শ্রম শোষণেই শেষ রাইডাররা আইনের সুরক্ষা নেই

Printed Edition

এস এম মিন্টু

তপ্ত রোদ, ঝুম বৃষ্টি কিংবা মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা-কোনো কিছুই দমাতে পারে না তাদের। কাঁধে ভারী ব্যাগ আর হাতে স্মার্টফোন নিয়ে রাজপথ চষে বেড়ানো এই তরুণেরা আধুনিক ‘গিগ ইকোনমি’ বা অ্যাপ-ভিত্তিক সেবার মূল চালিকাশক্তি। তবে ই-কমার্স, রাইড শেয়ারিং এবং অনলাইন ফুড ডেলিভারি অ্যাপের চোখধাঁধানো অগ্রগতির পেছনে লুকিয়ে আছে হাজার হাজার চালক ও রাইডারের চরম অবহেলা ও শোষণের নির্মম গল্প। শ্রম আইনের কোনো স্বীকৃতি না থাকা, ভাড়ার ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং ন্যূনতম স্বাস্থ্য ও জীবন সুরার অভাবে এক মানবেতর জীবন পার করছেন এই খাতের শ্রমিকেরা।

সম্প্রতি সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন মোড়ে অবস্থান নেয়া রাইডারদের সাথে কথা বলে জানা যায় এক দীর্ঘশ্বাসের ইতিহাস। ফুডপান্ডা ও পাঠাও’র মতো শীর্ষস্থানীয় ফুড ডেলিভারি অ্যাপে কর্মরত রাইডারদের অভিযোগ, দিন দিন তাদের ট্রিপ-প্রতি পারিশ্রমিক কমিয়ে দেয়া হচ্ছে। অথচ জ্যামিতিক হারে বাড়ছে জ্বালানি তেল, খুচরা যন্ত্রাংশ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম।

দীর্ঘ তিন বছর ধরে রাইড শেয়ারিং ও ডেলিভারি পেশায় যুক্ত মোটরসাইকেল চালক কামরুল হাসান নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘আগে প্রতি ডেলিভারিতে যে টাকা পেতাম, এখন কোম্পানি বিভিন্ন অজুহাতে বোনাস কেটে তা প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে। সারা দিন ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা খাটুনির পর তেল খরচ আর অ্যাপের ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দেয়ার পর হাতে যা থাকে, তা দিয়ে ঢাকা শহরে পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকা অসম্ভব। আমরা দিনমজুরের চেয়েও খারাপ অবস্থায় আছি।’

সমস্যা কেবল কম পারিশ্রমিকেই সীমাবদ্ধ নয়, সবচেয়ে বড় সঙ্কট দেখা দিয়েছে পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরায়। অ্যাপ কোম্পানিগুলো এই চালকদের সরাসরি ‘শ্রমিক’ হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে ‘স্বাধীন পার্টনার’ বা ‘ফ্রি ল্যান্সার’ হিসেবে গণ্য করে। ফলে দুর্ঘটনা বা মৃত্যুর মতো বড় কোনো বিপর্যয় ঘটলেও কোম্পানিগুলো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দায় বা তিপূরণ বহন করে না।

সাইকেলে খাবার সরবরাহকারী তরুণ আরিফুল ইসলাম নিজের ােভ প্রকাশ করে বলেন, ‘গত মাসে বৃষ্টিতে ডেলিভারি দিতে গিয়ে পিছলে পড়ে আমার হাত ভেঙে যায়। কাস্টমারের খাবার নষ্ট হওয়ায় উল্টো আমার আইডি সাময়িকভাবে ব্লক করে দেয়া হয়। কোম্পানি থেকে চিকিৎসার এক টাকাও পাইনি। আমরা কি মানুষ নাকি স্রেফ একটা রোবট? আমাদের কোনো ভবিষ্যৎ বা নিরাপত্তা নেই।’

১২ ঘণ্টার খাটুনি, দিনশেষে পকেট শূন্য!: সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা। টানা ১২ ঘণ্টা রাজধানীর জ্যাম, ধুলোবালি আর তীব্র রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে মোটরসাইকেল চালিয়েছেন ৩০ বছর বয়সী ডেলিভারি রাইডার রাসেল মিয়া। তিনি বলেন, দিনশেষে তার মোট আয় এবং খরচের বাস্তবে মোট ট্রিপ (ডেলিভারি) ১৪টি কোম্পানির রেট অনুযায়ী এক হাজার ৫০ টাকা। অ্যাপ কোম্পানির কমিশন ২৫ শতাংশ হারে ২৬২ টাকা ৫ পয়সা। তার মোট গ্রস আয় হয় ৭৮৭ টাকা ৫ পয়সা। এর মধ্যে তার নিজস্ব খরচের মধ্যে রয়েছে মোটরসাইকেলের অকটেন খরচ ৪০০ টাকা। সারা দিনের খাবার ও পানি ১২০ টাকা। বাইকের দৈনিক য়-তি ও রণাবেণ ফান্ড হিসেবে ৮০ টাকা। ১২ ঘণ্টা পর তার আসল লাভ থাকে মাত্র ১৮৭ টাকা ৫ পয়সা। রাসেল কান্ত কণ্ঠে বলেন, সারা দিন জীবন বাজি রেখে বাইক চালিয়ে দিনশেষে ২০০ টাকাও ঘরে নিতে পারি না। মাস শেষে ঘর ভাড়া, বাচ্চার স্কুলের বেতন আর বাজারের খরচ কোত্থেকে আসবে? এই আয় দিয়ে ঢাকায় টিকে থাকা অসম্ভব। আমরা শুধু কোম্পানির পকেট বড় করছি, আমাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন নেই।

কল্যাণমূলক সুবিধা চালু : রাইডারদের এই ধারাবাহিক অভিযোগ ও ােভের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় রাইড শেয়ারিং ও ডেলিভারি প্ল্যাটফর্ম ‘পাঠাও’-এর একজন শীর্ষ কর্মকর্তার কাছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি নয়া দিগন্তকে জানান, ‘আমরা চালক ও রাইডারদের সবসময় আমাদের ব্যবসার মূল অংশীজন মনে করি। তবে এটি একটি মুক্ত বাজার ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবা।

বিশ্ববাজার ও স্থানীয় প্রতিযোগিতার কারণে অনেক সময় ভাড়ার কাঠামো পুনঃনির্ধারণ করতে হয়। রাইডারদের জন্য আমরা ডিজিটাল ইন্স্যুরেন্স ও বিভিন্ন সময় কল্যাণমূলক সুবিধা চালু করেছি, যা ক্রমে আরো উন্নত করা হচ্ছে।’

লোক দেখানো বা আইওয়াশ : ই-কমার্স ও ডেলিভারি খাতের এই অরাজকতা এবং রাইডারদের অধিকার আদায়ে কাজ করা শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, কোম্পানিগুলোর এই ইন্স্যুরেন্স বা সুবিধাগুলো আসলে এক ধরনের লোক দেখানো বা আইওয়াশ। বাস্তবে সাধারণ রাইডাররা এর কোনো সুবিধাই সময়মতো পান না।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দাবি : এই ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ এবং রাইডারদের আইনি সুরার অভাব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘প্রচলিত বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এ অ্যাপ-ভিত্তিক বা এ ‘গিগ ইকোনমি’র আওতাধীন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের শ্রমিকদের বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত ছিল না।

তবে বর্তমান সরকার এই বিশাল কর্মী বাহিনীকে প্রাতিষ্ঠানিক সুরার আওতায় আনার জন্য গুরুত্ব সহকারে কাজ করছে। আমরা একটি নতুন ফ্রেমওয়ার্ক বা নীতিমালা তৈরির পরিকল্পনা করছি, যেখানে এই রাইডার ও ফ্রিল্যান্সারদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ, কর্মঘণ্টা সুনির্দিষ্টকরণ এবং বাধ্যতামূলক দুর্ঘটনাজনিত জীবন বীমা নিশ্চিত করার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকবে। কোনো কোম্পানি শ্রমিকদের ঠকিয়ে ব্যবসা করতে পারবে না।’

বিশেষজ্ঞে মতামত : এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক নয়া দিগন্তকে বলেন, দেশের শিতি ও অর্ধশিতি বেকার যুবকদের একটা বড় অংশকে এ খাত কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিলেও, সঠিক নীতিমালা না থাকলে এটি চরম দাসত্বে রূপ নেবে।

দ্রুত সরকারি হস্তপে ও যুগোপযোগী শ্রম আইন প্রণয়ন না করা হলে, আধুনিক এ খাতের ভেতরের ােভ যেকোনো সময় বড় ধরনের সামাজিক অসন্তোষের জন্ম দিতে পারে।

ডেলিভারি রাইডারদের দাবি : ডেলিভারি রাইডারদের প্রধান ৩টি মৌলিক দাবির কথা উল্লেখ করে বলা হয়, শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি ও আইনি সুরা, রাইডারদের ‘স্বাধীন পার্টনার’ না বলে প্রচলিত বাংলাদেশ শ্রম আইনে ‘শ্রমিক’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। এর ফলে তারা কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, ছুটি এবং আইনি অধিকারের সুবিধা পাবে।

দ্বিতীয়ত, ভাড়ার যৌক্তিক হার ও কমিশন হ্রাস, জ্বালানি তেল ও নিত্যপণ্যের দামের সাথে মিলিয়ে ট্রিপ-প্রতি ন্যূনতম বেস ফেয়ার (ভাড়া) বাড়াতে হবে এবং অ্যাপ কোম্পানির কমিশন ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে সহনীয় পর্যায়ে আনতে হবে।

তৃতীয়ত, বাধ্যতামূলক দুর্ঘটনা বীমা ও চিকিৎসা ভাতা কর্তব্যরত অবস্থায় দুর্ঘটনার শিকার হলে কোম্পানির খরচে সম্পূর্ণ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পঙ্গুত্ব বা মৃত্যুর েেত্র স্থায়ী তিপূরণ ও জীবন বীমার সুবিধা দিতে হবে।

শ্রম অধিদফতরের বক্তব্য : এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শ্রম অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি) মো: আবদুছ সামাদ আল আজাদ নয়া দিগন্তকে বলেন, যারা রাইড শেয়ারিং করেন তাদের চুক্তিভিত্তিক বা প্ল্যাটফরমার হিসেবে রাখা হয়।

তবে আমরা চেষ্টা করছি তাদের শ্রম অধিকার আইনের আওতা হিসেবে আনার জন্য। আমাদের কাজ চলমান রয়েছে। গত বুধবার ৬৭টি নতুন ফর্মাল অনুমোদন পর্যায়ে রয়েছে; তার মধ্যে রাইড শেয়ারিংয়ের কর্মীরাও রয়েছেন কি না-এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, না সেখানে তাদের নাম না থাকলেও আমরা তাদের কথাও ভাবছি।