আ’লীগ না থাকায় নির্বাচনের নিন্দা করলেন হাসিনা

তৃণমূলকে বিপদে ফেলে পতিত আ’লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব বিদেশে

Printed Edition

মনিরুল ইসলাম রোহান

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের নজিরবিহীন পতনের পর তৃণমূলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের বিপদের মুখে ফেলে দিয়ে শীর্ষ নেতৃত্বের টপ টু বটম বিদেশে পালিয়ে গিয়ে নিরাপদ আশ্রয় নেন। সেখানে অনেকের বিলাসী জীবনের খবর এখন সবার জানা। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দীর্ঘ দেড় বছর কেটে গেলেও দলটির প্রধান থেকে শুরু করে শীর্ষ নেতৃত্বের কেউই আর দেশে ফিরে আসেননি এবং বিপদগ্রস্ত নেতাকর্মীদের পাশেও কার্যত তারা দাঁড়ায়নি বলে দলীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে।

এ দিকে পালিয়ে যাওয়া কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ কয়েক দফায় বিদেশ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। কেন্দ্রের ওই নির্দেশনা পালন করতে গিয়ে দেশের ভেতরে থাকা ত্যাগী নেতাকর্মীরা কেউ কেউ জেল খাটছে, কেউ কেউ মামলায় জর্জরিত হয়ে আত্মগোপনে রয়েছে। আবার কেউ কেউ কোনো কূলকিনারা করে উঠতে না পেরে দিশেহারা হয়ে ফেরারি জীবনযাপন করছে। তবুও আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তৃণমূলের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের রাজপথে নামানোর উসকানি দেয়া হচ্ছে এবং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মতো নির্বাচন ঠেকানোর জন্য নেতাকর্মীদের আবেগকে কাজে লাগিয়ে সংগঠিত করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সম্প্রতি এক ফেসবুক পোস্টে পতিত আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন লিখেন- ‘নো বোট, নো ভোট’।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মহানগর আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতা এ প্রতিবেদককে বলেন, সারা দেশে কতজন জেলে গেছে বলা কঠিন। তবে ঢাকার একটি আসনের কথা বলতে পারি। ঢাকা-৪ আসনে ১৭৮ জন জেলে গিয়েছিল। ৭৬ জন জামিন পেয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ দুইবারও জেলে গেছে। আক্ষেপ করে ওই নেতা বলেন, যারা জেলে গেছে ওই অর্থে দলীয়ভাবে কোনো আর্থিক সাহায্য সহযোগিতা আসেনি। তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে যেসব নেতাকর্মীরা গ্রেফতার হয়েছে তাদের পরিবার অনেক কষ্টে আছে, তারা দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে। দল থেকে তাদের খোঁজখবরও নেয়া হয় না। মহানগরের ওই নেতা বলেন, যারা জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে তাদের বেশির ভাগ হতাশ হয়ে আর দলের সাথে যোগাযোগ রাখছে না। মনে হচ্ছে তারা আর কোনো ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আওয়ামী লীগ প্রধান ও ক্ষমতা হারানো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি বিশেষ হেলিকপ্টারে ভারতে পালিয়ে নিরাপদ আশ্রয় নেন। তিনি এখন ভারত সরকারের বিশেষ অতিথি হিসেবে দিল্লিতে অবস্থান করছেন। ক্ষমতা হারানোর পর দেশের অভ্যন্তরেই বেশ কিছুদিন আত্মগোপানে ছিলেন পতিত আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ বেশির ভাগ শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। এরপর পরিস্থিতি বুঝে যশোরের বেনাপোল হয়ে ওবায়দুল কাদেরও ভারতে পাড়ি জমান। তিনি এখন কলকাতায় অবস্থান করছেন। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক ও মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ও মাহবুবউল আলম হানিফ, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, পতিত আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম, অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন ও এস এম কামাল হোসেনসহ ছোটবড় মিলিয়ে অন্তত দুই হাজার নেতা ভারতের কলকাতা, নিউটাউন, ইডেন গার্ডেনের আশপাশে বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করছেন।

কিছুদিন আগে বেলজিয়াম থেকে দিল্লিতে যান পতিত দলটির শীর্ষ নেতা ড. হাছান মাহমুদ। সেখানে তিনি একটি দলীয় সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন। প্রকাশ্যে ওই সংবাদ সম্মেলন ছিল দীর্ঘ ১৭ মাস পর। এ ছাড়াও ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর পতিত দলটির অনেকেই কানাডা, যুক্তরাজ্য, দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে নিরাপদে এবং আয়েশী জীবনযাপন করছেন। যদিও দেশের অভ্যন্তরে থাকা নেতাকর্মীদের অনেকেই মামলায় জর্জরিত হওয়ায় তাদের পরিবার দিশেহারা হয়ে পড়েছে।

এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক ড. আবদুল লতিফ মাসুম নয়া দিগন্তকে বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের কিছুদিন আগেও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন- আওয়ামী লীগ কখনো পালায় না। কিছুদিন পর দেখা গেল ঠিকই ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দলটির প্রধান থেকে শুরু করে শীর্ষ নেতারা কর্মীদের বিপদের মুখে ফেলে বিদেশে পালিয়ে গেলেন। তাদের দেশে থাকা নেতাকর্মীদের কথা একবারও তারা ভাবেননি। এটাই আওয়ামী লীগের ইতিহাস। তিনি আরো বলেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের যেসব নেতাকর্মী দেশের মধ্যে এখনো রয়েছে তাদের কোনোভাবেই উচিত হবে না, বিদেশে বসবাস করা নেতাদের কথায় কোনো উসকানিতে পা দেয়া। বিদেশে পালিয়ে যাওয়া নেতারা কিন্তু আয়েশী জীবনযাপন করছেন। নির্বাচনকে সামনে রেখে বিদেশ থেকে অনেক উসকানি দেয়া হবে, অনেক অর্থের লোভ দেখানো হবে- এভাবে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে রাজপথে নামার কথা বলবে। কিন্তু দেশে থাকা নেতাকর্মীদের বাস্তবতা বোঝা উচিত। অপরাধের জন্য অন্তত অনুশোচনাবোধ থাকা উচিত।

আ’লীগ না থাকায় নির্বাচনের নিন্দা করলেন হাসিনা

নয়া দিগন্ত ডেস্ক জানান, ভারতে নির্বাসিত আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা তার দলের ওপর নিষেধাজ্ঞার পর আসন্ন বাংলাদেশের নির্বাচনের নিন্দা করে বলেছেন, আওয়ামী লীগ দলের বাদ পড়া মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি ‘ােভ আরো তীব্র করবে।’ গত বৃহস্পতিবার সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) প্রকাশিত এক বার্তায় হাসিনা বলেছেন, ‘বর্জনের মাধ্যমে জন্ম নেয়া সরকার একটি বিভক্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে না।’

এপিকে দেয়া এক ই-মেইল বার্তায় হাসিনা বলেন, ‘প্রতিবার যখনই জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত করা হয়, তখন এটি ােভকে আরো তীব্র করে তোলে, প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবৈধ ঘোষণা করে এবং ভবিষ্যতের অস্থিতিশীলতার পরিস্থিতি তৈরি করে।’

তিনি আরো দাবি করেছেন যে, বর্তমান বাংলাদেশ সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে তার দল- প্রাক্তন মতাসীন আওয়ামী লীগকে নির্বাচন থেকে বাদ দিয়ে তার লাখ লাখ সমর্থককে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে।

উল্লেখ্য, হাসিনার শাসনামলে রাতের ভোট নামে পরিচিত তিনটি নির্বাচনে ভোটাররা কার্যত ভোট দিতে পারেনি এবং ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দেখেছে আগের রাতেই তাদের ভোট দেয়া হয়ে গেছে।

ইউনূসের কার্যালয় এপিকে দেয়া এক বিবৃতিতে বলেছে যে, নিরাপত্তাবাহিনী একটি সুশৃঙ্খল নির্বাচন নিশ্চিত করবে এবং কাউকে বলপ্রয়োগ বা সহিংসতার মাধ্যমে ফলাফল প্রভাবিত করতে দেবে না। বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, প্রক্রিয়াটি পর্যবেণের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যবেক এবং মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

গত শুক্রবার, হাসিনা তার মতাচ্যুতির পর দিল্লির এক জনাকীর্ণ প্রেস কাবে প্রথম জনসমাবেশে বলেন যে, ‘ইউনূসের অধীনে বাংলাদেশ কখনো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন উপভোগ করবে না’।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই বক্তব্যের সমালোচনা করে এক বিবৃতিতে বলেছে যে, ভারত তাকে জনসমে ভাষণ দেয়ার অনুমতি দেয়ায় তারা ‘বিস্মিত’ এবং ‘মর্মাহত’।

বাংলাদেশ ভারতকে হাসিনাকে প্রত্যর্পণের জন্য অনুরোধ করে আসছে; কিন্তু নয়াদিল্লি এখনো এই অনুরোধের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।