রাজধানীর বাসস্ট্যান্ডে ত্যাগের মহিমা ও সহমর্মিতার প্রতিচ্ছবি

গন্তব্যের পথে ইফতার

Printed Edition
সায়দাবাদ বাস টার্মিনালে ইফতার : নয়া দিগন্ত
সায়দাবাদ বাস টার্মিনালে ইফতার : নয়া দিগন্ত

হাবিবুল বাশার

পবিত্র রমজান আত্মশুদ্ধি ও ত্যাগের মাস। রাজধানীর ব্যস্ততম বাসস্ট্যান্ডগুলোতে এই ত্যাগের চিত্র অত্যন্ত জীবনমুখী ও মানবিক। ইফতারের সময় ঘনিয়ে এলেও হাজারো মানুষের গন্তব্যে পৌঁছানোর ব্যাকুলতা আর রাজপথেই ইফতার সেরে নেয়ার প্রস্তুতি এক অন্যরকম আবহের সৃষ্টি করে। বিকেলে গুলিস্তান ও সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড ঘুরে দেখা যায় যাত্রী, চালক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কর্মব্যস্ত ইফতারের চিত্র।

যাত্রী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, যানজট আর দীর্ঘ পথযাত্রার কারণে অধিকাংশ সময়ই তাদের ইফতার করতে হয় চলন্ত গাড়ির ভেতরে। বিলাসিতা নয়; বরং ক্ষুধা মেটানো আর রোজা পূর্ণ করাই থাকে মূল লক্ষ্য। যাত্রীরা জানান, ইফতার হিসেবে তাদের প্রধান অনুষঙ্গ হলো সাধারণ পানি, বনরুটি এবং কলা।

১০০ টাকায় ‘ইফতার প্যাকেজ’ ও এক খুদে বিক্রেতা

স্ট্যান্ডের ভিড়ের মধ্যে দেখা মিলল এক কিশোরের, যে ঝুড়ি ভরে বিক্রি করছে ‘ইফতার প্যাকেজ’। মুড়ি, ছোলা, খেজুর, আলুর চপ, বেগুনি আর হাফ লিটারের এক বোতল পানি, সবমিলিয়ে দাম মাত্র ১০০ টাকা। এই প্যাকেটটি গন্তব্যে ফেরা মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয়। সিএমএইচ থেকে আসা এক যাত্রী সেই কিশোরের কাছ থেকে দু’টি প্যাকেট কিনে বলেন, ‘আমরা দু’জন হাসপাতাল থেকে আসছি। গাড়ি এখনই ছেড়ে দেবে, তাই ইফতারটা কিনে নিলাম। পথেই হয়তো সময় হয়ে যাবে, গাড়িতেই খেয়ে নেব।’

যাত্রী ও বিক্রেতা

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রফিকুল ইসলাম বাসের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে বলছিলেন, ‘প্রতিদিন অফিস শেষ করে এই লাইনে দাঁড়াতে হয়। অধিকাংশ দিনই ইফতারের সময়টা গাড়ির সিটেই কাটে। সাথে থাকা এক বোতল পানি আর দুইটা কলা দিয়েই ইফতার সারি। পরিবারের সাথে ইফতার করার ইচ্ছা থাকলেও যানজট সেই সুযোগ দেয় না।’

গাউছিয়া যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা মরিয়ম বেগম বলেন, ‘বাসের জন্য এক ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি। বাসে উঠতে পারলেও তো শান্তি নেই, ভেতরে প্রচণ্ড গরম। পাশে বসা অপরিচিত আপার সাথে একটু মুড়ি ভাগ করে নিই, এটাই আমাদের আনন্দ। রাস্তায় ইফতার করা এখন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।’

ব্যস্ত হাতে টিকিট দিতে দিতে কাউন্টার মাস্টার মো: জসিম বলেন, ‘ইফতারের আগ মুহূর্তে যাত্রীদের চাপ সবচেয়ে বেশি থাকে। তাদের টিকিট দিতে দিতে আমাদের নিজেদের ইফতারের সময় পার হয়ে যায়। আজানের পর কোনোমতে এক ঢোক পানি খেয়ে আবার কাজে বসি। আমাদের জন্য এই কাউন্টারটাই ইফতারের টেবিল।’

গুলিস্তান মোড়ে রাস্তার ধারের ছোট চায়ের দোকানদার বলেন, ‘সারা দিন চা-বিস্কুট বিক্রি করি; কিন্তু নিজে রোজা রাখি। ইফতারের সময় হলে আশপাশের হকার আর টিকিট বিক্রেতারা মিলে আমার দোকানেই বসি। সবাই মিলে অল্প অল্প করে যা আনি, তা-ই মাখিয়ে একসাথে খাই। একা খাওয়ার চেয়ে এই একাত্ম হয়ে ইফতার করাটাই রমজানের আসল শান্তি।’

বাসের ভেতরে গিয়ে দেখা যায় এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্তে অপরিচিত যাত্রীরা একে-অপরের দিকে পানির বোতল বা খেজুর বাড়িয়ে দিচ্ছেন। এই ভ্রাতৃত্ববোধ ও শেয়ারিং যেন যান্ত্রিক ঢাকার কঠোর বাস্তবতাকে এক নিমিষে মানবিক করে তোলে। ত্যাগের এই রমজান এভাবেই আমাদের ধৈর্য ও একে-অপরের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে।