- সাবেক বিচারপতি মানিক, জিয়াউল আহসান ও সোহায়েলকে জিজ্ঞাসাবাদ
- আদালতের কাছে আরো সময় চায় পিবিআই
- ডিএনএ টেস্টেও শনাক্ত হচ্ছে না খুনিরা
‘মারামারি করে বাবাকে মেরে ফেলেছিল, হাত পা ধরে, হাত পাটা ধরে রাখছে, দুইটা টুর (চোর) ছিল। আগে বাবাকে মারছে, ওই যে ছুরি ছিল, পিস্তলটাও ছিল, আমাকে গুলি করতে চেয়েছিল’। কথাগুলো সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরোয়ার ও মেহেরুন রুনির একমাত্র সন্তান মাহির সরোয়ার মেঘের। সে দিনের কোমলমতির মেঘের দেয়া এ বক্তব্যই চোখের সামনে মা-বাবাকে হত্যার লোমহর্ষক ঘটনায় বর্ণনা আদালতে জবানবন্দী হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে।
১৪ বছর আগে নৃশংসভাবে সংঘটিত সাগর-রুনি হত্যার বিচার আলোর মুখ দেখেনি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। ১৮ মাস পার করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠনের পর মামলাটির আলোর মুখ দেখবে সাংবাদিক নেতারাও আশাবাদী ছিলেন। কিন্তু তদন্তে কোনো আশানুরূপ তথ্য না পাওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করেছেন তারা।
পিবিআইয়ের ভাষ্য, চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের যে আলামত তাতে নিঃসন্দেহে তাদের হত্যা করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই দম্পতি হত্যার শিকার হলেন তা বের করতে না পারায় খোদ পিবিআইয়ের গঠিত ‘টাস্কফোর্সের’ ছয় সদস্য হতাশ। এ মামলার তদন্তে খুনিরা গ্রেফতার হবে কি না তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই পিবিআইয়ের কাছে। ফলে খুনিদের যেখানে শনাক্ত করা যায়নি তখন এ মামলার ভবিষ্যৎ যে অন্ধকার তা অকপটে শিকার করেছেন সাগরের মা। তিনি বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি গভীর শিকড়ের। চাইলেই আসামিদের গ্রেফতার সম্ভব নয়। এর চেয়ে কত গভীর ঘটনায় আসামিরা গ্রেফতার হচ্ছে, কই আমার আদরের সন্তান সাগর ও তার স্ত্রী রুনির খুনিরা কই?
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন সময় প্রশ্ন উঠেছিল তৎকালীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নথি এই দম্পতির কাছে রয়েছে। তারা গভীরভাবে অনুসন্ধান করে রিপোর্ট করার পর সরকারের টনক নড়াবেন। এ জন্যই সাগর-রুনিকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। তবে পিবিআইয়ের তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, আমরাও মামলাটি তদন্ত পাওয়ার পর বিভিন্নভাবে তদন্ত করেছি। এই মামলার আদেশ দেয়া বিচারক যিনি ছিলেন সেই সাবেক বিচারপতি মানিক, ওই সরকারের আমলের প্রভাবশালী সেনাকর্মকর্তা সাবেক এনটিএমসির চেয়ারম্যান জিয়াউল আহসান এবং চট্টগ্রামের সাবেক চেয়ারম্যান সোহায়েলসহ ৮৩ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকেও এই হত্যাকাণ্ডের কোনো ক্লু উদঘাটন হয়নি।
পিবিআইয়ের তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, থানা পুলিশ, ডিবি, র্যাবের তদন্তের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নির্দেশে মামলাটি পিবিআইয়ের কাছে তদন্ত আসে। চাঞ্চল্যকর এই জোড়া খুনের ঘটনায় ছয় জনের একটি ‘টাস্কফোর্স’ গঠন করা হয়। এই টিমের প্রধান পিবিআইয়ের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মুস্তফা কামাল। র্যাবের দেয়া ডকেটে এখন পর্যন্ত ২৫ জনের ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে দু’জনের ডিএনএ পাওয়া গেলেও যে ২৫ জনের ডিএনএ করা হয়েছে তাদের সাথে মিল নেই। তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলেন, সাগর-রুনির লাশের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাদের শরীরে কোনো মদ বা অ্যালকোহলের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। দু’জনই রাতের খাবার খেয়েছেন। একই খাবার খেয়েছেন তারা। ভাত ও ডিমের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ৭ মে দিন ধার্য করেছেন ঢাকার একটি আদালত। এ নিয়ে ১২৫ বারের মতো প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সময় পেল তদন্ত সংস্থা।
এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত টাস্কফোর্সের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মো: মুস্তফা কামাল বলেন, মামলার ভবিষ্যতে কী হবে, জানি না। আমাদের তদন্তে এখনো কোনো অগ্রগতি নাই। আমরা হত্যার মোটিভ এবং আসামিদের এখনো চিহ্নিত করতে পারিনি। আমরা হতাশ। সন্তান হত্যার বিচার পাওয়ার বিষয়ে হতাশ সাগরের মা সালেহা মনির বলেন, এই মামলার আর কী হবে। আল্লাহর কাছে বিচার দিয়ে রেখেছি। কোনো সরকারই কিছু করবে বলে মনে হয় না।
মেঘের আরেকটি জবানবন্দী আদালতের কাছে জমা দেন তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ওই বক্তব্য এক সাংবাদিকও নিয়েছিলেন। মেঘ বলেন, মার রুমে ছিলাম দুইটা টুর (চোর) ছিল, পিস্তল ছিল, বলছে! গুলি করে মেরে ফেলবে বলছে। রান্নাঘর থেকে বের হয়ে গেছে, আমি দরজা খুলে দিয়েছি। নানুকে ফোন করি, নানু প্রথম আসে। রিমনকে নানু ফোন করে চোরটাকে মায়ের রুমে সকালে দেখেছি।
অগ্রগতি নেই : ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেয়া প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ৩০ সেপ্টেম্বর উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে ছয় সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন করে। টাস্কফোর্সের প্রধান করা হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো: মুস্তফা কামালকে। এই টাস্কফোর্সকে ছয় মাসের মধ্যে মামলার তদন্ত শেষ করে উচ্চ আদালতে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছিল। সেই হিসেবে গত বছরের মার্চে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু সময়মতো প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি টাস্কফোর্স। এরপর এই কমিটি আরো ছয় মাস সময় নিলেও আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে পারেনি। এরপর গত বছরের ২৩ অক্টোবর তারা উচ্চ আদালতে আবেদন জানিয়ে আরো ছয় মাস সময় নেয়। গতকাল বৃহস্পতিবারও তদন্তের অগ্রগতি শেষ করতে পারেনি। তারা আরো সময় নিয়েছে আদালত থেকে।
কোথায় আটকে আছে তদন্ত? : এই মামলায় বিভিন্ন সময় মোট আটজনকে গ্রেফতার দেখানো হয়। তবে পিবিআই তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর নতুন কাউকে আটক করেনি। যে আটজনকে আটক করা হয়েছে তাদের মধ্যে ছয়জন এখনো কারাগারে আছেন। বাকিরা জামিনে রয়েছেন। আটকদের দুইজন বাদে সবাই গ্রিল কাটা চোর ও ডাকাত দলের সদস্য। একজন বাসার দারোয়ান এবং আরেকজন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। ওই আটজনসহ মোট ২৫ জনের ডিএনএ পরীক্ষা করিয়েছিল র্যাব। ঘটনাস্থল থেকে তারা সাগর-রুনি ছাড়াও আরো দুইজন পুরুষের ডিএনএ পায়। কিন্তু যে ২৫ জনের ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়েছে তাদের সাথে অজ্ঞাত ওই দুই পুরুষসহ সন্দেজভাজন কারো ডিএনএ ম্যাচ করেনি।
তদন্তসংশিষ্ট কিছু ডকুমেন্টে দেখা যায়, দুইজন অজ্ঞাত পুরুষের ডিএনএ ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে সেই ডিএনএ’র ভিত্তিতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাদের ছবি আঁকা সম্ভব। সেই ছবি আঁকার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠানকে অর্থও পরিশোধ করেছিল র্যাব। কিন্তু সেই ছবি আর আসেনি। এর বাইরে হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি, বঁটি, ছুরির বাঁট, সাগরের হাত বাঁধা ওড়না ও রুনির পরনের কাপড় ডিএনএ পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পরীক্ষাগারে পাঠিয়েছিল র্যাব। পাশাপাশি সাগর-রুনির ভাড়া বাসার ভাঙা গ্রিলের অংশ, ঘটনাস্থলে পাওয়া চুল, ভাঙা গ্রিলের পাশে পাওয়া মোজা, দরজার লক, দরজার চেইন ও ছিটকিনির ডিএনএ পরীক্ষার জন্য সেখানে পাঠানো হয়। এখন পর্যন্ত এই মামলায় বিভিন্ন পর্যায়ে তদন্তকারীরা ১৮৩ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। কিন্তু কোনো পর্যায়েই তদন্তকারীরা হত্যার মোটিভ এবং জড়িতদের ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারেনি।
এ প্রসঙ্গে পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো: আবু ইউসুফ গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর এখনোÍ খুনিদের শনাক্ত করতে পারিনি। তিনি বলেন, খুনিরা যে দুইটি ছুরি রেখে গেছে লাশের পাশে ওই ছুরি দিয়ে এমন নৃশংস ঘটনা ঘটানো সম্ভব নয়। এছাড়াও খুনিরা বাথরুমের যে জানালা ভেঙে বাইরে যাবে সেটিও সন্দেহজনক। নিচে দাঁড়োয়ান ছিল তারাও খুনিদের দেখেনি। সব মিলিয়ে মামলাটি ঘুরপাক খাচ্ছে তদন্তে। আমরা আদালতের কাছে আরো সময় চেয়েছি। শেষ পর্যন্ত কী করতে পারব তা এখনো বোঝা যাচ্ছে না।



