কূটনৈতিক প্রতিবেদক
‘নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে আনাই এ মুহূর্তের প্রধান চ্যালেঞ্জ’ মন্তব্য করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পর্যবেক্ষক মিশনপ্রধান ইভার্স ইজারস বলেছেন, ২০০৮ সালের পর থেকে বাংলাদেশে কোনো বিশ্বাসযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলো একটি গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে। বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে ইইউ পর্যবেক্ষক মিশনের ভূমিকা সহায়ক হবে। নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর নিরপেক্ষতার প্রতি আমরা নজর রাখব।
গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ইভার্স ইজারস এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে ইইউ আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য একটি পর্যবেক্ষক মিশন পাঠিয়েছে। লাটভিয়ার ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ও প্রধান পর্যবেক্ষক ইভার্স ইজারসের নেতৃত্বে মিশনটি গত মাসে (ডিসেম্বরে) শেষ দিকে কার্যক্রম শুরু করেছে। গত ২৯ ডিসেম্বর ১১ জন বিশ্লেষকের সমন্বয়ে কোর টিম বা মূল দলটি ঢাকা পৌঁছায়। গতকাল ৫৬ জন দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষকের আসার মধ্য দিয়ে এর কার্যক্রম আরো সম্প্রসারিত হয়েছে, যাদের বাংলাদেশের ৬৪টি জেলায় মোতায়েন করা হবে। ৯০ জন স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষককে নির্বাচনের ঠিক আগে কৌশলগত স্থানে মোতায়েন করা হবে। পূর্ণ সক্ষমতার এই মিশনে ইইউর ২৭টি দেশের পাশাপাশি কানাডা, নরওয়ে এবং সুইজারল্যান্ডের প্রায় ২০০ জন পর্যবেক্ষক অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।
বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সব রাজনৈতিক দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে ইভার্স ইজারস বলেন, বাংলাদেশসহ অনেক দেশেই আইনশৃঙ্খলা একটি ইস্যু এবং আমরা তাতে মনোযোগ দিচ্ছি। বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে সচেতন রয়েছে বলে আলোচনার সময় আমাকে জানানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বজায় রাখার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা একটি জটিল কাজ। সব রাজনৈতিক দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে মিডিয়াতে তাদের সুযোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। নির্বাচনী প্রার্থীদের মনোনয়ন যাচাই-বাছাই ও আপিল প্রক্রিয়ার প্রতি আমরা নজর রাখছি। এই প্রক্রিয়া মুক্ত ও স্বচ্ছ হওয়া উচিত।
নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে কিনা জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, এটা পর্যবেক্ষণের জন্যই আমাদের পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে বিশ্বাসযোগ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ।
অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন বলতে কী বোঝাতে চাইছেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থ হলো, নির্বাচনে বাংলাদেশের নাগরিকদের সব সামাজিক গোষ্ঠী- নারী, জাতিগত, ধর্মীয়, সংখ্যালঘু এবং প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলোর অংশগ্রহণ।
ইইউ পর্যবেক্ষক মিশনের বাজেটে বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়ন নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রশ্ন তুলেছে- এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ইভার্স ইজারস বলেন, ইইউ পর্যবেক্ষক মিশনের বাজেটে বাংলাদেশ সরকার অর্থায়ন করছে না। মিশনের জন্য ইউরোপের জনগণের করের অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে অস্থিরতা বিরাজ করছে। ব্যবসা, বিনিয়োগ, জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলায় বাংলাদেশ ইইউর গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। আর এ কারণেই আমাদের জনগণের অর্থ ব্যয় করে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে সমর্থন দেয়া হচ্ছে।
নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জেলা প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে থাকে, যাদের ক্ষমতাকে আগের বিতর্কিত নির্বাচনগুলোতে অন্যায়ভাবে ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে। নির্বাচনের ইশতেহার ঘোষণার পর তারা নির্বাচন কমিশনের আওতায় এসেছে। আসন্ন নির্বাচনে তাদের ভূমিকা কী হতে পারে- জানতে চাইলে ইভার্স ইজারস বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাস ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে কিছুটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এই ইস্যুগুলো নিয়ে আমাদের সাথে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর কথা হচ্ছে। তবে এ ব্যাপারে এখনই মন্তব্য করার সময় আসেনি।
তিনি বলেন, ইইউ পর্যবেক্ষক মিশন তাদের কার্যক্রম চলাকালে নির্বাচন প্রস্তুতি, আইনগত কাঠামো ও তার বাস্তবায়ন, নির্বাচনী প্রচারণা, নির্বাচনী বিরোধ নিষ্পত্তিসহ বিভিন্ন দিক পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করবে এবং এই লক্ষ্যে নির্বাচন প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, বিচার বিভাগ, নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যমের সাথে সম্পৃক্ত হবে। ভোটারদের সচেতন ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা মূল্যায়নের জন্য মিশনের পৃথক পর্যবেক্ষণ ইউনিট রয়েছে। সার্বিকভাবে ইইউ পর্যবেক্ষক মিশন নির্বাচন কতটা জাতীয় আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয়েছে, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এ নির্বাচন কতটা গ্রহণযোগ্য হয়েছে তা মূল্যায়ন করবে। তিনি বলেন, নির্বাচনের দুই দিন পর, অর্থাৎ ১৪ ফেব্রুয়ারি ইইউ পর্যবেক্ষক মিশন ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনে প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করবে। আর নির্বাচনের দুই মাস পর পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উত্থাপন করা হবে। এতে ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।



