যুবদল নেতা পরিচয়দানকারী মঈন পিচ্চি হেলালের ঘনিষ্ঠ সহযোগী

আবু সালেহ আকন
Printed Edition
যুবদল নেতা পরিচয়দানকারী মঈন পিচ্চি হেলালের ঘনিষ্ঠ সহযোগী
যুবদল নেতা পরিচয়দানকারী মঈন পিচ্চি হেলালের ঘনিষ্ঠ সহযোগী

ঢাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলাল ও তার সেকেন্ড ইন কমান্ড জাহিদ মোড়লের হয়ে গোটা এলাকায় চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করতেন মইন। আলোচিত কিডনি চিকিৎসক কামরুল ইসলামের হাসপাতালেই নয়; মোহাম্মদপুর, আদাবর, ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, রমনা, তেজগাঁও থেকে শুরু করে সাভার পর্যন্ত এদের চাঁদাবাজির বিস্তৃতি। পিচ্চি হেলাল ও জাহিদ মোড়লের অবর্তমানে তাদের আন্ডারওয়ার্ল্ডের সব কালেকশন এই মঈনের মাধ্যমেই হয়ে আসছিল।

শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলাল ও তার সেকেন্ড ইন কমান্ড জাহিদ মোড়ল ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের দুই আতঙ্কের নাম। এদের হাত থেকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল কিছুই বাদ যায়নি। তাদের কথার কোনো ব্যত্যয় ঘটলেই নেমে আসে নির্যাতনের খড়গ।

ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল। দীর্ঘ ২৪ বছর কারাভোগের পর জুলাই বিপ্লব পরবর্তী ২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি। মুক্তির পরই রাজধানীর নিউমার্কেট, মোহাম্মদপুর-আদাবর, ধানমন্ডি ও হাজারীবাগের একক নিয়ন্ত্রকে পরিণত হন এই হেলাল। আধিপত্য বিস্তারের জন্য বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে একের পর এক সংঘর্ষ হয়। এসব সংঘর্ষে একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটে। সেপ্টেম্বরে মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার এলাকায় জোড়া খুনের ঘটনায় পৃথক দু’টি মামলায় পিচ্চি হেলালকে আসামি করা হয়। এর আগেও তার বিরুদ্ধে চারটি হত্যা মামলাসহ আটটি মামলার বিচার চলমান।

২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় মোহাম্মদপুরের রায়ের বাজারের সাদেক খান আড়তের সামনে নির্মাণশ্রমিক নাসিরকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় নিহতের ভাই সুমন বিশ্বাস বাদি হয়ে মোহাম্মদপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, নাসিরের পরিচিত শাওনের মোটরসাইকেলযোগে বেড়িবাঁধ তিন রাস্তার মোড়ে যাওয়ার পথে সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। তারা এলোপাতাড়ি কুপিয়ে নাসিরকে গুরুতর আহত করে। পরবর্তীতে খবর পেয়ে নাসিরের স্বজনরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই রাতেই মৃত্যু ঘটে নাসিরের। এই হত্যা মামলায় ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্ছি হেলাল, রাহুল, শাহরুখ, রয়েল, পারভেজ, ইমন ওরফে এলেক্স ইমনসহ মোহাম্মদপুরের আরো অজ্ঞাতনামা ১৫-২০ জনকে আসামি করা হয়। একইভাবে হত্যা করা হয় মুন্নাকে।

শেখ হাসিনার ১৫ বছরে ওই এলাকায় চাঁদাবাজি করেছে আওয়ামী লীগ, যুবলীগের সন্ত্রাসীরা। সক্রিয় ছিল যোশেফ-হারিছ বাহিনী, অনু, রাজিব, সলু, সাদেক খানের বাহিনী। তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ ছিলেন ওই এলাকার মানুষ। ২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আত্মগোপনে চলে যায় তারা। ১৫ আগস্ট কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হন পিচ্চি হেলাল। জামিন পেয়েই ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, বসিলা, আদাবর, লালমাটিয়া এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব শুরু করেন পিচ্চি হেলাল। তার সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে জাহিদ মোড়ল তৎপর হয়ে ওঠে। পরপর বেশ কয়েকটি খুনসহ অগণিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে পিচ্চি হেলালের নাম উঠে আসায় আত্মগোপনে চলে যায় হেলাল।

২৫ সালের ২৪ মার্চ ও ২৮ এপ্রিলসহ কয়েক দফায় মোহাম্মদপুর টাউন হলের মনির নামের এক ব্যবসায়ীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গুলি চালায় এই জাহিদ মোড়ল ও তার সহযোগীরা। চাঁদা চেয়ে না পেয়ে ওই ব্যবসায়ীকে কয়েক দফায় হুমকি দেয় জাহিদ। এরপরও চাঁদা না দেয়ায় তার বাসা ও অফিসে কয়েক দফায় গুলি চালানো হয়। এই ঘটনায় জাভেদ ও মোহাম্মদ হাসান মাহমুদ নামের দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকেই জানা যায়, এই ঘটনার নেপথ্য নায়ক জাহিদ মোড়ল পিচ্চি হেলালের সেকেন্ড ইন কমান্ডের কথা।

১৬ মার্চ লালমাটিয়ার জাকির হোসেন রোডের মাঠের পাশে একটি ইন্টারনেট অফিস দখলে নিতে গুলি চালায় এরা। চাঁদা না দেয়ায় স্থানীয় ময়লা পরিষ্কারের কাজটিও তারা দখলে নেয়।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় পিচ্চি হেলালের কয়েক শ’ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী রয়েছে। এর মধ্যে সেকেন্ড ইন কমান্ডের দায়িত্ব পালন করছে এই জাহিদ মোড়ল। আরো রয়েছে, লিটন মাহমুদ বাবু ওরফে তেরেনাম বাবু, মনোয়ার হোসেন জীবন ওরফে লেদু হাসান, ওয়াহিদুল হাসান দিপু, মফিজ উদ্দিন মফি, মজিদ ওরফে ভাঙাড়ি মজিদ, দোলন, রিয়াজ, সালাউদ্দিন, ভাগনে শুভ, গিট্টু রানা, সাব্বির, চিকু শাকিল, দিপু, হাসান, জুয়েল, রাসেল, ইউসুফ, পেটকা তুহিন, ফালান, দিদার, মো: জুয়েল ও রফিক।

হেলাল ও জাহিদ মোড়ল আত্মগোপনে থেকে মঈনুল হোসেন মঈনকে দায়িত্ব দেয় গোটা এলাকার চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে। মঈন নিজেকে বিএনপি নেতা পরিচয় দিয়ে পুরো এলাকায় চাঁদাবাজি শুরু করে। তার হাত থেকে বাদ যায়নি মানবিক ডাক্তার বলে খ্যাত এবং আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত কিডনি চিকিৎসক কামরুল ইসলামের কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালও (সিকেডি)। নিজেকে যুবদল নেতা বলে পরিচয় দিয়ে ওই হাসপাতালেও মঈন মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে আসছিল। সেখানকার কর্মকর্তা কর্মচারীদের ভয়ভীতি দেখানোর ভিডিও ফুটেজ দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচিত হয়। চাঁদা দাবির পর ওই হাসপাতাল থেকে থানায় অভিযোগ করা হলেও মঈনের বিরুদ্ধে পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ভিডিওফুটেজ ভাইরাল হওয়ার পর সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টনক নড়ে।

এই ঘটনায় গত ১১ এপ্রিল যুবদল নেতা মঈন উদ্দিনকে (মঈন) প্রধান আসামি করে মামলা দায়ের করেন হাসপাতালটির অপারেশন থিয়েটার ইনচার্জ মো: আবু হানিফ। ১৩ এপ্রিল নড়াইলের কালিয়া থানা থেকে মঈনকে গ্রেফতার করা হয়। মঈনসহ ওই চাঁদাবাজির ঘটনায় মোট সাতজন গ্রেফতার আছে।

ভুক্তভোগীরা জানান, মঈনকে গ্রেফতার করা হলেও তার গডফাদার পিচ্চি হেলাল ও জাহিদ মোড়ল এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।