সংসদ প্রতিবেদক
বিরোধী দলের আপত্তির মধ্যেই পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপরে (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে বয়সসীমা তুলে দিতে আনা দু’টি সংশোধনী বিল জাতীয় সংসদে পাস করেছে সরকার। বিদ্যমান আইনে ৬৫ বছর বয়সের ঊর্ধ্বরা বিএসইসির চেয়ারম্যান বা কমিশনার এবং ৬৭ বছর বয়সের ঊর্ধ্বরা আইডিআরএ-এর চেয়ারম্যান বা সদস্য হতে পারেন না। এই বিধান বাতিল করে বয়সসীমা তুলে দিয়ে বিল দু’টি পাস করা হয়। নির্দিষ্ট কোনো বিশেষ ব্যক্তিকে বিবেচনায় রেখে এই বয়সসীমা তুলে দেয়া হলো কি নাÑ তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে বিরোধী দল। জবাবে বিল আনার কারণ ব্যাখ্যা করেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ সময় সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে বিতর্ক দেখা দেয়।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে জাতীয় সংসদের অধিবেশনের ২৫তম দিনে বিল দু’টি অধিবেশনে উত্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ সময় বিরোধী দলের প থেকে আপত্তি জানালেও কণ্ঠভোটে তা পাস হয়। এ সময় অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
অর্থমন্ত্রীর উত্থাপিত বিলের বিরোধিতা করে জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্যসচিব ও রংপুর থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, সরকারি দল সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় তারা চাইলে আইন পাস করতে পারে। তবে যে দু’টি বিল পাস হলো, তার বিষয়বস্তু নিয়ে যথেষ্ট ব্যাখ্যা হয়নি। বিষয়বস্তু হলো, সিকিউরিটিস এক্সচেঞ্জ কমিশনের আইন এবং বীমা করপোরেশনের আইনে বয়সের যে বাধ্যবাধকতা ছিল, সেই বাধ্যবাধকতাগুলো উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বিলের ভাষা সংপ্তি হওয়ায় দেখে মনে হতে পারে বড় কিছু হচ্ছে না; কিন্তু বাস্তবে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের েেত্র ৬৫ বছর এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপরে েেত্র ৬৭ বছরের বয়সসীমা ছিল, সেটিই তুলে দেয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে আখতার বলেন, সরকার বলছে যোগ্য ও দ লোক আনার জন্য বয়সসীমা তোলা হচ্ছে। তবে প্রশ্ন হলো, এটি কোনো নীতির ভিত্তিতে হচ্ছে, নাকি নির্দিষ্ট কাউকে সামনে রেখে করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এগুলো কিন্তু আর্থিক প্রতিষ্ঠান। দেশের অর্থ সম্পদগুলো যদি এখান থেকে লুটপাটের মতো কোনো পরিবেশ ভবিষ্যতে তৈরি হয়, তার জন্য কিন্তু সরকারি দলকে দায়ী থাকতে হবে।
স্পিকার এই সংসদ সদস্যের উদ্বেগের বিষয়ে অর্থমন্ত্রীকে জবাব দিতে বলেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, বিল দু’টি কেন আনা হয়েছে, তা তিনি আগেই স্পষ্ট করেছেন। আইনটি যখন ১৯৯৩ সালে করা হয়, তখন গড় বয়স ও কর্মমতার বাস্তবতা ভিন্ন ছিল। আপনার এই বিলটা যখন ’৯৩-তে হলো সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের, তখন গড় বয়স ছিল ৫৭ বছর... এখন গড় বয়স হচ্ছে ৭২ বছর। আপনি কি এই লোকগুলোকে কর্মকাণ্ডের বাইরে রাখতে চান? বাংলাদেশের এই নাগরিকগুলোকে, এই অভিজ্ঞ লোকগুলোকে, তাদেরকে কর্মকাণ্ডের বাইরে রাখতে চান? এখানে ইমোশনের কোনো কিছু নেই। দিস ইজ এ প্রফেশনাল জব এবং একটা ইকোনমিকে প্রফেশনালি চালাতে গেলে এই পরিবর্তন আনতে হবে বাংলাদেশে।
এরপর বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেন, সরকারের সাম্প্রতিক বিভিন্ন পদপে জনগণের আকাক্সার বিপরীতে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি প্রশ্ন তোলেন, যোগ্যতার নামে বাছাই এভাবে চললে দেশ কিভাবে এগোবে? আমরা তো কার ইনটেনশন কী, সেটি দেখতে পারব না। এটা মনের ব্যাপার... আমরা দেখব তার প্রকাশটাকে, বাস্তবায়নটাকে কিভাবে এটা রিফেক্ট করতেছে সমাজে।
অর্থমন্ত্রী জানান, বিল পাস হওয়ার পর এ ধরনের আলোচনা কার্যপ্রণালী বিধির বাইরে, তবু প্রশ্ন ওঠায় তিনি উত্তর দিচ্ছেন। তিনি দাবি করেন, বিগত বিএনপি সরকারের সময় বাংলাদেশ ব্যাংক ও সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে সব নিয়োগই ছিল ‘নন পলিটিক্যাল অ্যাপয়েন্টমেন্ট’। তিনি বলেন, বিএনপির অ্যাপয়েন্টমেন্টগুলো কোনো সময় পলিটিক্যাল কনসিডারেশনে হয়নি এবং যোগ্য ব্যক্তিকে সেখানে দেয়া হয়েছে। সেই ধারা এই সরকার অব্যাহত রাখবে। প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, ‘ফিন্যান্সিয়াল সেক্টরে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেয়া হবে না’।
পরে বিরোধী দলের উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এমন সিদ্ধান্ত থাকলে তারা সেটিকে স্বাগত জানান। তবে বর্তমান বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের একটি রাজনৈতিক পরিচয় আছে বলে তার জানা আছে এবং এ নিয়ে তৈরি হওয়া ‘তথ্যগত বিভ্রান্তি’ দূর হওয়া উচিত। তিনি বলেন, গভর্নর বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন বলে যদি সত্যি হয়, তাহলে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত নীতির আলোকে তার জায়গায় নতুন গভর্নর নিয়োগ দেয়া উচিত।
স্পিকার তখন অর্থমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেন, নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতে থাকলে সেটি দলীয় পরিচয় কি না?
জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, দলকে সমর্থন করা মানে দলের লোক নয়। কোনো দলের নির্বাচনী কার্যক্রমে সহায়তা করা মানেই ওই ব্যক্তি দলের সদস্য নন।
শেয়ারবাজারে ১৫ বছরে এক লাখ কোটি টাকার বেশি লুটপাট হয়েছে : বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে গত ১৫ বছরে এক লাখ কোটি টাকার বেশি লুটপাট হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। এই লুটপাটের সাথে জড়িতদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
রুমিন ফারহানা বলেন, ১৯৯৬ এবং ২০১০ সালে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে ভয়াবহ ধস নামে। এতে সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা সর্বস্ব হারিয়েছেন। বর্তমানে দেশের আমদানি-রফতানি পরিস্থিতি সঙ্কটে এবং পুঁজিবাজারের ওপর মানুষের আস্থা নেই। এ পরিস্থিতিতে শেয়ার বাজারকে আস্থার জায়গায় ফেরাতে বিএসইসি দ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, সদস্য রুমিন ফারহানা যে বক্তব্য রেখেছেন, আমি তার প্রতিটি কথার সাথে একমত। শেয়ারবাজারে অতীতে যা ঘটেছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে এবং আন্তর্জাতিক ফান্ড ম্যানেজারদের আকৃষ্ট করতে আমরা কাজ করছি। বিএনপির আমলে শেয়ারবাজার লুটপাটের সুযোগ ছিল না, এবারো তা থাকবে না।



