বেলা পৌনে ২টা। আগারগাঁও বিমানবাহিনী জাদুঘরের সামনের ফুটপাথ। সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে নানা ধরনের পুরনো জুতা-স্যান্ডেল। মাঝে কিছুটা জায়গা রেখে সাজিয়ে রাখা জুতা-স্যান্ডেলের আশপাশে ঘুরছেন কিছু মানুষ। তাদের চোখ আগারগাঁও চৌরাস্তার দিকে। মাঝে মাঝে আবার ঘড়িতে কয়টা বাজে জানতে চাইছেন পথচারীদের কাছে।
বুঝতে অসুবিধা হয় না, প্রচণ্ড আকাক্সক্ষা নিয়ে কিছু একটার জন্য অপেক্ষা করছেন তারা। কিন্তু কিসের জন্য এমন অপেক্ষা? জানতে চাইলে তাদের মধ্যে একজন জানান, খাবারের জন্য। তাদের জন্য দুপুরের খাবারের গাড়ি আসবে। সাধারণত ২টা থেকে সোয়া ২টার মধ্যে গাড়ি চলে আসে। তাই পথচারীদের কাছে বারবার জানতে চাইছেন কয়টা বাজে? একটু অপেক্ষা করে দেখা গেল একটি পিকআপ ভ্যান ছুটে আসছে তাদের দিকে, যা দেখে অপেক্ষমান সবাই বলে উঠলো ‘ওই যে চলে আইছে গাড়ি, সবাই যার যার জায়গায় বসো’। গাড়ি দাঁড়ানোর আগেই সবাই ফুটপাথে রাখা ওই জুতা-স্যান্ডেল পায়ে দিয়ে সেখানে বসে পড়লেন। তার মানে ওই জুতা-স্যান্ডেল তাদের জায়গা নির্ধারণের জন্য রাখা ছিল, যাতে গাড়ি এলে কোনো কোনোরূপ শৃঙ্খলা ভঙ্গ না হয়, যার যার জায়গায় সে সে বসতে পারেন।
সরেজমিন দেখা যায়, সেখানে যে পিকআপ ভ্যানটি থামল তার গায়ে লেখা রয়েছে ‘ভালো কাজের হোটেল’। গাড়িটি থামার পরই কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী নামলেন। তারা গাড়ি থেকে একটি বড় গামলা করে প্রথমে প্লেট নামালেন, যা আগে থেকেই পরিষ্কার করা। এসব প্লেট খুব দ্রুত ফুটপাথে বসে থাকা খাবার প্রত্যাশীদের হাতে দেন। সেই সাথে দেয়া হয় পানি। এরপর গাড়ি থেকে নামানো হয় সবজিখিচুড়ি। সবার প্লেটে খিচুড়ি বেড়ে দেয়ার পর অন্য একটি গামলা করে আনা হয় সিদ্ধ ডিম, যা হালকা করে তেলে ভাজা। এক প্রান্ত থেকে খাবার দিতেই শুরু হয়ে যায় খাওয়া। প্রতি প্লেটে যে পরিমাণ খিচুড়ি দেয়া হচ্ছে তা খেয়ে দ্বিতীয়বার চাওয়ার প্রয়োজন হচ্ছিল কারো।
জানা গেল, প্রতিদিন বেলা ২টা থেকে সোয়া ২টার মধ্যে এই জায়গাটাতে খাবার নিয়ে আসেন ভালো কাজের হোটেলের স্বেচ্ছাসেবীরা। এ কারণে প্রায় আড়াই থেকে ৩০০ মানুষ সেই খাবারের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। এসব মানুষের বেশির ভাগই ভাসমান হিসেবে পরিচিত। এ ছাড়াও রিকশাচালক, ভ্যানচালক, ঠেলাগাড়িওয়ালা, আশপাশের ভবনের সিকিউরিটি গার্ডরাও বিনা পয়সায় খাবার খেতে আসেন। কখনো কখনো পরিশ্রান্ত পথচারী, রাইড শেয়ারিংয়ের চালকরাও বসে পড়েন খেতে।
নুর ইসলাম নামে একজন বলেন, তিনি সারা দিন বিভিন্ন রাস্তায় প্লাস্টিকের বোতল কুড়ান; কিন্তু বেলা দেড়টা বাজতেই ছুটে আসেন আগারগাঁওয়ে। কারণ বিনা পয়সায় একবেলা খাবার তার জন্য অনেক উপকারে আসে। টাকা থাকলেও অনেক হোটেলে আমাদের ঢুকতে দেয় না। এ জন্য বেশির ভাগ সময় রুটি-কলা খেয়ে ক্ষুধা মেটাতে হয়; কিন্তু এখানে কোনো ঝামেলা নেই। রিকশাচালক আমজাদ বলেন, টাকা রোজগারের জন্য কষ্ট করে রিকশা চালাই। পাঁচ টাকার জন্যে যাত্রীদের সাথে দামিদামি করি। সেখানে এক বেলা ফ্রি খাবার খেতে পারলে আমার অনেক টাকা সেভ হয়। তাই আমি মাঝে মধ্যে এখানে খাবার খাই। তবে ট্রিপ নিয়ে দূরে কোথায়ও চলে গেলে ওই দিন খাওয়া হয় না। পাঠাও চালক রিপন বলেন, হোটেলে ২০০ টাকার নিচে খাবার খাওয়া যায় না। সেখানে এত সুন্দর খাবার বিনা পয়সায় পাওয়া গেলে খেটে খাওয়া গরিব মানুষের উপকার হবে এটাই স্বাভাবিক।
জানতে চাইলে ভালো কাজের হোটেলের কো-ফাউন্ডার জাকির হুসাইন নয়া দিগন্তকে বলেন, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কুড়িগ্রামের মোট ১৭টি পয়েন্টে তারা এই খাবার সরবরাহ করে থাকেন। প্রতিদিন প্রায় সাড়ে চার হাজার জনের খাবার তৈরি করা হয়। সপ্তাহে তিন দিন দেয়া হয় সবজিখিচুড়ি ও ডিম; তিন দিন ভাত-সবজি-ডিম এবং শুক্রবার দেয়া হয় মুরগির বিরিয়ানি। বর্তমান বাজারমূল্যে বিরিয়ানির প্রতিজনে খরচ পড়ে প্রায় ৮৮ টাকা, খিচুড়িতে ৫৬ এবং ভাতে খরচ পড়ে ৪৭ টাকা। বিনা পয়সায় কিভাবে খাবার দিচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদের চার হাজার সদস্যের একটি গ্রুপ রয়েছে যার নাম ‘ডেইলি টেন মেম্বারস’ অর্থাৎ ১০ টাকার সদস্য। এই সদস্যরা প্রতি মাসে সর্বনিম্ন ৩০০ টাকা করে ফান্ডে জমা দেন। তবে প্রকৃতপক্ষে ৩০০ নয়, তারা আরো বেশি টাকাই জমা দেন। এ ছাড়া তাদের এই কার্যক্রমকে পছন্দ করে অনেক হৃদয়বান ব্যক্তি সাহায্য-সহযোগিতা করে থাকেন। আবার অনেকে তাদের জন্মদিন, বিয়েসহ নানা ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠানের খরচের টাকা আমাদের দিয়ে থাকেন। সেই টাকা দিয়ে আমরা গরিবদের মাঝে খাবার বিতরণ করে থাকি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ২০০৯ সাল থেকে সামাজিক কর্মকাণ্ডের যাত্রা শুরু হয়। ২০১৯ সালে করোনার লকডাউনে মানুষের ক্ষুধার কষ্ট দেখে খাবার বিতরণ শুরু করা হয়। দেখা যায় বিপুলসংখ্যক মানুষ খাবারের জন্য লাইন দিচ্ছেন। তখন থেকে কার্যক্রম বাড়ানো হতে থাকে। প্রতিষ্ঠানের চার হাজার সদস্যের ফাউন্ডার ব্যবসায়ী আরিফুর রহমান। এ ছাড়াও জাকির হুসাইনসহ রয়েছেন শিহানুর রহমান, আসিফ, ফারুক ও শাওন।


