কুষ্টিয়ায় তুলাচাষে বাম্পার ফলন বাজারমূল্যে হতাশ চাষিরা

Printed Edition
কুষ্টিয়ায় তুলাচাষে বাম্পার ফলন বাজারমূল্যে হতাশ চাষিরা
কুষ্টিয়ায় তুলাচাষে বাম্পার ফলন বাজারমূল্যে হতাশ চাষিরা

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি

দেশের অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল তুলাচাষের জন্য খ্যাত কুষ্টিয়ার দৌলতপুর অঞ্চল। চলতি মৌসুমে এখানে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং উচ্চ ফলনশীল জাতের তুলা চাষ করায় এবার বাম্পার ফলন পেয়েছেন চাষিরা। কিন্তু ফলনের এই সাফল্য যেন আমল পাচ্ছে না বাজারে। ন্যায্যমূল্যের অভাবে চাষিরা এখন হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন। উৎপাদন খরচের তুলনায় দাম না পাওয়ায় লোকসানের শঙ্কায় রয়েছেন তারা।

সীমান্তবর্তী দৌলতপুর উপজেলার মাটি ও জলবায়ু তুলাচাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। ফলে প্রতি বছরই এখানে জমজমাট আবাদ হয়। চলতি মৌসুমে কুষ্টিয়া জেলায় মোট দুই হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে তুলাচাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল, যার মধ্যে দুই হাজার ৪৩৪ হেক্টর জমিই ছিল শুধু দৌলতপুর উপজেলায়। তুলা উন্নয়ন বোর্ডের সহায়তায় চাষিরা এ বছর রূপালি-১, হোয়াইট গোল্ড-১ ও হোয়াইট গোল্ড-২-এর মতো হাইব্রিড ও উচ্চ ফলনশীল জাতের তুলা চাষ করেছেন। ফলনও এসেছে রেকর্ড পরিমাণ। প্রতি বিঘায় ১০ থেকে ১২ মণ তো বটেই, কোনো কোনো জমিতে ১৫-১৬ মণ পর্যন্ত তুলা পেয়েছেন কৃষক।

তবে তুলার এই হাসি ফিকে হয়ে গেছে বাজারের চিত্র দেখে। গত বছর প্রতি মণ তুলা বিক্রি হয়েছে চার হাজার টাকায়, আর এ বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ৮৪০ টাকায় (প্রতি কেজি ৯৬ টাকা)। অথচ উৎপাদন খরচ অনেকটাই বেড়েছে।

দৌলতপুরের ধর্মদহ গ্রামের তুলাচাষি মোস্তাক আহমেদ জানান, গত বছরের তুলনায় সার ও কীটনাশকের দাম দ্বিগুণ বেড়েছে। শুধু তুলা তোলার খরচই এখন বিঘাপ্রতি ৯ হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। সব মিলিয়ে প্রতি বিঘা জমিতে তুলা চাষে খরচ পড়েছে ২৫ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। তিনি বলেন, ‘সাত-আট মাস লালন-পালনের পর ফলন ভালো হয়েছে, কিন্তু বাজারে সেই অনুযায়ী দাম পাচ্ছি না। খরচ তুলতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।’ আরেক চাষি নাহারুল ইসলামও হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘দীর্ঘদিন পরিশ্রম করে যে ফলন পেয়েছি, তার সঠিক মূল্য না পেলে আগামীতে তুলা চাষে আর উৎসাহ পাব না।’

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজার ও ভোক্তাপণ্যের দামের সাথে সমন্বয় করেই এ বছর তুলার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। আল-মদিনা জিনিং মিলের কর্মকর্তা মো: ইমন হাসান বলেন, ‘কুষ্টিয়ার তুলার আঁশের গুণগত মান ভালো হওয়ায় এ অঞ্চলের তুলার চাহিদা বেশি। হাটে বস্তাভর্তি তুলার আর্দ্রতা পরীক্ষা করে দাম নির্ধারণ করা হয়, যা চাষিদের জন্য স্বচ্ছ। কিন্তু গুণগত মান ভালো হওয়া সত্ত্বেও প্রত্যাশিত দাম পাচ্ছি না।’

কুষ্টিয়া জেলার প্রধান তুলা উন্নয়ন কর্মকর্তা কৃষিবিদ শেখ আল মামুন জানান, দৌলতপুর, মিরপুর ও ভেড়ামারা উপজেলায় এবার ব্যাপকহারে তুলাচাষ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রার প্রায় পুরোটাই অর্জিত হয়েছে। তার মতে, চলতি মৌসুমে কুষ্টিয়া জোনে প্রায় ১৫৫ কোটি টাকার তুলা উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। চাষিদের প্রণোদনা, প্রশিক্ষণ, বীজ সরবরাহ ও রোগবালাই ব্যবস্থাপনায় নিয়মিত সহায়তা দেয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

তবে চাষিদের দাবি, প্রণোদনার আওতা বাড়িয়ে সবাইকে এর আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি তুলার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে চাষিরা আরো উৎসাহিত হবেন। এতে দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসলের উৎপাদন বাড়বে এবং দেশের চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে। বাম্পার ফলনকে কাজে লাগাতে এখন চাষিদের চাওয়া শুধু একটাই- উৎপাদনের সাথেই যেন চলতে পারে লাভের হিসাবটাও।