রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্বের মেরুকরণ

নেপাল বনাম বাংলাদেশ- তরুণরা কী ভাবছে

হারুন ইসলাম
Printed Edition

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তরুণ নেতৃত্বের উত্থান। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি হতাশা, দুর্নীতি ও অকার্যকর শাসনের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে নতুন প্রজন্ম রাজনীতিতে সরাসরি অংশ নিচ্ছে। এর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ এখন নেপাল ও বাংলাদেশ। নেপালে তরুণ নেতৃত্বের দল ক্ষমতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে, আর বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা তরুণ নেতারা নতুন রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তুলছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দুই দেশের পরিস্থিতি ভিন্ন হলেও একটি মিল রয়েছে, তা হলো রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের প্রবল আগমন। তবে প্রশ্ন উঠেছে, নেপালের মতো বাংলাদেশেও কি তরুণ নেতৃত্ব বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটাতে পারবে?

নেপালে তরুণ নেতৃত্বের বিস্ময়কর উত্থান

নেপালে সাম্প্রতিক সংসদ নির্বাচনে তরুণদের নেতৃত্বাধীন দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে। দলটির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত তরুণ নেতা বালেন্দ্র শাহ নির্বাচনে ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন।

২০২৫ সালের গণবিক্ষোভের পর নেপালের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। দুর্নীতি, অর্থনৈতিক সঙ্কট এবং সরকারের নানা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তরুণদের নেতৃত্বে দেশজুড়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ওই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তৎকালীন সরকার পতনের ঘটনাও ঘটে। এরপর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বকে বিপুলসংখ্যক ভোটার সমর্থন জানায়।

নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, আরএসপি সংসদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসনে জয় বা এগিয়ে রয়েছে। এতে ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলগুলোর দীর্ঘদিনের প্রভাব বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি নেপালের রাজনীতিতে প্রজন্মগত পরিবর্তনের সূচনা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নেপালের তরুণ নেতৃত্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, প্রযুক্তি ও আধুনিক রাজনৈতিক প্রচারণাকে দক্ষভাবে ব্যবহার করেছে। তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করার পাশাপাশি তারা দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানকে সামনে এনে জনসমর্থন পেয়েছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট : ছাত্র আন্দোলন থেকে রাজনীতিতে

বাংলাদেশেও তরুণ নেতৃত্বের উত্থানের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। ২০২৪ সালের গণ-আন্দোলনের পর ছাত্রনেতারা সরাসরি রাজনীতিতে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং ২০২৫ সালে গঠন করেন জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি)।

এই দলের নেতৃত্বে রয়েছেন তৎকালীন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, যিনি ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক হিসেবে পরিচিতি পান। পরবর্তীতে তিনি সংসদসদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

এনসিপির নেতাদের দাবি, তাদের লক্ষ্য শুধু ক্ষমতায় যাওয়া নয়; বরং দেশের রাজনৈতিক কাঠামোয় সংস্কার আনা। তাদের মতে, জুলাই আন্দোলন ছিল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা, যা পুরনো রাজনীতির বিকল্প তৈরি করেছে।

নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের লক্ষ্য ছিল শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, বরং একটি ‘ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তন।’ তাই রাজনৈতিক সংস্কার ছাড়া প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।

তরুণ নেতৃত্বের মিল ও অমিল

নেপাল ও বাংলাদেশের পরিস্থিতির মধ্যে কিছু মিল রয়েছে। প্রথমত, দুই দেশেই তরুণ নেতৃত্ব আন্দোলনের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে। নেপালে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন এবং বাংলাদেশে ছাত্রদের গণ-আন্দোলন তরুণদের রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করেছে।

দ্বিতীয়ত, দুই দেশেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রাজনৈতিক সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। তরুণরা অনলাইনে জনমত গঠন ও সংগঠনের কাজ করছে, যা প্রচলিত রাজনীতির তুলনায় দ্রুত ও কার্যকর।

তবে পার্থক্যও রয়েছে। নেপালে নতুন দল ইতোমধ্যে জাতীয় নির্বাচনে বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে এবং ক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক শক্তি এখনও নিজেদের অবস্থান সুসংহত করার পর্যায়ে রয়েছে।

এনসিপির দৃষ্টিভঙ্গি

এনসিপি নেতারা মনে করেন, তরুণ নেতৃত্বের রাজনীতিতে প্রবেশ সময়ের দাবি। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে নতুন প্রজন্ম বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি তৈরি করতে বাধ্য হয়েছে।

দলটির নেতৃবৃন্দ বলেন, রাজনীতিতে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়লে দুর্নীতি কমবে এবং নীতিনির্ধারণে নতুন চিন্তা আসবে। একই সাথে তারা দাবি করেন, তরুণ নেতৃত্ব দেশের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনের দিকে বেশি গুরুত্ব দেবে।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন রাজনৈতিক শক্তির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সংগঠন শক্তিশালী করা এবং দীর্ঘমেয়াদে জনসমর্থন ধরে রাখা।

সামনে কী অপেক্ষা করছে

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে তরুণ নেতৃত্বের উত্থান এখন একটি বাস্তবতা। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন স্থায়ী হবে কি না, তা নির্ভর করবে তরুণ নেতৃত্ব কতটা দক্ষতার সাথে রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা দেখাতে পারে তার ওপর।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ফারহানা ইসলাম বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ছে, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত। কিন্তু বাংলাদেশের এনসিপি এবং নেপালের আরএসপিকে একই কাঠামোয় ফেলে দেখা পুরোপুরি সঠিক নয়। কারণ দুই দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, আন্দোলনের চরিত্র এবং দলগুলোর জন্মের প্রেক্ষাপট এক নয়।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী হারুন বলেন, ‘নেপালের আরএসপি মূলত দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং প্রশাসনিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের এনসিপি গঠনের পেছনে রয়েছে ছাত্র ও তরুণদের আন্দোলনের সরাসরি প্রভাব। আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়া অনেক তরুণ পরে রাজনৈতিক সংগঠন গঠনের পথে এগিয়েছেন।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী ইব্রাহিম সাকিব বলেন, ‘নেপালের আরএসপি আন্দোলনের আগে গঠিত হয়েছিল এবং পরে আন্দোলনের আবহে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের এনসিপি আন্দোলনের পরে গঠিত হয়েছে। ফলে এনসিপি নিজেকে আন্দোলনের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে।’

তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশে তরুণরা রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবি তুলছে, তবে সেই দাবির রাজনৈতিক রূপ ভিন্ন ভিন্ন দেশে ভিন্নভাবে প্রকাশ পাচ্ছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাকিব বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের উত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। বাংলাদেশ, নেপালসহ অনেক দেশেই তরুণদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়ছে। তারা শুধু ভোটার হিসেবে নয়, রাজনৈতিক নেতৃত্বেও ভূমিকা রাখতে চাইছে। নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান সেই পরিবর্তনেরই প্রতিফলন।’

তিনি আরো বলেন, আন্দোলন থেকে জন্ম নেয়া দলগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের সংগঠন শক্তিশালী করা এবং জনগণের আস্থা ধরে রাখা।

বিশ্লেষকদের মতে, নেপালের আরএসপি মূলত প্রশাসনিক সংস্কার, দুর্নীতি দমন এবং স্বচ্ছ শাসনব্যবস্থার দাবিকে সামনে রেখে রাজনীতি করছে। দলটির প্রতিষ্ঠাতা টেলিভিশন সাংবাদিক রবি লামিছানে নতুন প্রজন্মের ভোটারদের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।

অন্যদিকে বাংলাদেশের এনসিপি নিজেদেরকে একটি গণ-আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরছে। দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বিভিন্ন বক্তব্যে বলেছেন, এই দল তরুণদের আকাক্সক্ষা এবং গণ-আন্দোলনের চেতনা থেকে গড়ে উঠেছে।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, নেপাল ও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাবলি দেখিয়ে দিয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নতুন প্রজন্ম এখন আর দর্শক নয়; তারা সরাসরি রাজনৈতিক মঞ্চের কেন্দ্রেই অবস্থান করছে।