নিজস্ব প্রতিবেদক
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের পদত্যাগ এবং এমডি ওমর ফারুক খানকে পদে পুনর্বহালসহ সাত দফা দাবিতে সারা দেশে বিক্ষোভ করেছেন গ্রাহকরা। ঢাকায় প্রধান কার্যালয়ের সামনে গতকাল টানা দ্বিতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ করেন তারা।
সকাল ৯টার দিকে ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামে’র ব্যানারে বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড হাতে মতিঝিলের দিলকুশায় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে জড়ো হন। এ সময় সাত দফা দাবি জানান তারা। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে-১. ইসলামী ব্যাংকে অবৈধভাবে নিয়োগকৃত চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমকে পদত্যাগ করতে হবে। ২. ওমর ফারুক খানকে এমডি পদে পুনর্বহাল করতে হবে। ৩. লুটপাটের সাথে জড়িত কেউই ইসলামী ব্যাংকের বোর্ডে থাকতে পারবে না। ৪. ব্যাংক রেজুলেশন অ্যাক্ট থেকে ১৮(ক) ধারা বাতিল করতে হবে। ৫. এস আলমের দখলকৃত মালিকানা ও দেশে থাকা তার সম্পত্তি বিক্রি করে লুট করা অর্থের সমন্বয় করতে হবে। ৬. শুধু ইসলামী ব্যাংক নয়, এস আলম যাতে কোনো ব্যাংকেই ফিরতে না পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে এবং ৭. ইসলামী ব্যাংকসহ সব ব্যাংক লুটকারীদের বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
মানববন্ধন থেকে আব্দুল হান্নান খন্দকার নামে একজন গ্রাহক বলেন, ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে অত্যন্ত সুনামের সাথে গ্রাহকদের আমানত সংরক্ষণ করে আসছে এবং সুদমুক্তভাবে এই ব্যাংকটি বাংলাদেশে পরিচালিত হয়ে আসছে। বিগত স্বৈরাচারী সরকার এই ব্যাংকটিকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে এস আলম গ্রুপকে এর দায়িত্ব দেয়। তারা এই ব্যাংকের অর্থ লুট করে বিদেশে পাচার করে ব্যাংকটিকে ধ্বংসের কিনারে নিয়ে এসেছিল। তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে যখন নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তখন ইসলামপ্রিয় এবং স্বচ্ছ অর্থব্যবস্থায় বিশ্বাসী মানুষরা তাদের যা কিছু আছে তা নিয়ে পুনরায় ইসলামী ব্যাংকে বিনিয়োগ শুরু করেন। ব্যাংকটি যখন আবার তার আগের অবস্থানে ফেরার চেষ্টা করছে এবং নিজের শক্তিতে ব্যাংকিং পরিচালনা করছে, ঠিক তখনই একটি কুচক্রী মহল ব্যাংকটিকে আবারও ধ্বংস করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এই গ্রাহক আরো বলেন, খুরশিদ আলমকে এই ব্যাংকের চেয়ারম্যান করে আবারো ব্যাংকটিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে সাধারণ মানুষ এবং আমানতকারীরা এই ব্যাংককে আর লুণ্ঠনকারীদের হাতে ছেড়ে দেবে না।
আবুল খায়ের আজাদ নামে আরেকজন গ্রাহক বলেন, গতকাল আমাদের শান্তিপূর্ণ মানববন্ধনে বিনা উসকানিতে পুলিশের চালানো হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। তিনি বলেন, ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ অত্যন্ত সুকৌশলে ইসলামী ব্যাংক দখল করেছিল। বর্তমান চেয়ারম্যান (খুরশীদ আলম), যিনি জুলাই বিপ্লবের সময় পালিয়ে গিয়েছিলেন, তাকে পুনরায় নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তিনি ফ্যাসিস্টের দোসর। আমরা অবিলম্বে তার পদত্যাগ চাই। এই গ্রাহক বলেন, ইসলামী ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর এবং ডেপুটি গভর্নরদের সহযোগিতায় এই অর্থ পাচার হয়েছে এবং তারা এই টাকার ভাগীদার ছিলেন। তিনি আরো বলেন, জুম মিটিংয়ের মাধ্যমে গতকাল এমডির পদ থেকে সরিয়ে দেয়া ওমর ফারুক একজন গ্রাহকবান্ধব অফিসার। তাকে অবিলম্বে স্বপদে বহাল করার দাবি জানান তিনি।
ইসলামী ব্যাংক একটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক এবং এই ব্যাংকে তিন কোটি গ্রাহকের আস্থা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই ব্যাংকের মূল্যবোধ রক্ষা করার জন্য দুর্নীতিবাজদের হাত থেকে ব্যাংকটিকে মুক্ত করতে হবে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকের সচেতন গ্রাহক ও কর্মীরা আন্দোলন চালিয়ে যাবে।
এ দিকে গতকালও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ জলকামান, সাঁজোয়া যান এবং অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করে।
দেশজুড়ে গ্রাহকদের মানববন্ধন
দেশের ব্যাংক খাতে সাম্প্রতিক অস্থিরতা, ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ, পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন এবং গ্রাহকদের আমানতের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে দেশের বিভিন্ন জেলায় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকরা। মঙ্গলবার রাজশাহী, কুষ্টিয়া, খুলনা, কিশোরগঞ্জ, ঝালকাঠি, কক্সবাজার, বগুড়া, চাঁদপুর, কুমিল্লা, নীলফামারী, যশোর, মাগুরা, পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া, মুন্সীগঞ্জ, দিনাজপুর, সাভার ও সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় এসব কর্মসূচি পালিত হয়।
কর্মসূচিগুলোতে গ্রাহকরা ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান খুরশিদ আলমের নিয়োগ বাতিল, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খানকে পুনর্বহাল, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, গ্রাহকদের আমানতের নিরাপত্তা, সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি জানান। একই সাথে ব্যাংক খাতে লুটপাট, অর্থপাচার, অবৈধ হস্তক্ষেপ ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের অভিযোগ তুলে তা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান তারা।
রাজশাহী ব্যুরো জানায়, ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যানের অপসারণ দাবিতে মঙ্গলবার দুপুরে নগরীর আলুপট্টি মোড়ে মানববন্ধন করে ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক ফোরাম। এতে গ্রাহক, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীরা অংশ নেন। বক্তারা অভিযোগ করেন, গ্রাহকদের স্বার্থ উপেক্ষা করে বিতর্কিত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তারা নতুন চেয়ারম্যানকে অপসারণ করে ব্যাংককে জনগণের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার দাবি জানান।
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, দুপুর ১২টার দিকে শহরের এনএস রোডে ইসলামী ব্যাংক কার্যালয়ের সামনে ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে মানববন্ধন হয়। বক্তারা অভিযোগ করেন, এস আলমের প্ররোচনায় ব্যাংকের ওপর হস্তক্ষেপ চালানো হচ্ছে। গ্রাহকদের আমানত ও ব্যাংকের স্বাধীন কার্যকারিতা রক্ষায় প্রয়োজনে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন তারা।
খুলনা ব্যুরো জানায়, নগরীর ডাকবাংলো মোড়ে ইসলামী ব্যাংক খুলনা শাখার সামনে মানববন্ধন করে ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক সমন্বয় পরিষদ। মনিরুল ইসলাম লিটনের সভাপতিত্বে ও মো: শফিউল আযমের পরিচালনায় বক্তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে অপসারণ, লুণ্ঠিত অর্থ ফেরত আনা এবং যোগ্য ও সৎ ব্যক্তিদের নিয়ে ইসলামী ব্যাংকের বোর্ড পুনর্গঠনের দাবি জানান।
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, বেলা ১১টায় শহরের বড়বাজারে ইসলামী ব্যাংক শাখার সামনে মানববন্ধন করে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম। কয়েক শ’ গ্রাহক এতে অংশ নেন। বক্তারা খুরশিদ আলমের নিয়োগ বাতিল, সাবেক এমডি ওমর ফারুক খানকে পুনর্বহাল এবং স্বচ্ছ নেতৃত্ব নিশ্চিতের দাবি জানান। তারা বলেন, ইসলামী ব্যাংক একসময় দেশের অন্যতম আস্থাভাজন প্রতিষ্ঠান ছিল; কিন্তু অনিয়ম ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিতর্ক গ্রাহকদের আস্থাহীন করেছে।
ঝালকাঠি জেলা সংবাদদাতা জানান, শহরের কাপুড়িয়া পট্টি সড়কে ইসলামী ব্যাংক শাখার সামনে ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন করে সচেতন গ্রাহক ফোরাম। বক্তারা চেয়ারম্যানের পদত্যাগ, স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত এবং যোগ্য ব্যক্তিকে চেয়ারম্যান নিয়োগের দাবি জানান।
ঈদগাঁও (কক্সবাজার) সংবাদদাতা জানান, কক্সবাজার শহরের বাজার ঘাটায় ইসলামী ব্যাংকের সামনে সচেতন গ্রাহক সমাজের ব্যানারে মানববন্ধনে সহ¯্রাধিক গ্রাহক অংশ নেন। বক্তারা অভিযোগ করেন, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন হস্তক্ষেপে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তারা নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগ বাতিল, সাবেক এমডিকে পুনর্বহাল ও আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানান।
বগুড়া অফিস জানায়, ইসলামী ব্যাংক বগুড়া শাখার সামনে মানববন্ধনে ঢাকায় গ্রাহকদের ওপর পুলিশি হামলার প্রতিবাদ ও খুরশিদ আলমের নিয়োগ বাতিলের দাবি জানানো হয়। মো: শাহীন মিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে বক্তারা দাবি করেন, ২০১৭ সালে ব্যাংক দখলের পর বিপুল অর্থ লুটপাট হয়েছে।
চাঁদপুর প্রতিনিধি জানান, শহরের জে এম সেনগুপ্ত রোডে ইসলামী ব্যাংক কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধনে বক্তারা ব্যাংকে সরকারি হস্তক্ষেপ বন্ধের দাবি জানান। সমাজসেবক মো: জাহাঙ্গীর আলম প্রধানসহ বক্তারা বলেন, বিতর্কিত গোষ্ঠীকে পুনর্বাসনের চেষ্টা ব্যাংকিং খাতের জন্য অশনিসঙ্কেত।
কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, কান্দিরপাড় এলাকায় ইসলামী ব্যাংক শাখার সামনে সচেতন গ্রাহক ফোরামের মানববন্ধনে ব্যাংকের স্বকীয়তা, স্থিতিশীলতা ও শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা বজায় রাখার দাবি জানানো হয়। অ্যাডভোকেট নাছির আহম্মদ মোল্লার সভাপতিত্বে ড. মাওলানা হিফজুর রহমান, অধ্যাপক ড. সাইফুল হক চৌধুরীসহ অনেকে বক্তব্য দেন।
নীলফামারী প্রতিনিধি জানান, দুপুর ১২টায় ইসলামী ব্যাংক শাখার সামনে সচেতন গ্রাহক ফোরামের উদ্যোগে মানববন্ধন হয়। বক্তারা সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো: খুরশিদ আলমের পদত্যাগ দাবি করেন।
যশোর অফিস জানায়, ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের মানববন্ধন ও বিক্ষোভে বক্তারা খুরশিদ আলমের নিয়োগ প্রত্যাখ্যান করেন। রাশেদুজ্জামান রতনের সভাপতিত্বে বক্তারা ঢাকায় গ্রাহকদের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানান এবং ইসলামী ব্যাংককে আর লুটেরাদের হাতে যেতে দেয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দেন।
মাগুরা প্রতিনিধি জানান, সরকারি কলেজ রোডে ইসলামী ব্যাংকের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করে গ্রাহক ফোরাম। বক্তারা পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং এস আলম গ্রুপের নিয়োগ দেয়া কর্মকর্তাদের অপসারণের দাবি জানান।
মঠবাড়িয়া প্রতিনিধি জানান, পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় ইসলামী ব্যাংক শাখার সামনে গ্রাহকরা মানববন্ধন করেন। বক্তারা খুরশিদ আলমের নিয়োগ বাতিল, সাবেক এমডি ওমর ফারুককে পুনর্বহাল, এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলমকে দেশে ফিরিয়ে বিচারের মুখোমুখি করা এবং পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের দাবি জানান।
মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, হাটলক্ষ্মীগঞ্জ এলাকায় ইসলামী ব্যাংক শাখার সামনে মানববন্ধনে বক্তারা ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা ধ্বংসের ষড়যন্ত্র বন্ধ ও সাবেক এমডি ওমর ফারুককে পুনর্বহালের দাবি জানান।
দিনাজপুর প্রতিনিধি জানান, শহরের লিলির মোড়ে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের মানববন্ধনে খুরশিদ আলমের পদত্যাগ, ওমর ফারুক খানকে পুনর্বহাল এবং এএমডি কামাল উদ্দিন জসীমকে বহিষ্কারের দাবি জানানো হয়। বক্তারা ঢাকায় গ্রাহকদের ওপর পুলিশি হামলার নিন্দা জানান।
সাভার প্রতিনিধি জানান, সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মানববন্ধনে খুরশিদ আলমকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পদত্যাগের আলটিমেটাম দেন বক্তারা। তারা গ্রাহকদের আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও অবৈধ দখলদারদের অপসারণের দাবি জানান।
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ইসলামী ব্যাংক সিরাজগঞ্জ শাখার সামনে মানববন্ধনে খুরশিদ আলমের নিয়োগ বাতিলের দাবি জানানো হয়। অ্যাডভোকেট রুহুল আমিন সিদ্দিক খসরুর সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন ড. খ ম আব্দুর রাজ্জাক, অ্যাডভোকেট আবু তালেব আকন্দ, অধ্যাপক শাহীন রেজা, ইকবাল হোসেন সিদ্দিকী ও তাহেরা খাতুন প্রমুখ।



