পুলক চক্রবর্তী রাঙ্গামাটি
রাঙ্গামাটির দুর্গম পাহাড়ি জনপদে তীব্র জনবল সঙ্কটে কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা। জেলার চারটি ইউনিয়নে এখনো কোনো স্বাস্থ্য সহকারীর পদই সৃষ্টি করা হয়নি। অধিকাংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চলছে মাত্র তিন থেকে চারজন চিকিৎসক দিয়ে। আর জুরাছড়িতে তো একজন চিকিৎসককেই সামলাতে হচ্ছে পুরো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স! চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফ, স্বাস্থ্যকর্মী ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর তীব্র সঙ্কটে ব্যাহত হচ্ছে রোগীসেবা। অথচ এই সীমিত জনবল নিয়েই বছরে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিতে হচ্ছে জেলার হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে।
সম্প্রতি আয়োজিত স্বাস্থ্য বিভাগের এক পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে জেলার স্বাস্থ্যখাতের এই ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কাজল তালুকদার, জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী এবং সিভিল সার্জন ডা: নূয়েন খীসাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও পেশাজীবীরা।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে মেডিক্যাল অফিসার ডা: শওকত আকবর জানান, রাঙ্গামাটি জেলা শহরসহ ১০ উপজেলায় বর্তমানে রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতাল, টিবি ক্লিনিক, স্কুল হেলথ ি ক্লনিক এবং ১০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ মোট ১৪টি প্রতিষ্ঠান চালু রয়েছে। তবে দীর্ঘ দিন ধরে প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই স্বাভাবিক সেবা ব্যাহত হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, রাঙ্গামাটি জেলায় চিকিৎসকের মোট ২৮১টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১৫৫ জন। নার্স ও মিডওয়াইফের ৩৮৮টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৩১৪ জন, যেখানে শূন্য পদের হার ১৯ শতাংশ। এ ছাড়া মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টের ৯৪টি পদের মধ্যে কর্মরত আছেন ৭০ জন এবং সেকমো পদে ৬৬টির বিপরীতে রয়েছেন মাত্র ৩৬ জন।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখা গেছে চতুর্থশ্রেণির কর্মচারীদের ক্ষেত্রে। রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ২৭১টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১৩১ জন। প্রায় অর্ধেক পদ খালি থাকায় হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্নতা ও রোগীসেবায় প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে টিকাদান কর্মসূচি, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম মূলত স্বাস্থ্য সহকারীদের ওপরই নির্ভরশীল। কিন্তু রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার বালুখালী, জুরাছড়ির দুমদুম্যা, বাঘাইছড়ির আমতলী এবং বিলাইছড়ির বড়থলী ইউনিয়নে এখনো কোনো স্বাস্থ্য সহকারীর পদই নেই।
সবচেয়ে নাজুক অবস্থা মাতৃস্বাস্থ্য সেবায়। গর্ভবতী মায়েদের সেবার জন্য মিডওয়াইফের ৪২টি পদ থাকলেও পুরো জেলায় কর্মরত আছেন মাত্র দুইজন! এসডিজি অর্জনে মিডওয়াইফরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও এই খাতে নিয়োগের পরিস্থিতি অত্যন্ত হতাশাজনক। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অন্তত ছয়জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও কাপ্তাই ছাড়া প্রায় সব উপজেলায় রয়েছেন মাত্র তিন থেকে চারজন।
এ ছাড়া চিকিৎসা সরঞ্জামেও রয়েছে চরম সীমাবদ্ধতা। রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতালে ৩টি এক্স-রে মেশিন থাকলেও কাপ্তাই, লংগদু ও রাজস্থলীতে রয়েছে মাত্র একটি করে। এ ছাড়া কাপ্তাই ও বরকল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কোনো আলট্রাসনোগ্রাফি সেবাই নেই। এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ২০২৫ সালে জেলার বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে বহির্বিভাগ চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন চার লাখ ২৬ হাজার ১৭৭ জন এবং জরুরি বিভাগে সেবা পেয়েছেন ৩৮ হাজার ৪১৩ জন। এ ছাড়া এক হাজার ৫৮৮টি স্বাভাবিক প্রসব, ৬১০টি সিজারিয়ান অপারেশন এবং দুই হাজার ১৯৮ জন গর্ভবতী নারীকে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে পার্বত্য অঞ্চলের ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনা করে একটি পৃথক ও সমন্বিত পদায়ন নীতিমালা এবং পাহাড়ি এলাকার দূরত্ব ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিবেচনায় জনবল কাঠামো পুনর্বিন্যাস করে ও নতুন পদ সৃষ্টির দাবি জানানো হয়।



