আলজাজিরা, রয়টার্স ও এপি
যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও দক্ষিণ লেবাননে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিশ্চিত করেছেন যে ইসরাইলি সেনারা লিতানি নদী পার হয়েছে। দক্ষিণ লেবাননের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বউফোর্ট দুর্গ (কালাত আল-শাকিফ) দখল করার দাবি করেছে ইসরাইলি বাহিনী। ইসরাইলের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, দুর্গটি এবং এর আশপাশের সালুকি নদী অঞ্চল এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
ইসরাইলি সামরিক সূত্র জানায়, দুর্গ ও আশপাশের এলাকা দখলের পর সেখানে নিয়ন্ত্রণ আরো সুসংহত করার কাজ চলছে। স্থল ও আকাশ থেকে ব্যাপক গোলাবর্ষণের সহায়তায় সংঘর্ষের পর এই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
আলজাজিরা. রয়টার্স ও এপি জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহ শহরের কাছে অবস্থিত বউফোর্ট দুর্গ ইসরাইলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে গেছে। ইসরাইলের কান ব্রডকাস্টার দুর্গটির ওপর ইসরাইলি পতাকা উড়ানোর ছবি প্রকাশ করেছে। ক্রুসেড যুদ্ধের যুগে নির্মিত এই দুর্গটি লেবানন-ইসরাইল সীমান্ত থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে একটি উঁচু পাহাড়ি চূড়ায় অবস্থিত। তবে ইসরাইলের এই দাবির বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি লেবানন সরকার।
বউফোর্ট দুর্গটি একটি ইউনেস্কো-সুরক্ষিত ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা। ২০০০ সালে লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারের আগে প্রায় ১৮ বছর দুর্গটি ইসরাইলের দখলে ছিল। ১৭ এপ্রিল থেকে কার্যকর যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও ইসরাইল দক্ষিণ লেবাননে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি গত ২৫ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে লেবাননে ইসরাইলের সবচেয়ে গভীর অনুপ্রবেশ। ইসরাইলি সম্প্রচারমাধ্যমে প্রচারিত ছবিতে বউফোর্ট দুর্গের ওপর ইসরাইলি পতাকার পাশাপাশি গোলানি ব্রিগেডের পতাকাও দেখা গেছে।
ছবিগুলো প্রকাশের কিছুক্ষণ আগে ইসরাইলি সেনাবাহিনী বউফোর্ট রিজ ও ওয়াদি আল-সালুকি এলাকায় ‘বৃহৎ পরিসরের সামরিক অভিযান’ শুরুর ঘোষণা দেয় এবং জানায় যে অভিযান আরো নতুন এলাকায় বিস্তৃত হবে। ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের বাহিনী লিতানি নদী অতিক্রম করেছে এবং নদীর উত্তরে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে হামলা সম্প্রসারণ করেছে। গত শুক্রবার ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও নিশ্চিত করেন যে ইসরাইলি সেনারা লিতানি নদী পার হয়েছে। উত্তর সীমান্তে সেনাদের একটি ইউনিট পরিদর্শনের সময় তিনি বলেন, লেবাননের বৈরুত ও বেকা উপত্যকাতেও অভিযান চলছে।
অন্য দিকে ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ দাবি করেন, গোলানি ব্রিগেডের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে বউফোর্ট দুর্গ দখল করা হয়েছে। টেলিগ্রামে দেয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর নির্দেশনা এবং আমার তত্ত্বাবধানে সেনাবাহিনী লেবাননে অভিযান সম্প্রসারণ করেছে, লিতানি নদী অতিক্রম করেছে এবং বউফোর্ট রিজ দখল করেছে। এটি গ্যালিলি অঞ্চলের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানগুলোর একটি।’
কাটজ আরো বলেন, এ অভিযান আগে গোপন রাখা হয়েছিল এবং হিজবুল্লাহকে দুর্বল করা ও ইসরাইলের উত্তর সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে। তবে ইসরাইলের এসব দাবির বিষয়ে এখন পর্যন্ত লেবাননের কর্তৃপক্ষ বা হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
শনিবার লেবাননের সামরিক বাহিনীর জ্যেষ্ঠ সূত্রগুলো তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলুকে জানিয়েছে, ইসরাইলি বাহিনী লিতানি নদী অতিক্রম করেছে। ইসরাইল এই নদীকে তাদের অনানুষ্ঠানিক বাফার জোনের সীমারেখা হিসেবে ঘোষণা করেছে।
বর্তমানে ইসরাইলি বাহিনী নাবাতিয়েহ শহরের উপকণ্ঠে অবস্থান করছে। দক্ষিণ লেবাননের অর্থনীতির জন্য শহরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি পুরো অঞ্চলের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। শহরটি যদি ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তাহলে লেবাননের বিরুদ্ধে ইসরাইলের যুদ্ধ এবং পরবর্তী আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপটে তা হবে একটি বড় ধরনের ঘটনা। ইসরাইলি হামলার বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক প্রতিরোধের কারণে নাবাতিয়েহকে অনেক লেবানিজ প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে দেখেন। দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর টায়ার থেকে আলজাজিরার সাংবাদিক ওবাইদা হিত্তো জানিয়েছেন, ইসরাইল দক্ষিণ লেবাননে তাদের বিমান অভিযান আরো সম্প্রসারণ করছে এবং নাবাতিয়েহ শহরকে ঘিরে ফেলছে, যাতে ভবিষ্যতে শহরটিতে হামলা চালানো যায়।
চলমান শান্তি আলোচনার মধ্যেই দক্ষিণ লেবাননের অন্তত ১০টি গ্রামের বাসিন্দাদের এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে ইসরাইল। একই সাথে তারা তাদের হামলা আরও বিস্তৃত করছে। ইসরাইলি সেনাবাহিনীর আরবি ভাষার মুখপাত্র আভিচাই আদরাই কয়েকটি লেবানিজ গ্রামের বাসিন্দাদের অবিলম্বে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, যারা থেকে যাবেন, তারা নিহত হতে পারেন।
আলজাজিরার ওবাইদা হিত্তো বলেন, নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া মানুষের সামনে এখন বিকল্প খুবই সীমিত। চলমান সঙ্ঘাতে দেশের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশের বেশি, অর্থাৎ প্রায় ১২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যাদের আত্মীয়স্বজনের কাছে থাকার সুযোগ আছে তারা সেখানে আশ্রয় নিচ্ছেন। অন্যরা পার্ক কিংবা উন্মুক্ত জনস্থানে গড়ে ওঠা অস্থায়ী শিবিরে বসবাস করছেন। আমি অনেক পরিবারকে দীর্ঘ সময় ধরে নিজেদের গাড়িতেই বসবাস করতে দেখেছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘এই পরিবারগুলোর একটা অংশ ২০২৩ সাল থেকে একের পর এক বাস্তুচ্যুত হয়ে আসছে।’
বাসিন্দাদের সরিয়ে নেয়ার এই নির্দেশ এমন এক সময় এলো, যখন এর আগের দিন ইসরাইল ও লেবাননের কর্মকর্তারা ওয়াশিংটনে যুদ্ধের স্থায়ী অবসান নিয়ে আলোচনা করেছেন। যুদ্ধটি শুরু হয়েছিল মার্চের শুরুতে, যখন ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির হত্যাকাণ্ডের পর ইসরাইলের বিরুদ্ধে হামলা শুরু করে।



