জুলফিকার আলী পীরগঞ্জ (ঠাকুরগাঁও)
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলায় দীর্ঘ ছয় মাস ধরে ২৮টি কমিউনিটি কিনিকে প্রয়োজনীয় ওষুধ না থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মানুষ। একসময় এসব কিনিকে সাধারণ রোগের জন্য বিভিন্ন ধরনের ওষুধ বিনামূল্যে পাওয়া গেলেও এখন অধিকাংশ কিনিকের আলমারি প্রায় খালি। বর্তমানে গর্ভবতী নারীদের জন্য সীমিত পরিমাণে আয়রন ও অ্যান্টাসিড ট্যাবলেট ছাড়া কার্যত কোনো ওষুধ নেই বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসার অন্যতম ভরসাস্থল কমিউনিটি কিনিকগুলোতে গিয়ে প্রয়োজনীয় ওষুধ না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরছেন রোগীরা। এতে গ্রামীণ দরিদ্র মানুষ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর প্রতি আস্থাও কমে যাচ্ছে।
উপজেলায় প্রতি ছয় হাজার মানুষের জন্য একটি করে মোট ২৮টি কমিউনিটি কিনিক রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সর্বশেষ গত বছরের আগস্ট মাসে এসব কিনিকে ওষুধ সরবরাহ করা হয়। পরে সীমিত আকারে যে ওষুধ দেয়া হয়েছিল, তা নভেম্বর-ডিসেম্বরের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। চলতি বছরে নতুন করে কোনো ওষুধ বরাদ্দ না পাওয়ায় এই সঙ্কট আরো প্রকট হয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভারপ্রাপ্ত স্টোরকিপার ওমর ফারুক বলেন, আগে নিয়মিত ওষুধ এলেও এখন আগের মতো সরবরাহ পাওয়া যায় না। যা আসে, তা সব কিনিকের মধ্যে ভাগ করে দিতে হয়। সামান্য যে ওষুধ পাওয়া গিয়েছিল, তা কয়েক মাস আগেই শেষ হয়ে গেছে। বীরহলি কমিউনিটি কিনিকে ওষুধ নিতে আসা এক নারী রোগী বলেন, আগে ঠাণ্ডা, জ্বর, কাশি, ব্যথা, গ্যাস, আমাশয়সহ নানা রোগের ওষুধ বিনামূল্যে পাওয়া যেত। এখন ওষুধ চাইলে শুধু বলা হয় ওষুধ নেই। সরকারি ওষুধ ভালো কাজ করত। কিন্তু এখন বারবার এসেও খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে।
একই ধরনের অভিযোগ করেন বৃদ্ধিগাঁও কমিউনিটি কিনিকে আসা নুরজাহান ও আফরোজা। তারা বলেন, গরিব মানুষের জন্য কমিউনিটি কিনিক ছিল বড় ভরসা। শহরে গিয়ে চিকিৎসা নেয়ার মতো সামর্থ্য সব সময় থাকে না। কিন্তু এখন কিনিকে ওষুধ না থাকায় কষ্ট আরো বেড়েছে।
ভাকুরা কমিউনিটি কিনিকে আসা মনিরা খাতুন বলেন, আমরা গরিব মানুষ। বাইরে থেকে টাকা দিয়ে ওষুধ কেনা কঠিন। আগে এখানে বিনা মূল্যে ওষুধ পেতাম। এখন শুধু পরামর্শ নিয়েই ফিরে যেতে হয়।
ওষুধ সঙ্কটের কারণে রোগীদের অসন্তোষের মুখে পড়তে হচ্ছে স্বাস্থ্যকর্মীদেরও। চন্দরিয়া কমিউনিটি কিনিকের সিএইচসিপি বেবী নাজনীন বলেন, প্রায় পাঁচ মাস ধরে কোনো কার্যকর ওষুধ নেই। প্রতিদিন জ্বর, সর্দি, কাশি, ডায়রিয়া ও দুর্বলতার রোগী আসছেন। কিন্তু এসব রোগের ওষুধ না থাকায় রোগীরা হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। অনেকেই ােভ প্রকাশ করছেন। এতে স্বাস্থ্যকর্মীরাও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছেন।
খামার নারায়ণপুর কমিউনিটি কিনিকের স্বাস্থ্যকর্মী আনজুরা জাহান বলেন, ওষুধ না থাকায় রোগীদের স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। গুরুতর রোগীদের হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। গর্ভবতী নারীদের নিয়মিত পরিচর্যার পরামর্শ ও আয়রন ট্যাবলেট দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে তাদের কিনিকে শুধু আয়রন ট্যাবলেটই রয়েছে।
এ বিষয়ে পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ডা: আবুল বাসার মো: সাইদুজ্জামান বলেন, কয়েক মাস ধরেই ওষুধের সঙ্কট চলছে। কিছু ওষুধ এসেছে, সেগুলো কিনিকগুলোতে ভাগ করে দেয়া হবে। তবে নতুন অর্থবছরের বরাদ্দ ছাড়া পুরো সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়।
ঠাকুরগাঁওয়ের সিভিল সার্জন ডা: আনিসুর রহমান বলেন, কমিউনিটি কিনিকে ওষুধসঙ্কটের বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদফতরকে জানানো হয়েছে। কোরবানির ঈদের আগে বা পরে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।



