রফতানি প্রবৃদ্ধিতে সমন্বিত লজিস্টিকস ব্যবস্থার ওপর জোর ডিসিসিআইর

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের রফতানি সক্ষমতা বাড়াতে দক্ষ, আধুনিক ও সমন্বিত লজিস্টিকস ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ী, নীতিনির্ধারক ও অবকাঠামো বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, বন্দর ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা, পরিবহন অবকাঠামোর দুর্বলতা, দীর্ঘ কাস্টমস প্রক্রিয়া এবং সমন্বয়হীন নীতির কারণে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হারাচ্ছে। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সরকারি ও বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

গতকাল রাজধানীতে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘বাণিজ্য নির্ভর বাংলাদেশের জন্য সমন্বিত বন্দর এবং লজিস্টিকস খাতের উন্নয়ন’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের (বিআইএম) মহাপরিচালক মো: সলিম উল্লাহ।

অনুষ্ঠানের স্বাগত বক্তব্যে ডিসিসিআইর ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী বলেন, দেশের লজিস্টিক খাতে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা রফতানি সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। তিনি বলেন, বন্দরগুলোতে পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা, সড়ক ও রেলপথে ধীরগতির পরিবহন ব্যবস্থা এবং আধুনিক কোল্ড-চেইন লজিস্টিকসের অভাবে দেশের সামগ্রিক সাপ্লাই চেইন ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠেছে।

তিনি আরো বলেন, প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে মূলত সময় ও ব্যয়ের দিক থেকে। এমন পরিস্থিতি উত্তরণে বন্দরে পেপারলেস ও অটোমেটেড সেবা চালু, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আধুনিক কোল্ড-চেইন ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিআইএম মহাপরিচালক মো: সলিম উল্লাহ বলেন, সমন্বিত বন্দর ও লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে, যার কারণে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে। তিনি বলেন, লজিস্টিক খাতের কাক্সিক্ষত উন্নয়নের জন্য সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম মাসরুর রিয়াজ। তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপিতে উৎপাদনমুখী খাতের অবদান প্রায় ২৫ শতাংশ, যা প্রতিবেশী অনেক দেশের তুলনায় এগিয়ে। তবে এ খাতের আরো সম্প্রসারণের জন্য স্থানীয় ও বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ জরুরি।

তিনি উল্লেখ করেন, গত চার দশকে দেশের রফতানিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও তা এখনো সীমিত কয়েকটি পণ্য ও বাজারের ওপর নির্ভরশীল। অর্থনীতির টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য বহুমুখীকরণের কোনো বিকল্প নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, দেশের লজিস্টিকস ব্যয় ২৫ শতাংশ কমানো গেলে রফতানি ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। একইভাবে পণ্য পরিবহন ব্যয় মাত্র ১ শতাংশ কমানো সম্ভব হলে রফতানি ৭ দশমিক ৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, দুর্বল লজিস্টিক কাঠামো ও ব্যবসা পরিচালনার উচ্চ ব্যয় দেশের বাণিজ্য পরিবেশকে প্রতিযোগিতাহীন করে তুলছে।

তিনি আরো বলেন, লজিস্টিক নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিদেশী কোম্পানির পাশাপাশি দেশীয় বেসরকারি খাতকে বন্দর ব্যবস্থাপনায় সম্পৃক্ত করা, চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার খালাসের সময় কমানো এবং নীতিগত প্রতিবন্ধকতা দূর করা এখন সময়ের দাবি।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত সচিব ও সাবেক সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) মো: হাবিবুর রহমান বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সম্প্রসারণের সীমাবদ্ধতার কারণে রেলপথই ভবিষ্যতের প্রধান ভরসা হতে পারে। তিনি বন্দরের সাথে রেল যোগাযোগ জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, এতে কম সময় ব্যয়ে পণ্য পরিবহন সম্ভব হবে। তিনি দেশের অন্তত একটি সমুদ্রবন্দর পরিচালনায় বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করার প্রস্তাব দিয়ে বলেন, এতে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হবে এবং সেবার মান বাড়ার পাশাপাশি শুল্কহারও কমতে পারে।

বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো: শামসুল হক বলেন, বাস্তবভিত্তিক ও সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনার অভাবে যোগাযোগ অবকাঠামো থেকে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি সরকারি সংস্থাগুলোর কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন।

শাহরিয়ার স্টিল মিলস অ্যান্ড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস কে মাসাদুল আলম মাসুদ বলেন, পানগাঁও বন্দরে স্ক্যানার মেশিন না থাকায় উদ্যোক্তারা বন্দরটি ব্যবহারে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ নৌপথের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে শিল্পপণ্যের পরিবহন ব্যয় কমার পরিবর্তে বেড়ে যাচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ট্রান্সপোর্ট স্পেশালিস্ট নুসরাত নাহিদ বাবী বলেন, দেশের কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়া এখনো যথাযথভাবে আধুনিকায়ন করা হয়নি। বিশেষ করে স্থলবন্দরগুলোতে ডিজিটাল কার্যক্রম চালু না হওয়ায় পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি হচ্ছে, যা ব্যবসার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এডিবির সিনিয়র প্রজেক্ট অফিসার হুমায়ুন কবির জানান, ধীরাশ্রম আইসিডি কনটেইনার ডিপো এবং একটি মাল্টিমোডাল লজিস্টিক হাব প্রকল্প বাস্তবায়নে এডিবি কাজ করছে। পাশাপাশি লজিস্টিক সেবার সব স্তরে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।