বহুমুখী আয়ে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে কিশোর গ্যাং

কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ কার্যক্রম দিন দিন নতুন মাত্রা পাচ্ছে। সুসংগঠিত অর্থনৈতিক কাঠামো এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ছে তাদের নেটওয়ার্ক। হত্যা, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, ছিনতাই, ফুটপাথ নিয়ন্ত্রণ, পার্কিং নিয়ন্ত্রণ, ইভেন্ট নিয়ন্ত্রণ, অনলাইন প্রতারণা, এমনকি ভাড়াটিয়া খুনি হিসেবেও আবির্ভূত হচ্ছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরাধমূলক উৎস থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা আসায় এই গ্যাংয়ে যুক্ত হচ্ছে বিপথগামী কিশোর-যুবকরা।

আমিনুল ইসলাম
Printed Edition
  • চাঁদাবাজি মাদক বহনসহ হচ্ছে ভাড়াটিয়া খুনি
  • উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ করা প্রয়োজন

বহুমুখী আয়ের উৎসে ভর করে কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ কার্যক্রম দিন দিন নতুন মাত্রা পাচ্ছে। সুসংগঠিত অর্থনৈতিক কাঠামো এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ছে তাদের নেটওয়ার্ক। হত্যা, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, ছিনতাই, ফুটপাথ নিয়ন্ত্রণ, পার্কিং নিয়ন্ত্রণ, ইভেন্ট নিয়ন্ত্রণ, অনলাইন প্রতারণা, এমনকি ভাড়াটিয়া খুনি হিসেবেও আবির্ভূত হচ্ছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরাধমূলক উৎস থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা আসায় এই গ্যাংয়ে যুক্ত হচ্ছে বিপথগামী কিশোর-যুবকরা।

মূলত কাঁচা টাকার লোভেই পরিবার থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া, শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া, বেকার ও হতাশাগ্রস্ত কিশোর-যুবকরা ঝুঁকছে নানা অপরাধে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘অ্যাডভেঞ্চার’ কিংবা এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের নেশায় শিশুরাও হাতে তুলে নিচ্ছে অস্ত্র। ফলে একের পর এক ঘটছে হত্যাসহ নানা অপরাধমূলক ঘটনা। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে কিশোর গ্যাংয়ের সংঘর্ষ এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় সাধারণ মানুষ আতঙ্ক নিয়ে চলাফেরা করেন।

সূত্র মতে, বিগত সরকারের শেষ সময়ে মহানগর ডিবির তৎকালীন প্রধান হারুন অর রশিদ কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রক নেতাদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছিলেন। কোন নেতার ছত্রছায়ায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা এলাকা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, তা চিহ্নিত করার উদ্যোগও নেয়া হয়েছিল। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর সেই তালিকা তৈরির কাজ থেমে যায়। তা ছাড়া ওই সময়ে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের যেসব নেতা কিশোর গ্যাংয়ের নেতৃত্ব দিতেন, তাদের অনেকে পালিয়ে যান বা আত্মগোপনে চলে যান। কিন্তু মাঠে থেকে যায় কিশোর গ্যাংয়ের আগের সেই সদস্যরা। পট পরিবর্তনের পর নতুন নেতৃত্বের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়ে তারা নতুন উদ্যমে আবারো শুরু করেছে অপরাধ কার্যক্রম। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, অপরাধ বিশ্লেষক ও স্থানীয় সূত্র বলছে, এটি আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং তাদের আয়ের উৎস এখন বহুমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে।

গোয়েন্দা তথ্য মতে, কিশোর গ্যাংয়ের প্রধান আয়ের উৎস চাঁদাবাজি ও নিয়ন্ত্রণ বাণিজ্য। ফুটপাথের দোকান, কাঁচাবাজার, বাসস্ট্যান্ড, টেম্পুস্ট্যান্ড, ট্রাক টার্মিনাল, এমনকি নির্মাণাধীন ভবন, সবখানেই তারা ‘নিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠা করে নিয়মিত টাকা আদায় করছে। অনেক এলাকায় ছোট ছোট গ্রুপ নিজেদের মধ্যে এলাকা ভাগ করে নিয়ে এই অর্থ আদায় করে থাকে। যখনই অন্য কোনো গ্রুপ সেখানে ভাগ বসাতে চেষ্টা করে, তখনই শুরু হয় দ্বন্দ্ব, সংঘর্ষ ও রক্তক্ষয়ী হামলা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্থানীয় রাজনৈতিক ছত্রছায়া এবং কিছু অসাধু প্রভাবশালীর প্রশ্রয়ে এসব নিয়ন্ত্রণ বাণিজ্য আরো শক্তিশালী হয়ে উঠছে।

এ ছাড়াও আয়ের বড় একটি অংশ আসে মাদক কারবার থেকে। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা মূলত বড় সিন্ডিকেটের হয়ে ‘রানার’ বা খুচরা বিক্রেতা হিসেবে কাজ করে। ইয়াবা, গাঁজা ছাড়াও কিছু এলাকায় নতুন ধরনের সিনথেটিক মাদক সরবরাহে তাদের সম্পৃক্ততার তথ্য রয়েছে। এতে দ্রুত নগদ অর্থ পাওয়ার সুযোগ থাকায় কিশোররা সহজেই এতে জড়িয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদেরও মাদক পরিবহনে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, কম বয়স হওয়ায় অনেক সময় আইনগত জটিলতা এড়াতে বড় মাদক কারবারিরা কিশোরদের ব্যবহার করে। মোবাইল ফোন ছিনতাই, মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশ চুরি, এমনকি বাসাবাড়িতে ছোটখাটো চুরিও তাদের আয়ের অন্যতম উৎস। ছিনতাইয়ের পর চুরি করা পণ্য দ্রুতই ‘চোরাই মার্কেটে’ বিক্রি করা হয়, যেখানে মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে এসব পণ্য নগদ অর্থে রূপান্তর করা হয়। বিশেষ করে দামি স্মার্টফোন ছিনতাইয়ের পর তা দ্রুত সফটওয়্যার পরিবর্তনের মাধ্যমে বিক্রি করে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে।

প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় একটু লেখাপড়া জানা কিশোর গ্যাং এখন অনলাইন প্রতারণায়ও সক্রিয়। ফেসবুক বা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে ভুয়া পেজ খুলে পণ্য বিক্রির নামে প্রতারণা, মোবাইল ব্যাংকিং ফিশিং, বিকাশ-নগদ অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং, এমনকি গেমিং আইডি বিক্রির ছলনায় অর্থ হাতিয়ে নেয়ার ঘটনা বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা বিদেশী প্রতারণা চক্রের কৌশল নকল করছে। সাইবার অপরাধ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ কিশোরদের একটি অংশ খুব সহজেই এই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

কিছু এলাকায় কিশোর গ্যাং ছোটখাটো অনুষ্ঠান, মেলা বা স্থানীয় ইভেন্টে ‘নিরাপত্তা’ দেয়ার নামে অর্থ আদায় করে। এ ছাড়া পার্কিং নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ গ্যারেজ পরিচালনা বা ট্রাফিক সহায়তার নামে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগও রয়েছে। কোথাও কোথাও ট্রাক, লেগুনা কিংবা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা থেকে দৈনিক ভিত্তিতে চাঁদা তোলার অভিযোগও পাওয়া গেছে।

এ ছাড়াও নতুন একটি প্রবণতা হলো নিজেদের গ্যাংকে ‘ব্র্যান্ড’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। টিকটক, ফেসবুক রিলস বা ইউটিউব শর্টস ব্যবহার করে তারা নিজেদের পরিচিতি বাড়ায়, যা নতুন সদস্য আকর্ষণ এবং ভয়ভীতি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অস্ত্র প্রদর্শন, বাইক শোডাউন, মারামারির ভিডিও কিংবা প্রতিপক্ষকে হুমকি দিয়ে ভিডিও প্রকাশের প্রবণতাও বাড়ছে। কিছু ক্ষেত্রে এসব কনটেন্ট থেকেই পরোক্ষ আয়ের পথও তৈরি হচ্ছে।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, কিশোর গ্যাং এখন শুধু সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতীক নয়; বরং এটি ধীরে ধীরে একটি বিকল্প অপরাধ অর্থনীতিতে পরিণত হচ্ছে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ায় কিশোররা সহজেই এসব চক্রের টার্গেটে পরিণত হচ্ছে। একই সাথে দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রবণতা এবং রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পরিস্থিতিকে আরো ভয়াবহ করে তুলছে।

এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক গোলাম রব্বানী নয়া দিগন্তকে বলেন, মূলত কোনো না কোনো গডফাদার বা বড় ভাইয়ের ছত্রছায়ায় কিশোররা এই ধরনের অপরাধে যুক্ত হচ্ছে। চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, ছিনতাই, চুরিসহ নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে আয় করছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। একটি অপরাধ করতে গিয়ে জড়াচ্ছে আরো অসংখ্য অপরাধে। নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বটবৃক্ষ হিসেবে বেছে নিচ্ছে এলাকার প্রভাবশালী কাউকে। তিনি বলেন, দিন দিন কিশোর গ্যাং কালচার ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। যেহেতু এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা কিশোর তাই সরকারি বেসরকারিভাবে কিশোর উন্নয়ন সেন্টারে পর্যাপ্ত মোটিভেশন করা প্রয়োজন। একই সাথে সেখানে বৃত্তিমূলক কারিগরিসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিয়ে উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ করা প্রয়োজন।