অর্থনীতিতে মিশ্র হাওয়া

যুদ্ধ নিয়ে শঙ্কা; বাড়ছে রেমিট্যান্স ও রিজার্ভ; তবে শিল্প উৎপাদনে মন্দা

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোতে ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের পিঠে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে আসার পাশাপাশি প্রবাসী আয়ে (রেমিট্যান্স) বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। তবে এর বিপরীতে বড় শিল্প উৎপাদনে শ্লথগতি এবং রফতানি আয়ে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের সর্বশেষ অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। অবশ্য মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের অভিঘাতে মূল্যস্ফীতিসহ অনেক সূচকে বিরূপ অবস্থা দেখা দেয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোতে ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের পিঠে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে আসার পাশাপাশি প্রবাসী আয়ে (রেমিট্যান্স) বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। তবে এর বিপরীতে বড় শিল্প উৎপাদনে শ্লথগতি এবং রফতানি আয়ে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের সর্বশেষ অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। অবশ্য মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের অভিঘাতে মূল্যস্ফীতিসহ অনেক সূচকে বিরূপ অবস্থা দেখা দেয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

কমছে মূল্যস্ফীতি, বাড়ছে মজুরি

২০২৬ সালের মার্চ শেষে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৮.৭১ শতাংশে, যা আগের মাসে ছিল ৯.১৩ শতাংশ। খাদ্য ও অখাদ্য উভয় খাতের দাম কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসায় ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতিও ৮.৬০ শতাংশে নেমে এসেছে। মূল্যস্ফীতি কমার পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষের মজুরি বৃদ্ধির হার (৮.০৯%) ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। বিশেষ করে সেবা খাতে সর্বোচ্চ ৮.২৩ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধি পেয়েছে।

ব্যাংকিং খাত ও তারল্য পরিস্থিতি

ব্যাংকিং খাতে আমানত ও ঋণের প্রবাহে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে : সরকারি ঋণ : বেসরকারি খাতের তুলনায় সরকারের ঋণ নেয়ার প্রবণতা কয়েক গুণ বেড়েছে। ফেব্রুয়ারি ২০২৬ শেষে সরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ২৯.৬১ শতাংশ, যা আগের বছর ছিল মাত্র ১৩.৩৯ শতাংশ।

বেসরকারি ঋণ : ব্যাংকগুলোর বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণে অনীহা বা চাহিদা কম দেখা গেছে। বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৬.০৩ শতাংশে নেমেছে।

আমানত প্রবৃদ্ধি : ব্যাংকগুলোতে আমানত রাখার হার বেড়ে ১১.২৮ শতাংশ হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকগুলোতে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ ৩ লাখ ২১ হাজার ২৫৫ কোটি টাকা।

সুদের হার : আমানত ও ঋণের গড় সুদের হার কিছুটা কমেছে। আমানতে গড় সুদের হার এখন ৬.৩১ শতাংশ এবং ঋণে ১১.৯৬ শতাংশ। তবে আন্তঃব্যাংক কল মানি রেট বেড়ে ১০.০১ শতাংশে পৌঁছেছে।

বৈদেশিক খাত : রেমিট্যান্সের চমক ও রিজার্ভের স্বস্তি

দেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় সুখবর এসেছে প্রবাসী আয়ের হাত ধরে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) রেমিট্যান্স এসেছে ২৬.২১ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০.৩০ শতাংশ বেশি।

এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমেছে। মার্চ শেষে গ্রস রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪.১২ বিলিয়ন ডলারে। তবে আইএমএফের বিপিএম-৬ পদ্ধতি অনুযায়ী প্রকৃত রিজার্ভের পরিমাণ ২৯.৫০ বিলিয়ন ডলার। বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে (ঙাবৎধষষ ইধষধহপব) ৩,৪২৭ মিলিয়ন ডলারের বড় উদ্বৃত্ত রয়েছে, যা গত বছর ঘাটতিতে ছিল।

উদ্বেগের জায়গা : রফতানি ও শিল্প উৎপাদন

সামষ্টিক অর্থনীতির অন্যান্য সূচক ইতিবাচক হলেও রফতানি ও শিল্প উৎপাদন খাতে হতাশার চিত্র ফুটে উঠেছে :

রফতানি হ্রাস : জুলাই-মার্চ সময়ে পণ্য রফতানি আয় গত বছরের তুলনায় ৩.৭৮ শতাংশ কমেছে। অথচ গত বছরের একই সময়ে ১০.৫২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ছিল।

শিল্পে মন্দা : বড় শিল্প কারখানার উৎপাদন প্রবৃদ্ধি আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। গত বছরের ৭.৬৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় এ বছর জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ২.১৭ শতাংশ।

বৈদেশিক সাহায্য : বৈদেশিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি ও ছাড় উভয়ই কমেছে। নেট বৈদেশিক সাহায্য গত বছরের তুলনায় প্রায় ৫৫.৫১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

পুঁজিবাজার ও রাজস্ব আয়

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তা বাড়ায় ডিএসই ব্রড ইনডেক্স (উঝঊঢ) জানুয়ারি মাসের ৫১৫৪ পয়েন্ট থেকে বেড়ে ফেব্রুয়ারি শেষে ৫৬০০ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর আদায়ের হার গত বছরের চেয়ে ১২.৩৬ শতাংশ বাড়লেও লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৭৮.০৬ শতাংশ অর্জিত হয়েছে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত

বিশ্লেষকরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি কমা ও রেমিট্যান্স বাড়া অর্থনীতির জন্য বড় রক্ষাকবচ। তবে সরকারি ঋণ বৃদ্ধি এবং বেসরকারি ঋণ ও শিল্প উৎপাদন কমে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। রফতানি আয় নেতিবাচক হওয়া বিশ্ববাজারে আমাদের সক্ষমতার সঙ্কটকে নির্দেশ করছে, যা দ্রুত কাটিয়ে ওঠা প্রয়োজন।

এক নজরে ২০২৬ সালের অর্থনৈতিক সূচক :

মুদ্রাস্ফীতি : ৮.৭১% (মার্চ)

রেমিট্যান্স : ২৬.২১ বিলিয়ন ডলার (জুলাই-মার্চ)

রিজার্ভ (ইচগ৬): ২৯.৫০ বিলিয়ন ডলার

রফতানি প্রবৃদ্ধি : -৩.৭৮%

বড় শিল্প উৎপাদন প্রবৃদ্ধি : ২.১৭%

আমানত প্রবৃদ্ধি : ১১.২৮%

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের অভিঘাত ও বাংলাদেশের অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ

চলমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন মধ্যপ্রাচ্যের ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধ এক নতুন সঙ্কটের পূর্বাভাস দিচ্ছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসের অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে যে রফতানি হ্রাস এবং শিল্প উৎপাদনে মন্দার চিত্র দেখা গেছে, তার নেপথ্যে এই যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব স্পষ্ট।

জ্বালানি তেলের বাজার ও আমদানিকৃত মূল্যস্ফীতি :

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘিœত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। যদিও বাংলাদেশে মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮.৭১ শতাংশে নেমেছে, তবে যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে পরিবহন ও সেচ খরচ বেড়ে গিয়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে পুনরায় উসকে দিতে পারে। বিশেষ করে আমদানিকৃত পণ্যের জাহাজ ভাড়া (ঋৎবরমযঃ ঈড়ংঃ) বৃদ্ধি পাওয়ায় ‘কস্ট-পুশ’ ইনফ্লেশনের ঝুঁকিতে রয়েছে দেশ।

রফতানি আয়ে ধস ও ইউরোপের বাজার :

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পণ্য রফতানি ৩.৭৮ শতাংশ কমেছে। এর প্রধান কারণ হলো মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ফলে লোহিত সাগর (জবফ ঝবধ) দিয়ে পণ্য পরিবহন ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল হয়ে পড়া। বাংলাদেশের প্রধান রফতানি বাজার ইউরোপ ও আমেরিকায় পণ্য পাঠাতে এখন বিকল্প দীর্ঘ পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বাংলাদেশের পোশাক খাতের সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। পশ্চিমা দেশগুলোতে যুদ্ধকালীন উচ্চ মূল্যস্ফীতি ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেয়ায় বাংলাদেশের পণ্যের চাহিদাও হ্রাস পেয়েছে।

রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও আশঙ্কার দিক

মার্চ পর্যন্ত ২৬.২১ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড রেমিট্যান্স দেশের রিজার্ভকে স্বস্তি দিলেও এর স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য হলো বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানির প্রধান কেন্দ্র। যুদ্ধের বিস্তার ঘটলে প্রবাসী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নতুন কর্মী পাঠানো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। বর্তমানের উচ্চ প্রবৃদ্ধি মূলত প্রবাসীদের দেশে থাকা পরিবারের কাছে ‘নিরাপদ সঞ্চয়’ পাঠানোর একটি তাড়না হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে জনশক্তি খাতের অনিশ্চয়তাকে নির্দেশ করে।

বৈদেশিক বিনিয়োগ ও সাহায্য হ্রাস :

প্রতিবেদনে নিট বৈদেশিক সাহায্য ৫৫.৫১ শতাংশ কমে যাওয়ার যে তথ্য পাওয়া গেছে, তার পেছনে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি বড় ভূমিকা পালন করছে। উন্নত দেশগুলো তাদের বাজেটের বড় অংশ যুদ্ধকবলিত অঞ্চলে মানবিক সাহায্য ও সামরিক খাতে বরাদ্দ করায় বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বৈদেশিক সাহায্যের প্রবাহ সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। একই কারণে বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও (এফডিআই) এখন নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ‘অপেক্ষা করো এবং দেখো’ নীতি অবলম্বন করছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে সামগ্রিক ভারসাম্যে যে উদ্বৃত্ত দেখা গেছে, তা প্রধানত প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের ওপর নির্ভরশীল। তবে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়া এবং রফতানি আয় আরো কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এই ভূ-রাজনৈতিক সঙ্কট মোকাবেলায় সরকারকে বিকল্প জ্বালানি উৎস এবং নতুন রফতানি বাজার খোঁজার ওপর জোর দিতে হবে।