প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবতাভিত্তিক ও বাস্তবায়নযোগ্য। তবে বাজেটের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, পুঁজিবাজারের উন্নয়ন এবং সরকারের ঋণনির্ভরতা কমানোর সক্ষমতার ওপর।
বর্তমান অর্থনীতি উচ্চ ঋণ, বড় অঙ্কের সুদ পরিশোধ ও বিনিয়োগ স্থবিরতার মতো চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং সরকারের পরিচালন ব্যয়ের বড় অংশ এখন সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। সরকারের মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় ৭২ শতাংশ পরিচালন ব্যয়ে খরচ হচ্ছে। ফলে উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য তুলনামূলক কম অর্থ অবশিষ্ট থাকে।
অর্থমন্ত্রী আগামী কয়েক বছরে পরিচালন ব্যয়ের হার ৭২ শতাংশ থেকে ৬৬ শতাংশে নামিয়ে আনার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন, সেটি বাস্তবায়িত হলে তা বড় অর্জন হবে। তিনি বলেন, পরিচালন ব্যয় কমানো গেলে উন্নয়ন খাতে বেশি অর্থ বরাদ্দ দেয়া সম্ভব হবে এবং বাজেট ঘাটতির ওপর চাপও কমবে।
বাংলাদেশের উন্নয়ন বাজেটের বড় অংশ এখনো অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে সরকারকে বন্ড বাজার ও পুঁজিবাজারকে কার্যকর অর্থায়নের উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পদ্মা সেতু বা অন্যান্য আয়-উৎপাদনকারী সরকারি সম্পদকে বন্ড বা অন্যান্য আর্থিক উপকরণের মাধ্যমে পুঁজিবাজারে আনা গেলে সরকার এককালীন বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে। এতে ঋণের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন সহজ হবে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দিয়ে আসছে, যা বিশ্বের অধিকাংশ দেশে পুঁজিবাজারের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ফলে ব্যাংক খাতে তারল্য ও খেলাপি ঋণের চাপ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের প্রধান উৎস হওয়া উচিত পুঁজিবাজার। শেয়ারবাজার ও বন্ড বাজারকে সক্রিয় করতে না পারলে অর্থনীতিতে কাক্সিক্ষত বিনিয়োগ আসবে না। আগামী ছয় মাসে পুঁজিবাজারে কার্যক্রম বাড়ানো এবং সরকারি সম্পদের আর্থিকায়নে অগ্রগতি দেখা গেলে বাজেটের ইতিবাচক ফলাফল দৃশ্যমান হতে শুরু করবে।
বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বরাদ্দ বৃদ্ধি ইতিবাচক। বয়স্ক ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, কৃষি সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বরাদ্দ বৃদ্ধি সরকারের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গীকারের প্রতিফলন। এসব কর্মসূচি স্বল্প আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়তা করবে এবং অর্থনীতিতে চাহিদা সৃষ্টি করবে।
বর্তমানে বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণ প্রবৃদ্ধি দীর্ঘ সময়ের মধ্যে অন্যতম নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসতে হবে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ওপরে নিতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। শুধু সরকারি ব্যয় দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। তার মতে, এ জন্য সুদের হার সহনীয় পর্যায়ে আনতে হবে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে হবে। একই সাথে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনাও জরুরি।
বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার সুযোগ সীমিত ছিল। এটি একটি বাস্তবতাভিত্তিক বাজেট। এর চেয়ে খুব বেশি ভিন্ন কিছু করা কঠিন ছিল। সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক আছে। এখন মূল বিষয় হচ্ছে বাস্তবায়ন। আগামী এক বছরে বেসরকারি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, রফতানি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং মূল্যস্ফীতির গতি-প্রকৃতিই নির্ধারণ করবে বাজেট কতটা সফল হয়েছে।



