত হয়েছে। ক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথে চাঁদাবাজদের পরিচয় পরিবর্তন হলেও, মাঠপর্যায়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক এবং সাধারণ মানুষকে আগের মতো চাঁদা দিতে হচ্ছে, যা কিছু ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
বাংলাদেশে চাঁদাবাজিকে অনেকে পেশা হিসেবে নিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এটি সমাজে একটি অপসংস্কৃতি বা অদৃশ্য কাঠামোতে পরিণত হয়েছে। অনেক রাজনৈতিক নেতা বা কর্মীর মূল পেশা হিসেবে চাঁদাবাজিকে নেয়ার অভিযোগ আছে।
নিয়মিত আয়ের উৎস : চাঁদাবাজি অপরাধীদের নিয়মিত আয়ের উৎস, যা অপরাধ হিসেবে মনে করে না দুর্বৃত্তরা। চাঁদাবাজদের পেছনে রাজনৈতিক মদদ থাকায় এটি একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেট বা চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। যদিও চাঁদাবাজি একটি ফৌজদারি অপরাধ, তবু অনেককে ‘বৈধ পেশা’ হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা দেখা যায়। যদিও এটি সমাজে গভীর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশে চাঁদাবাজি সাম্প্রতিক সময়ে ভয়াবহ একটি সামাজিক ব্যাধি ও অপরাধমূলক অপসংস্কৃতি হিসেবে দাঁড়িয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, ব্যবসাবাণিজ্য এবং সামগ্রিক অর্থনীতি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এটি সমাজের নৈতিকতা ও নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত হানছে। এমন সহজ উপার্জন অনেক তরুণকে আকর্ষণ করছে, যা আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের একটি চিহ্ন হয়ে ফুটে উঠেছে।
চাঁদাবাজির প্রভাবে অর্থনৈতিক অস্থিরতা : চাঁদাবাজির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যায়, কারণ পরিবহন ও ব্যবসার প্রতিটি স্তরে চাঁদা দিতে হয়।
বিনিয়োগে নিরুৎসাহ : শিল্প-কারখানা, নির্মাণ খাত এবং নতুন ব্যবসায় চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্যে বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হন, যা কর্মসংস্থান কমায়।
সমাজে চাঁদাবাজির প্রতিক্রিয়ায় অসহায় মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম নেয়। সাধারণ মানুষ চাঁদাবাজদের ভয়ে অতিষ্ঠ; কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস অনেকে পান না। সাধারণ মানুষ এ দুর্বৃত্তদের কাছে অসহায়। এতে সমাজের নৈতিক অবক্ষয় এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে সর্বস্তরের মানুষ উদ্বিগ্ন।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মানুষ চাঁদাবাজিমুক্ত একটি স্বাভাবিক ও নিরাপদ জীবনের আশা করেন। সঙ্গত কারণে সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তাদের প্রতিরোধে বিভিন্ন মহল থেকে আহ্বান জানানো হয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, চাঁদাবাজি সমাজে একটি অপসংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে, যা রুখে দেয়া না গেলে দেশের জন্য আরো ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। ঘুণে ধরা এ সমাজকে পরিশুদ্ধ করতে হলে, বিশেষ করে রাজনৈতিক আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে গড়ে ওঠা এই সঙ্ঘবদ্ধ দুর্বৃত্তদের আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর মাধ্যমে শুধু চাপ দিয়ে শেকড় উপড়ে ফেলা সহজ কাজ নয়। শুধু আইনশৃঙ্খলাবাহিনী আর সরকারের পক্ষে দেশের অর্থসামাজিক ব্যবস্থা ধ্বংসকারী গোষ্ঠীবদ্ধ এ অপশক্তিকে প্রতিহত করা সম্ভব নয়। এ জন্য দুর্বার সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।
লেখক : সম্পাদক, নয়া দিগন্ত



