বিশেষ সংবাদদাতা
বিশ্ব অর্থনীতি আবার এক অস্থির সময় পার করছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সঙ্ঘাত শুধু সামরিক উত্তেজনাই নয় বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সূচকগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়- দেশীয় প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার লড়াই এখন সরাসরি বৈশ্বিক ভূরাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ হয়তো হাজার মাইল দূরে, কিন্তু তার প্রভাব বাংলাদেশের বাজার, ব্যাংক এবং সাধারণ মানুষের জীবনে সরাসরি পড়ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে অভ্যন্তরীণ নীতির দক্ষতা ও বৈশ্বিক ঝুঁকি মোকাবেলার সক্ষমতা- দু’টিই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
যদি সঠিক নীতি গ্রহণ করা যায়, তবে এই সঙ্কটই হতে পারে অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী করার সুযোগ। অন্যথায়, বৈশ্বিক অস্থিরতা দেশের প্রবৃদ্ধির গতিকে দীর্ঘমেয়াদে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। অর্থনীতিতে স্ট্যাগফ্লেশন বা মন্দা চক্র সৃষ্টি হতে পারে।
দেশীয় অর্থনীতির চিত্র : প্রবৃদ্ধির ভিত, কিন্তু চাপ বাড়ছে
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরুতে অর্থনীতির কয়েকটি মূল সূচক ইতিবাচক প্রবণতা দেখালেও ভেতরে ভেতরে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। ব্রড মানি (এম২) বেড়েছে ৯.৫৫%; ডোমেস্টিক ক্রেডিট বেড়েছে ১০.৮৭%; সরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে ২৮.১৩%; বেসরকারি খাতে ঋণ মাত্র ৬.১০%। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধির গতি আছে, কিন্তু তা অনেকাংশে সরকারনির্ভর।
এতে মূল সমস্যা হলো- এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে ক্রাউডিং আউট প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে- যেখানে সরকারি ঋণ বাড়লে বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যায়। ফলে কর্মসংস্থান ও উৎপাদন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ব্যাংকিং ও মুদ্রানীতি : নিয়ন্ত্রণ বনাম প্রবৃদ্ধি
ব্যাংকিং ও মুদ্রানীতিতে নিয়ন্ত্রণ ও প্রবৃদ্ধির টানাপড়েন দেখা যায়। এখন পলিসি রেট : ১০%; কল মানি রেট : ৯.৯৪%; আমানত বৃদ্ধি : ১১.১০%। এতে বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্টতই কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রেখেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে- এই নীতির লক্ষ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, তবে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ঋণের খরচ বেড়ে যাচ্ছে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট : ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক অভিঘাত
ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে তিনটি বড় ধাক্কা দিচ্ছে- এর শীর্ষে রয়েছে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা। ইরান বিশ্ব তেলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বাড়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এর প্রভাবে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি; জ্বালানি ভর্তুকির চাপ, পরিবহন খরচ বৃদ্ধিতে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘœ ঘটতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্য ও লোহিত সাগর অঞ্চল বৈশ্বিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রুট। এর ফলে শিপিং খরচ বৃদ্ধি, আমদানি বিলম্ব, রফতানি প্রতিযোগিতা কমে যাওয়া এবং ডলার ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ দেখা যাবে।
যুদ্ধকালীন সময়ে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ মুদ্রার দিকে ঝোঁকে- বিশেষত মার্কিন ডলারের দিকে। এর ফলে টাকার অবমূল্যায়ন ও বৈদেশিক ঋণের চাপ বৃদ্ধি পেতে পারে।
দেশীয় সূচক ও যুদ্ধের প্রভাব : কোথায় মিলছে?
বাংলাদেশের রফতানি ইতোমধ্যে ০.৬১% কমেছে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে চাহিদা কমতে পারে এবং পোশাক খাত (আরএমজি) আরো ঝুঁকিতে পড়বে। আর আমদানি বেড়েছে ৪.১৭%। যুদ্ধের কারণে যদি তেলের দাম বাড়ে- আমদানি ব্যয় আরো বাড়বে আর মূল্যস্ফীতি ৮.৫৮% থেকে আবার বাড়তে পারে।
রেমিট্যান্স : একটি শক্তিশালী ঢাল
রেমিট্যান্স বেড়েছে ২১.৭৫%, যা বড় স্বস্তির জায়গা। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রবাসীরা অর্থনীতিকে এখনো ধরে রেখেছেন। তবে যুদ্ধ দীর্ঘ হলে- কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হতে পারে। বৈদেশিক রিজার্ভ ও বিনিময় হারের ক্ষেত্রেও বিপত্তি দেখা দিতে পারে। এখন রিজার্ভ ৩৩.১৮ বিলিয়ন ডলার আর টাকা অবমূল্যায়ন ০.২৬%। এ অবস্থা আপাতত স্থিতিশীল, কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘ হলে রিজার্ভে চাপ বাড়বে।
সামষ্টিক ঝুঁকি : “স্ট্যাগফ্লেশন” আশঙ্কা?
যদি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে বাংলাদেশ যে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে- উচ্চ মূল্যস্ফীতি; কম প্রবৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ হ্রাস। এটিই “স্ট্যাগফ্লেশন”-এর মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জটিল পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারকদের জন্য কিছু কৌশল গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ রয়েছে- জ্বালানি ভর্তুকি দক্ষভাবে ব্যবস্থাপনা; আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ উৎসাহিত করা। মধ্যমেয়াদি পদক্ষেপে রয়েছে-রফতানি বৈচিত্র্য (আরএমজি নির্ভরতা কমানো) এবং বেসরকারি বিনিয়োগে প্রণোদনা প্রদান। আর দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপে রয়েছে- জ্বালানি উৎস বহুমুখীকরণ এবং বৈদেশিক নির্ভরতা কমানো।



