সেনা কাস্টডিতে রেখেই বিচার চলবে

আ’লীগ সরকারের প্রশ্রয়েই নির্বিঘ্নে চলাফেরা মোজাফফরের : চিফ প্রসিকিউটর

Printed Edition
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যার মূল আসামিকে গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়  : নয়া দিগন্ত
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যার মূল আসামিকে গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয় : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার অন্যতম আসামি এবং ৪৫ বছর ধরে পলাতক থাকা সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোজাফফর হোসেনকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ফেনীতে সঙ্ঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার দেখানোর নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। একই সাথে মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তদন্ত সংস্থাকে সেনা হেফাজতে রেখে তাকে দুই কর্মদিবস জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয়া হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে বিচারপতি নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-২ এই আদেশ দেন। বেঞ্চের অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারক মো: মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

এর আগে সকাল সাড়ে ৯টায় ঢাকা সেনানিবাসের কাস্টডি থেকে মোজাফফরকে ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায় আনা হয় এবং বেলা ১২টা ৫০ মিনিটে ট্রাইব্যুনালের এজলাসে তোলা হয়। এ সময় মোজাফফর হোসেনকে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছিল। চোখেমুখে গভীর কৌতূহল থাকলেও তিনি বারবার এজলাসের এদিক-সেদিক তাকাচ্ছিলেন, তবে নিজের মুখে কোনো কথা বলেননি।

আদালত চলাকালে মোজাফফরের পক্ষে কোনো আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না। ট্রাইব্যুনাল চিফ প্রসিকিউটরের কাছে আসামির কোনো আত্মপক্ষ সমর্থনকারী আইনজীবী আছেন কি না তা জানতে চান। জবাবে চিফ প্রসিকিউটর জানান, তার পক্ষে এখনো কোনো আইনজীবী আনুষ্ঠানিকভাবে ওকালতনামা জমা দেননি; তবে বিচারিক বিধান অনুযায়ী আসামি চাইলে যেকোনো আইনজীবী নিয়োগ করার পূর্ণ সুযোগ পাবেন।

আদালতের আদেশ শেষে চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের সামনে আসামির রাজনৈতিক আশ্রয় ও অতীতের চালচিত্র তুলে ধরেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি অভিযোগ করেন, জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের মতো ভয়াবহ অপরাধে অভিযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও মোজাফফর হোসেন দীর্ঘ ৪৫ বছর এক দেশ থেকে আরেক দেশে অবাধে যাতায়াত করেছেন।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘তিনি দেশে এসেও নির্বিঘেœ চলাফেরা করেছেন। বাংলাদেশে থাকা অবস্থায় তিনি নিয়মিত তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে টেলিফোনে যোগাযোগ রক্ষা করতেন এবং রাজধানীর অত্যন্ত অভিজাত এলাকায় বসবাস করতেন। সরকারের সরাসরি প্রশ্রয় বা সংশ্লিষ্টতা না থাকলে দেশের একজন চিহ্নিত পলাতক আসামি কিভাবে সরকারের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদের সাথে এমন সুসম্পর্ক রেখে চলতেন, তা সহজেই অনুমান করা যায়। আমাদের প্রাথমিক ধারণা, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের যোগসাজশেই তিনি এই সুরক্ষা পেয়েছেন এবং সেই শক্তির ওপর ভর করেই জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানকালে ফেনী অঞ্চলে সঙ্ঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।

তিনি আরো জানান, এক-এগারোর সময়ের প্রভাবশালী কর্মকর্তা ও পরবর্তীতে ফেনী-৩ আসনের সংসদ সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর মতো দুষ্কৃতকারীদের সাথেও মোজাফফরের দীর্ঘদিনের গভীর নেটওয়ার্ক ও সুসম্পর্ক ছিল, যা জুলাই ট্র্যাজেডির সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে কাজে লাগানো হয়েছিল।

চিফ প্রসিকিউটর স্পষ্ট করে জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং সেনাবাহিনীর জেনারেল কোর্ট মার্শালের বিচারপদ্ধতি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও স্বাধীন। তিনি বলেন, ‘জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় সেনা আইনেই তার বিচার প্রক্রিয়া চলবে, যার সাথে আমাদের ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রমের কোনো জটিলতা নেই। আমাদের মূল ফোকাস হলো বিগত ১৬ বছরের আওয়ামী শাসন আমলে এবং বিশেষ করে চব্বিশের জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানকালে মোজাফফরের মানবতাবিরোধী অপরাধে কী ধরনের সম্পৃক্ততা ছিল তা উন্মোচন করা।’

সেনা কাস্টডি ও স্থানান্তর প্রক্রিয়ার বিস্তারিত তুলে ধরে আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাস্টডিতে ছিলেন এবং সেখান থেকেই তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর কাস্টডি সংক্রান্ত অভ্যন্তরীণ বিবরণ দেয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয় এবং এটি আমাদের এখতিয়ারভুক্তও নয়। তবে আমরা সেনাবাহিনীর এডজুটেন্ট জেনারেলের দফতর বরাবর লিখিত আবেদনের (রিকুইজিশন) মাধ্যমেই তার উপস্থিতি নিশ্চিত করেছি। ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম শেষে তাকে আবার সেখানে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। মামলার তদন্তের প্রয়োজনে যেদিনই আমাদের জিজ্ঞাসাবাদের দরকার হবে, আমরা একইভাবে সেনাকর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানিয়ে তাকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করব এবং কাজ শেষে পুনরায় সেনা কাস্টডিতেই ফেরত পাঠানো হবে।’

এর আগে গত সোমবার (২০ জুলাই) এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও নিশ্চিত করেন যে, মোজাফফরের বিচার নিশ্চিত করতে সেনা আইনে জেনারেল কোর্ট মার্শালের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। পরবর্তীতে ২১ জুলাই প্রসিকিউশনের আবেদনের প্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনাল তার বিরুদ্ধে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট জারি করলে গতকাল তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে জুলাই গণহত্যার মামলায় গ্রেফতার দেখানো হলো।